Ajker Patrika

‘সব শেষ, চোখ দিয়ে পানিও আসছে না’

  • রোদ ওঠায় হাওরবাসীর স্বস্তি ফিরলেও হঠাৎ বৃষ্টিতে বিষাদে রূপ নেয়।
  • কেটে তোলা ভেজা ধানে চারা গজিয়ে বের হচ্ছে পচা গন্ধ।
সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জ
‘সব শেষ, চোখ দিয়ে পানিও আসছে না’
অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধ হাওর থেকে ভেজা ধান কেটে কূলে তুলছেন কৃষক। চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। গতকাল কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর হাওরে। ছবি: আজকের পত্রিকা

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার চাঁপাডাঙ্গা হাওরের দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ এখন অথই পানির নিচে। তলিয়ে আছে কৃষক মোফাচ্ছেল মিয়ার (৪৫) হাড়ভাঙা পরিশ্রমে ফলানো স্বপ্ন। টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় মোফাচ্ছেলের ৩৫ একর জমির বোরো ধান এখন পুরোপুরি পানির নিচে।

মোফাচ্ছেল জানান, নিজের সামান্য কিছু জমির পাশাপাশি ২৭ একর জমি বর্গা নিয়ে এবার বোরো চাষ করেছিলেন। ধারদেনা আর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন এই ফলনের আশায়, কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মোফাচ্ছেল বলেন, ‘লাখ লাখ টাকা খরচ করছি। সুদে টাকা নিছি। সব শেষ হয়ে গেছে। এখন চোখ দিয়ে পানি আসছে না, মনে হচ্ছে রক্ত আইতেছে। যারা ঋণ পাইবো, তারা তো এখনই চাপ দেওয়া শুরু করবে। মনে হইতাছে, বাড়িঘর বিক্রি কইরা তাদের টাকা পরিশোধ করতে হইবো।’

ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রতারণার বিষফোড়া। মোফাচ্ছেল জানান, দ্রুত ধান কাটার আশায় হারভেস্টর মেশিনের জন্য অগ্রিম ২ লাখ টাকা নিরাপত্তা জামানত দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সময়মতো মেশিন আসেনি।

গত মঙ্গলবার ও গতকাল দুপুর পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী, করিমগঞ্জ উপজেলার আকাশ পরিষ্কার ছিল। রোদ ওঠায় হাওরবাসীর মনে স্বস্তি ফিরেছিল। দীর্ঘ বিরতির পর কিষান-কিষানিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ধানমাড়াই ও শুকানোর কাজে। রোদ ওঠায় নিচু জমি থেকে ধান তোলা এবং রাস্তায় ভেজা খড় শুকাতে দিয়ে হাওরজুড়ে কর্মব্যস্ততা ফিরে আসে।

তবে পানিতে দীর্ঘক্ষণ ভিজে থাকায় অনেক ধানে চারা গজিয়েছে ও পচা গন্ধ বের হচ্ছে, যা মূলত হাঁসের খাবারের জন্য শুকানো হচ্ছিল। কিন্তু এই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। বেলা ৩টা বাজতেই হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে পুরো দৃশ্যপট বদলে যায়। প্রাণচাঞ্চল্য মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেয় এবং রাস্তায় শুকাতে দেওয়া ধান ও খড় তাড়াহুড়ো করে আবারও গুছিয়ে নিতে গিয়ে কৃষকেরা চরম বিপাকে পড়েন।

করিমগঞ্জের বড় হাওরের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বাবা, এইডা ধান কাটা না, এইডা যেন নিজের কলিজা কাটা। পানির তলে হাত দিলে কচুরিপানার শিকড় আর পচা ঘাস প্যাঁচায়া ধরে। হাত-পা তো অবশ হয়া গেছে গা। জোঁক যে কখন রক্ত খাইয়া পেট ফুলায় ফেলে। পেটের দায়ে এই যন্ত্রণার মধ্যে নামছি।’

আরেক কৃষক রহমত বলেন, ‘পানির নিচে ধান কাটতে দ্বিগুণ সময় লাগে। এক দিনে যেখানে একজন মানুষ ১০ কাঠা জমির ধান কাটতে পারে, এখন সেখানে ২ কাঠা কাটতেই জান বের হয়ে যায়। ধানগুলা পইচা কালো হয়া গেছে।’

ইটনার জয়সিদ্ধি গ্রামের কৃষক কৃষক ফায়জুল বলেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) থেকে রোদ ওঠে। টানা কয়েক দিন রোদ না থাকলে ধান শুকাইব না। বেলা আড়াইটা পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো ছিল। চারদিকে ধানমাড়াইয়ের ধুম লেগেছিল। কিন্তু ঠিক ৩টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হইলো বৃষ্টি। যে যেভাবে পারতাছে, ধান-খড় গুছাইয়া নেওয়ার চেষ্টা করতাছে, কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে অনেক ধান আবারও ভিইজা নষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ যেনো আমাদের রক্ষা দেন।’

মিঠামইন উপজেলার কাটখাল গ্রামের কৃষক শাহ আলম বলেন, ‘খলায় ধানগুলা স্তূপ কইরা রাখছিলাম, কিন্তু বৃষ্টিতে সব ভিইজা চারা গজাইয়া গেছে। ধান থেইকা পচা গন্ধ বাইর হইতাছে। এখন কষ্ট কইরা শুকাইতাছি; কারণ, এইগুলা আর আমাগো খাওয়ার উপায় নাই। হাঁসের খাবার হিসেবে কাজে লাগব। অহন যে বৃষ্টি শুরু হইছে, এতে হাঁসের খাওনও জুটত না। কৃষকের কপাল তো পাথরে লেখা।’

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান জানান, অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় জেলায় মোট ১১ হাজার ১৭৪ হেক্টর বোরোর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে চাল উৎপাদনের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৮৫৩ টনে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৭১৫ জন। হাওরাঞ্চলে এখনো ২৮ শতাংশ ধান কাটা বাকি। বৃষ্টির মধ্যে ধান না কাটতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনে বিজয়কে সহায়তা করবে কংগ্রেস, পেতে পারে ২ মন্ত্রিত্ব

লন্ডনে পাপনের আইসক্রিম খাওয়ার ছবি ভাইরাল

‘মোদির অনুরোধে অমিত শাহকে বাঁচান শারদ পাওয়ার, পরে তাঁর দলই ভেঙে দেয় এই জুটি’

নেত্রকোনায় যৌতুক ও নির্যাতনের মামলায় ব্যাংক কর্মকর্তা কারাগারে

সঙ্গী করে ক্ষমতায় আরোহণ, সেই বিজেপির হাতেই পতন হয়েছে যে ৬ মুখ্যমন্ত্রীর

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত