গাংনীতে কাঁচা মরিচের কেজি ১২ টাকা

মেহেরপুরের গাংনীতে চলতি মৌসুমে মরিচের আবাদ বেড়েছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় প্রতিবছরই এ আবাদে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। মরিচ চাষ করে অনেক কৃষক স্বাবলম্বীও হয়েছেন। তবে এবার ফলন ভালো হলেও দাম কমে যাওয়ায় হতাশ কৃষকেরা। এক মাস আগেও যে মরিচ বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১০০ টাকায়, এখন তা নেমে এসেছে ১০ থেকে ১২ টাকায়।
উপজেলার কয়েকজন মরিচচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য ফসলের তুলনায় মরিচ চাষে অল্প সময়ে বেশি লাভের সুযোগ রয়েছে। চারা রোপণের আড়াই থেকে তিন মাসের মধ্যে গাছে মরিচ ধরতে শুরু করে। এরপর দ্রুত ফলন সংগ্রহ করা যায়। অনেক কৃষক মরিচের পাশাপাশি জমিতে সাথি ফসলও আবাদ করেন। তবে এবার বাজারদর এতটা কমে যাবে, তা তাঁরা ভাবতে পারেননি।
কৃষকেরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে মরিচ চাষে খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং ফলন ভালো হলে অল্প সময়ে অন্য ফসলের তুলনায় বেশি লাভ করা সম্ভব। মরিচ কিনতে বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারেরা গাংনীতে আসেন। তাঁরা বাজার কিংবা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি মরিচ কিনে নিজ জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান।
মরিচচাষি আলমগীর হোসেন বলেন, বাজারে ২৬ কেজি মরিচ এনেছিলাম। এর মধ্যে প্রায় দুই কেজি কেটে নেওয়া হয়েছে। প্রতি কেজিতে এক টাকা খাজনা এবং বাজারে আনার খরচও এক টাকা। এখন কৃষকেরা নিজেরাই গাছ থেকে মরিচ তুলছেন। কারণ, শ্রমিক দিয়ে মরিচ তোলাতে কেজিপ্রতি ১৫ টাকা খরচ হয়। বর্তমান দামে শ্রমিকের খরচ দিয়েই লোকসান গুনতে হচ্ছে।
আলমগীর বলেন, ‘এখনো গাছে অনেক মরিচ রয়েছে। কিন্তু তোলার আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। তোলার খরচ দিতেই সব শেষ হয়ে যাবে। তাই মরিচ তোলার ইচ্ছা আর নেই। গাছ কেটে গম চাষ করব।’
মরিচচাষি আলফাজ উদ্দিন বলেন, আমরা প্রতিবছরই মরিচের আবাদ করি। অল্প সময়ে ভালো লাভ হওয়ায় এ অঞ্চলে মরিচ চাষের আগ্রহ বাড়ছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার সার ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। শুরুতে মরিচের ভালো দাম পেয়ে এবারও লাভের আশা করেছিলাম। কিন্তু এখন দাম কমে যাওয়ায় তোলা, সার ও সেচের খরচ বাদ দিয়ে আর কিছুই থাকছে না।
মরিচচাষি জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলের মাটি মরিচ চাষের উপযোগী। স্থানীয় কৃষকেরা পতিত ও আবাদি—দুই ধরনের জমিতেই মরিচ চাষ করেন। লাভের আশায় দিন দিন এ চাষে আগ্রহ বাড়ছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক সময় লোকসান হয়। এবার দাম এতটাই কম যে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে মরিচ বিক্রি করে কৃষকের হাতে কিছুই থাকছে না।
জাহিদুল আরও বলেন, গাংনীর মরিচ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। বিভিন্ন বাজারে ছোট পরিসরে মরিচের হাটও বসে। বাজারে চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে। তবে আপাতত মরিচের দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।
মরিচচাষি আরিফুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন আগেও আমরা প্রতি কেজি মরিচ ১০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন সেই মরিচের দাম মাত্র ১২ টাকা। এ কারণে কৃষকদের মরিচ তোলার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। অনেকে ইতিমধ্যে গাছ কাটা শুরু করেছেন।
দেবীপুর গ্রামের মরিচচাষি ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, ১২ টাকা কেজি দরে মরিচ বিক্রি করে কোনো লাভ থাকছে না। জমি থেকে মরিচ তোলা, বাজারে আনা ও খাজনা—সব মিলিয়ে খরচ অনেক। এর সঙ্গে সার, ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে।
দেবীপুর বাজারের ইজারাদার মো. মিন্টু মিয়া বলেন, বর্তমানে এ হাটে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার কেজি মরিচ আমদানি হচ্ছে। একসময় দৈনিক আমদানি আট থেকে ১০ হাজার কেজি থাকলেও এক মাস ধরে তা কমেছে। এ হাটে সর্বোচ্চ ১২ হাজার কেজি মরিচ উঠেছিল। দাম কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক এখন আর আগের মতো মরিচ তুলছেন না।
গাংনী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৮৩৫ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে মরিচের আবাদ কিছুটা বেড়েছে।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, উপজেলায় এবার মরিচের আবাদ বেড়েছে। লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষক এ চাষে ঝুঁকেছেন। কিছুদিন আগেও উৎপাদন কম থাকায় মরিচের দাম বেশি ছিল। তবে মৌসুমের শেষ দিকে দাম অনেক কমে গেছে। এ কারণে অনেক কৃষক মরিচগাছ কেটে গম চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন।









