Ajker Patrika

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা: হাওরে শিক্ষক নেই, সদর পূর্ণ

  • হাওরাঞ্চলের ১০৩ শিক্ষক প্রভাব খাটিয়ে সদরে বদলি হন।
  • জেলার ৮০৫টি স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
  • হাওরাঞ্চলের শিক্ষকদের কর্মস্থলে পুনর্বহালের দাবি।
  • বদলির বিষয়টি নীতিমালা অনুযায়ী পর্যালোচনা: শিক্ষা কর্মকর্তা
সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জ 
প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা: হাওরে শিক্ষক নেই, সদর পূর্ণ
ফাইল ছবি

কিশোরগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে শিক্ষকসংকট ও বিতর্কিত বদলির দ্বিমুখী চাপে বিপর্যস্ত। জেলার ১ হাজার ৩২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮০৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ১০৩ জন শিক্ষক প্রভাব খাটিয়ে সদর উপজেলায় বদলি হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে একদিকে হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, অন্যদিকে সদরের পদগুলো পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় চাকরিপ্রত্যাশীরা নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮০৫টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এর মধ্যে ২৭৪টিতে সহকারী শিক্ষকেরা ‘চলতি দায়িত্বে’ বা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে প্রশাসনিক কাজ সামলাচ্ছেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের পাঠদানের পাশাপাশি প্রতিদিন অফিস পরিচালনা, হিসাবরক্ষণ, সরকারি প্রতিবেদন তৈরি ও নানা প্রশাসনিক ফাইলে স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। সদর উপজেলার এক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সারা দিন দাপ্তরিক কাগজপত্রের চাপ সামলাতেই সময় চলে যায়। ক্লাসে গিয়ে নিয়মিত পড়ানোর সুযোগ কোথায়? ফলে শিশুদের পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে বাধ্য হয়ে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় শিশুদের নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করছেন অভিভাবকেরা।

জেলায় প্রধান শিক্ষকসংকটে সবচেয়ে বিপর্যস্ত পাকুন্দিয়া, বাজিতপুর ও কটিয়াদী। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পাকুন্দিয়ায় সর্বোচ্চ ১৪৭টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে (চলতি দায়িত্বে ৩৬ জন)। এ ছাড়া কটিয়াদীতে ৭৭টি (চলতি দায়িত্বে ২৭ জন), বাজিতপুরে ৭৭টি (চলতি দায়িত্বে ২০ জন), হোসেনপুরে ৭০টি (চলতি দায়িত্বে ২৬ জন), সদরে ৬৬টি (চলতি দায়িত্বে ১৯ জন), করিমগঞ্জে ৬৫টি (চলতি দায়িত্বে ৩২ জন), ভৈরবে ৫৫টি (চলতি দায়িত্বে ২০ জন), মিঠামইনে ৫২টি (চলতি দায়িত্বে ২০ জন), অষ্টগ্রামে ৫২টি (চলতি দায়িত্বে ২২ জন), তাড়াইলে ৪৬টি (চলতি দায়িত্বে ২০ জন), ইটনায় ৪৪টি (চলতি দায়িত্বে ১২ জন), নিকলীতে ৩১টি (চলতি দায়িত্বে ১০ জন) এবং কুলিয়ারচরে ২৩টি (চলতি দায়িত্বে ১০ জন) প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। জেলাজুড়ে সহকারী শিক্ষকের আরও ৪৫৩টি পদ শূন্য রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রত্যন্ত ও হাওরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে জেলা সদরের বিদ্যালয়গুলোতে চলে এসেছে। সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী থেকে ১০৩ জন সহকারী শিক্ষক নিয়মবহির্ভূতভাবে বা বিশেষ সুবিধায় সদর উপজেলায় বদলি হয়েছেন। এর মধ্যে ইটনা থেকে ৪৯, মিঠামইন থেকে ৩৮, অষ্টগ্রাম থেকে ১৪ ও নিকলী থেকে ২ জন। সর্বশেষ শিক্ষক নিয়োগে জেলায় চাকরি পেয়েছেন ২৭৫ জন; এর মধ্যে সদরে ৯, ইটনায় ১২, মিঠামইনে ৩৪, অষ্টগ্রামে ১১, তাড়াইলে ১৩ ও নিকলীতে ১৭ জন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই গণবদলির ফলে হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলো যেমন শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে, তেমনি সদরের বিদ্যালয়গুলোতে পদ পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় শিক্ষিত বেকারেরা নিয়োগ বঞ্চিত হচ্ছেন।

এদিকে শিক্ষক বদলি ও পদায়ন নিয়ে ক্ষুব্ধ কিশোরগঞ্জের স্থানীয় চাকরিপ্রত্যাশীরা। সদরের চাকরিপ্রত্যাশী মো. আবদুর রহমান (ছদ্মনাম) অভিযোগ করেন, ‘আমরা স্থানীয়ভাবে মেধার লড়াইয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছি, অথচ প্রভাবশালী মহলের তদবিরে হাওরাঞ্চল থেকে ১০৩ জন শিক্ষক সদরে চলে এসেছেন। এতে সদরের পদগুলো পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় আমরা বছরের পর বছর চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বদলিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রস্তুতের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় চাকরিপ্রত্যাশীরা।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’ বদলিসংক্রান্ত বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, বদলির বিষয়টি নীতিমালা অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত