আমনের বাম্পার ফলনেও হাসি নেই কৃষকের মুখে

মেহেরপুরের গাংনীতে আগাম আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। মাঠে পাকা ধান, ঘরে ফসল তোলার প্রস্তুতি—তবু কৃষকের মনে নেই ফসল কাটার চিরচেনা আনন্দ। সার, ডিজেল, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে প্রতি মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। এতে খরচ তুলতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
কৃষকেরা জানান, সাধারণত ধান কাটার মৌসুমে মাঠজুড়ে থাকে উৎসবের আমেজ। ধান কাটতে কাটতে চলে জারি গান, গল্প আর হাসি-আনন্দ। ধান ঘরে তোলার পর কৃষাণীরা শুরু করেন পরবর্তী কাজ। কিন্তু এবার উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের অসংগতি তাঁদের সেই আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে।

কৃষকদের হিসাবে, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত বিঘাপ্রতি খরচ হচ্ছে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলেও প্রতি বিঘায় সর্বোচ্চ ২০ মণ ধান পাওয়া যাচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি মণ ধানের দাম ৮০০ টাকা হলে এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে পাওয়া যায় ১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন খরচই উঠছে না অনেক কৃষকের।
কৃষক জফের আলী বলেন, ‘সার, কীটনাশক, সেচ ও ডিজেলের দামসহ সবকিছুর খরচ বেড়েছে। শুধু বাড়েনি কৃষকের পরিশ্রমের মূল্য। সরকার নির্ধারিত দামে যে সার ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রির কথা, সেই সার কিনতে হচ্ছে বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। এক বস্তা সার কিনতেই প্রায় আড়াই মণ ধানের দাম চলে যাচ্ছে। তাহলে কৃষক বাঁচবে কীভাবে, আর আবাদই বা করবে কীভাবে? সরকারের কাছে অনুরোধ, ফসলের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করুন। তাহলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে।’

ধানচাষি মো. হানিফ আলী বলেন, ‘২৫ কাঠা জমিতে ধান আবাদ করতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ ধান বিক্রি করে সেই টাকাও উঠছে না। প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। অনেক সময় ব্যবসায়ীরাও ধান কিনতে আসেন না। বাধ্য হয়ে কম দামে স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হয়। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে আমরা আবাদ করব কীভাবে? প্রতিদিন সবকিছুর দাম বাড়ছে, আর কৃষক শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
ধানচাষি জাকের আলী বলেন, ‘আমন ধানে সাধারণত আট থেকে ১০ বার সেচ দিতে হয়। কিন্তু এবার দিতে হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ বার। বৃষ্টি না হওয়ায় ধান আবাদ করতে গিয়ে কৃষকের কষ্ট বেড়েছে। দিন যত যাচ্ছে, খরচ তত বাড়ছে। অথচ ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না।’
গাংনী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, উপজেলায় আগাম আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। ফলন ভালো হলেও কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না এবং উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কৃষকেরা যাতে তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান, সে জন্য কৃষি অফিস কাজ করছে। পাশাপাশি সারের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষকদের যাতে সমস্যায় পড়তে না হয়, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।









