Ajker Patrika

নাগেশ্বরীতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহে কৃষকের তালিকায় হতদরিদ্র-ভূমিহীন-অকৃষক

কুড়িগ্রাম প্রতি‌নি‌ধি ও না‌গেশ্বরী সংবাদদাতা
নাগেশ্বরীতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহে কৃষকের তালিকায় হতদরিদ্র-ভূমিহীন-অকৃষক
নাগেশ্বরী খাদ্যগুদাম। ছবি: আজকের পত্রিকা

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ধান দেওয়া কৃষকের তালিকায় নাম উঠেছে দরিদ্র, ভূমিহীন, দিনমজুরসহ অকৃষকের নাম। অভিযোগ রয়েছে, এসব অকৃষকের নাম তালিকাভুক্ত করেছে একটি চক্র। তারা এসব নামের বিপরীতে গুদামে ধান দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা। ফলে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষক। এমন অনিয়মের বিষয়ে একে অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছে উপজেলা খাদ্য ও কৃষি বিভাগ।

নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ইরি ও বোরো মৌসুমে ৮ কোটি ৭২ লাখ ২৮ হাজার টাকার ধান সংগ্রহ করা হবে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই সংগ্রহ। ৮০৭ জন প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে প্রতি টন ৩৬ হাজার টাকা দরে ২ হাজার ৪২৩ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেই অনুযায়ী প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে অনলাইনে আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদনপ্রক্রিয়ায় একটি চক্র বিভিন্ন ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে দরিদ্র, ভূমিহীন ও দিনমজুর শ্রেণির লোকজনের নাম ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার জনের নামে আবেদন করে। আবেদন শেষে লোকদেখানো লটারির মাধ্যমে কৃষক বাছাই করে ক্রয় কমিটি। বাছাই করা কৃষকের অর্ধেকের বেশি অকৃষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করে তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই তালিকায় থাকা অনেকে জানেন না, তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পরে সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাঁদের ব্যাংকে নিয়ে হিসাব খুলে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা দিয়ে তাঁদের বিদায় করে। অন্যদিকে তাঁদের নামে গুদামে ধান দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

অনুসন্ধানে নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা ইউনিয়নে একছাটবাড়ী গ্রামের ১৬ জন ভুয়া কৃষকের সন্ধান পাওয়া যায়। সবাই হতদরিদ্র, নিজের কোনো আবাদি জমিজমা নেই। তারপরও সরকারের খাতায় কৃষক। গুদামে ধান দিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকাও উত্তোলন করেছেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, এলাকার সিন্ডিকেট সদস্য দুলাল মিয়া এসব অসহায় মানুষের কৃষি কার্ড, বিধবা কার্ড, ভিজিডি কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়েছেন। পরে জনপ্রতি গড়ে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করেন। তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে দরিদ্র এসব মানুষ পুলিশ ও আইনি ঝামেলার কথা ভেবে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন।

তাঁদের মধ্যে রথের স্ত্রী বিষ্ণুমরী, মৃত আজগর আলীর পুত্র জমির উদ্দিন, গোলজারের স্ত্রী রাজিনা খাতুন, বাবলু মিয়ার স্ত্রী ফরিদা বেগম, আবু বক্কর সিদ্দিকীর স্ত্রী হাজেরা বেগম, জতিশের স্ত্রী মনোবালা, আসমত আলীর স্ত্রী শিরিনা, গোলাপ উদ্দিনের স্ত্রী আছিয়া বেগম, বক্করের স্ত্রী গোলভান বেগম এবং নাভজান বেওয়াসহ অনেকের চেকের দুটি করে পাতা নিয়েছে দুলাল মিয়া।

নাভজান বেওয়া বলেন, ‘তিন বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। বাড়ির ভিটা ১৫ শতক জমি ছাড়া আর কোনো জমি নেই। অন্যের বাড়িতে কাজ করে পেট চলে। বিধবা ভাতা দেওয়ার কথা বলে দুলাল ব্যাংকে নিয়ে যান। এরপর অনেক সই নেন ব্যাংকের লোক, একটা বইও দেন। ওই বই থেকে সই করা দুটি চেকের পাতা দুলাল নিয়ে দুই দফায় ১,৫০০ টাকা দিছে।’

আছিয়া বেগম বলেন, ‘ব্যাংকে সই নিয়ে বাইরে পান খাইতে পাঠায় দিছে। পরে ওমরা চেক দিয়া টাকা তুলছে। বাড়িতে আসি এক হাজার টাকা দিছে।’

গোলভান বেগম বলেন, ‘কৃষি কার্ডের কথা বলে ছবি আর আইডি কার্ড নিয়ে কম্পিউটারে নাম দেয় দুলালসহ দুজন ব্যক্তি। পরে ব্যাংকে নিয়ে যায়। কী করছে জানি না। দুলাল আর ব্যাংকের ম্যানেজার জানে। পরে আমাকে দেড় হাজার টাকা দিছে।’

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমানের দাবি, তিনি বছরে ৩০০-৪০০ মণ ধান উৎপাদন করেন। অথচ আজ পর্যন্ত সরকারের গুদামে কখনো ধান দিতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, প্রকৃত কৃষক বাদ দিয়ে দরিদ্র মানুষের নাম দিয়ে ধান দেওয়ার সুবিধা নিয়ে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট সদস্যরা।

অভিযুক্ত দুলাল মিয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘শুধু কচাকাটায় নয়, নাগেশ্বরী উপজেলার সকল ইউনিয়নে কোথাও কৃষক ধান দেয় নাই। ধান ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে।’ তবে তিনি দাবি করেন, আর্থিক কোনো সুবিধা না নিয়ে তিনি প্রভাবশালী মহলের বড় ভাইদের নির্দেশ পালন করেছেন মাত্র।

নাগেশ্বরী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাউছার হাবিব নিজের দায় অস্বীকার করেন। কৃষি বিভাগের দিকে আঙুল তুলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কৃষি বিভাগ থেকে দেওয়া কৃষকের তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচিত হয়েছে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘স্বল্প সময়ে আবেদনকারী কৃষকদের যাচাই-বাছাই সম্ভব নয়। তবে কৃষক নয় এমন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও তাঁরা ধান দিতে পারবেন না। এসব নাম বাতিল করে আবার লটারি দেওয়ার নিয়ম আছে। তবে খাদ্য বিভাগ এসব বিষয়ে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেননি। কার কার কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করছে, এটা আমাদের জানা নেই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত