Ajker Patrika

ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রীকে কমিটিতে নিতে ইউএনওর চাপ, প্রধান শিক্ষককে বদলির হুমকি ছাত্রলীগ নেতার

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রীকে কমিটিতে নিতে ইউএনওর চাপ, প্রধান শিক্ষককে বদলির হুমকি ছাত্রলীগ নেতার
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ছাত্রলীগের এক নেতার স্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। ছবি: আজকের পত্রিকা

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক সাবেক নেতার স্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি স্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করে এক দিনের মধ্যে রেজল্যুশন না করলে প্রধান শিক্ষককে বান্দরবান বদলির হুমকি দিয়েছেন সাবেক ওই ছাত্রলীগ নেতা। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

অভিযুক্ত সাবেক ছাত্রলীগ নেতার নাম সাজেদুল ইসলাম মোল্লা। তিনি উপজেলার রমনা ইউনিয়নের পাত্রখাতা গ্রামের আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা আইনুল হক মোল্লার ছেলে। ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে তিনি ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। সাজেদুলের স্ত্রী মৌসুমিকে বিধিবহির্ভূতভাবে কমিটিতে স্থান দেওয়ার জন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার পূর্ব পাত্রখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র রাস্তাসহ সরকারি খাসজমি দখল করে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছে ঢাকার দোহার উপজেলার ইউএনও মাইদুল ইসলাম ও তাঁর ছোট ভাই সাজেদুল ইসলামের পরিবার। গতকাল রোববার বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করতে গিয়ে চিলমারী ইউএনও মাহমুদুল হাসান ওই ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রীকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। অভিভাবক না হওয়ায় ওই নেতার স্ত্রীকে কমিটিতে নেওয়ার সুযোগ নেই জানালে ইউএনও প্রধান শিক্ষককে নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত কমিটি তৈরির আলটিমেটাম দিয়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন।

এদিকে আজ সোমবার সকালে ছাত্রলীগ নেতা সাজেদুল বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে ফের চাপ প্রয়োগ করেন। প্রধান শিক্ষক অস্বীকৃতি জানালে তিনি তাঁকে বান্দরবানে বদলি করার হুমকি দেন। চিলমারী ইউএনও ও ছাত্রলীগ নেতার চাপে পড়ে নীতিমালা ভঙ্গ করে প্রধান শিক্ষক কমিটি প্রস্তুত করে ইউএনও অফিসে নিয়ে যান।

বিদ্যালয়টির এক সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ওই নারীর (ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী) সন্তান স্কুলে ভর্তি নেই। তিনি কোনো ক্যাটাগরিতে কমিটিতে স্থান পেতে পারেন না। কিন্তু ইউএনও স্যার ওই নারীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। আর সাজেদুল (ছাত্রলীগ নেতা) সকালে স্কুলে এসে তার স্ত্রীকে কমিটিতে রেখে আজই রেজল্যুশন করার জন্য চাপ দেন। না হলে প্রধান শিক্ষককে বান্দরবানে বদলি করবেন।’

ওই শিক্ষক আরও বলেন, ‘আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করেছি যে, কোন বিধিতে তাঁকে কমিটিতে নিচ্ছেন। জবাবে তাঁরা বলেন—‘‘আমরা রাস্তা দেব’’। কিন্তু জায়গা তো সরকারি খাসজমি। তাঁরা কীভাবে সেটা দান করবেন? দান করার আগেই কীভাবে দাতা সদস্য হতে পারেন?’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক রিয়াজবিন বানু বলেন, ‘আমি আসলে কী বলব। ইউএনও আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তিনি যখন নির্দেশ দিয়েছেন, নিশ্চয়ই বুঝেশুনে দিয়েছেন।’

ছাত্রলীগ নেতার হুমকির বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমার কিছু বলার নেই। এসব বিষয় আপনারা ধরিয়েন না।’

জানতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতা সাজেদুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘আমরা জমি লিখে দিয়েছি। এ জন্য আমার স্ত্রীকে কমিটিতে নেওয়া হচ্ছে। আমি প্রধান শিক্ষককে কোনো হুমকি দিইনি। আমি হুমকি দেওয়ার কে? আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব।’

তবে সাজেদুলের দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকেরা বলছেন, বিদ্যালয়ের রাস্তার জন্য কোনো জমি লিখে দেওয়া হয়নি। তাঁরা বিদ্যালয়ের রাস্তাসহ যে জমি দখল করে রেখেছেন, তা সরকারি খাসজমি বলে জানেন তাঁরা। সেটা কীভাবে বিদ্যালয়কে লিখে দেবে, তা বলতে পারছেন না।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘নীতিমালার বাইরে গিয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি করার কোনো সুযোগ নেই। প্রধান শিক্ষক আমাকে কিছু জানাননি। আমার কাছে কাগজপত্র এলে আমি যাচাই করে দেখব।’

নীতিমালা ভঙ্গ করে ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রীকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে রাখার বিষয়ে চিলমারীর ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমি অত কিছু জানি না। স্কুলের রাস্তা করতে যা করতে হয়, আমি করব।’ কিন্তু ছাত্রলীগ নেতা সাজেদুলের পরিবারের দখল উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, আজ দুপুর পর্যন্ত ইউএনওর দপ্তরে কমিটি অনুমোদনের কাজ চলছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত