Ajker Patrika

৮ বছর ধরে অকেজো জেনারেটর, মোবাইলের আলোয় রোগী দেখেন চিকিৎসকেরা

গাংনী (মেহেরপুর) প্রতিনিধি
৮ বছর ধরে অকেজো জেনারেটর, মোবাইলের আলোয় রোগী দেখেন চিকিৎসকেরা
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছবি: আজকের পত্রিকা

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রবেশমুখ থেকে দোতলায় উঠতেই চোখে পড়ে সিঁড়ির নিচে তালাবদ্ধ একটি ঘর। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সেই তালায় ধরেছে চরম মরিচা। ঘরের ভেতরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে হাসপাতালের একমাত্র জেনারেটর। দেখতে দেখতে আটটি বছর পেরিয়ে গেলেও জেনারেটরটি চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কত দিন নষ্ট থাকলে কর্তৃপক্ষের নজর পড়বে কিংবা কবে এটি সচল হবে—সেই প্রশ্ন এখন সেবা নিতে আসা সাধারণ রোগীদের।

মাঝে মাঝে লোডশেডিং হলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চরম অস্বস্তি পোহাতে হয়, বিশেষ করে গরমে সেই ভোগান্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও যখনই লোডশেডিং হয়, তখন বাধ্য হয়ে চিকিৎসকদের মোবাইলের টর্চের আলো জ্বালিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হয়। এই দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি মিলবে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয়দের মতে, একটি সরকারি হাসপাতালে এত দীর্ঘ সময় ধরে একটা জেনারেটর অচল হয়ে পড়ে থাকা স্বাস্থ্যসেবার অভ্যন্তরীণ বেহাল দশারই প্রমাণ দেয়। মেহেরপুরের গাংনী একটি বৃহৎ উপজেলা এবং এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির ওপরই নির্ভরশীল। বহু রোগী ভর্তি হয়ে এখানে চিকিৎসা নেন। বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

হাসপাতালে ভর্তি রোগী ফাতেমা খাতুন জানান, গতকাল শুক্রবার রাতেও কিছুটা লোডশেডিং ছিল, যা ভর্তি রোগীদের জন্য চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। হাসপাতালটিতে বর্তমানে ধারণক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন জানিয়ে তিনি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

চিকিৎসা নিতে আসা হাসানুজ্জামান নামের আরেকজন বলেন, ‘হাসপাতালে জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সেটি সাত-আট বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় ধুঁকছে। জং ধরে হয়তো সেটি একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষ যাতে একটু শান্তিতে চিকিৎসা সেবা নিতে পারে, সে জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া দরকার।’

রোগীর স্বজন সামিয়া সুলতানা জানান, কিছুদিন আগে তাঁর বোনের মেয়েকে ভর্তি করানোর পর রাতের বেলা লোডশেডিংয়ের কারণে প্রচণ্ড গরমে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও তা চালানো হয়নি।

ঘরের ভেতরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে হাসপাতালের একমাত্র জেনারেটর। ছবি: আজকের পত্রিকা
ঘরের ভেতরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে হাসপাতালের একমাত্র জেনারেটর। ছবি: আজকের পত্রিকা

আরেকজন অভিভাবক রাজু আহমেদ বলেন, দিন কিংবা রাতে বিদ্যুৎ সামান্য সময়ের জন্য গেলেও রোগীরা কষ্টে পড়েন। বিকল্প হিসেবে অন্তত জেনারেটর বা বড় আইপিএসের ব্যবস্থা করা জরুরি।

এদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রসঙ্গে গাংনী পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের এজিএম (O&M) ফয়সাল হোসেন জানান, এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ১০ থেকে ১১ মেগাওয়াট। তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী পূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করছেন। তবে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়।

হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ মো. মনিরুল ইসলাম জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকালও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে নতুন ১০৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘রোগীদের সঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ আবশ্যক। যেটুকু সময় লোডশেডিং থাকে, সে সময় বিকল্প হিসেবে জেনারেটর বা শক্তিশালী আইপিএস প্রয়োজন। বর্তমানে একটি আইপিএস দিয়ে কেবল জরুরি বিভাগের সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। তবে অন্তর্বিভাগে ভর্তি রোগীদের জন্য কোনো বিকল্প নেই। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় বাধ্য হয়ে মোবাইলের টর্চলাইট জ্বেলেই আমাদের রোগী দেখতে হয়।’

তিনি আরও জানান, হাসপাতালের নথিপত্র অনুযায়ী জেনারেটরটি প্রায় সাত থেকে আট বছর ধরে বিকল অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তাঁরা খুব দ্রুত জেনারেটরটি মেরামতের আশ্বাস দিয়েছেন।

এ বিষয়ে মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনের সংসদ সদস্য নাজমুল হুদা বলেন, ‘গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পুরো উপজেলার সিংহভাগ মানুষ এখানেই চিকিৎসা নিতে আসেন। লোডশেডিংয়ের সময় ভর্তি রোগীদের অনেক কষ্ট হয়। তাই হাসপাতালে কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে দ্রুতই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত