Ajker Patrika

শতবর্ষী বটগাছে রেস্টুরেন্ট, হারাচ্ছে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
শতবর্ষী বটগাছে রেস্টুরেন্ট, হারাচ্ছে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়
মাটি থেকে প্রায় ২৫ ফুট ওপরে গোলাকার বসার স্থান তৈরি করে সেখানে চলছে খাওয়াদাওয়া, আড্ডা আর ছবি তোলার আয়োজন। ছবি: আজকের পত্রিকা

একসময় ক্লান্ত পথিকেরা একটু স্বস্তির আশায় থামতেন বিশাল বটগাছটির ছায়ায়। দুপুরের নীরবতায় ভেসে আসত নানা প্রজাতির পাখির ডাক। শতবর্ষী এই বটগাছ শুধু একটি গাছই নয়, ছিল এলাকার মানুষের স্মৃতি, প্রকৃতির শান্ত আশ্রয় এবং অসংখ্য পাখির নিরাপদ আবাস। অথচ মানুষের বিনোদনের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে উঠছে গাছটি।

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারের ঘোড়দহ এলাকায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই শতবর্ষী বটগাছকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট। স্থানীয় দুই যুবক কনক হোসেন ও আবির হাসান গাছটির নামের সঙ্গে মিল রেখে এর নাম দিয়েছেন ‘বৃক্ষবিলাস ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’। তবে প্রকৃতির বুকের ওপর গড়ে ওঠা এই বিনোদনকেন্দ্র এখন পরিবেশ সচেতন মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল গাছটির কিছু ডাল কেটে ফেলা হয়েছে। আর মোটা ডালে ড্রিল করে গর্ত তৈরি করে অসংখ্য পেরেক ঠুকে বসানো হয়েছে লোহার ফ্রেম ও কাঠের পাটাতন। গাছের গায়ে লাগানো হয়েছে লোহার সিঁড়ি। এভাবে মাটি থেকে প্রায় ২৫ ফুট ওপরে গোলাকার বসার স্থান তৈরি করে সেখানে চলছে খাওয়াদাওয়া, আড্ডা আর ছবি তোলার আয়োজন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড়ে মুখর থাকে এলাকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রেস্টুরেন্ট তৈরির সময় গাছটির কয়েকটি বড় ডালও কেটে ফেলা হয়েছে। প্রতিদিন মানুষের চাপ, চলাচল ও কোলাহলে গাছটির কোমল ডালপালা ও নতুন কুঁড়ি নষ্ট হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, গাছের শরীরে করা গর্ত দিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরের অংশও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

হলিধানী এলাকার বাসিন্দা মো. আয়নাল বলেন, ‘গাছের ডালে বসে খাওয়ার অভিজ্ঞতা ভালো লাগে। বন্ধুদের নিয়ে মাঝেমধ্যে এখানে আসি।’

হরিণাকুণ্ডুর চারাতলা বাজারের ঘোড়দহ এলাকায় শতবর্ষী বটগাছকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট। ছবি: আজকের পত্রিকা
হরিণাকুণ্ডুর চারাতলা বাজারের ঘোড়দহ এলাকায় শতবর্ষী বটগাছকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট। ছবি: আজকের পত্রিকা

এলাকার প্রবীণদের ভাষ্য, বহু বছর ধরে এই বটগাছ ছিল গ্রামের প্রাণকেন্দ্র। গরমের দুপুরে কৃষকেরা এখানে বিশ্রাম নিতেন। গাছের পাকা ফল খেতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসত। সকাল-বিকেল পাখির ডাকে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু এখন মানুষের কোলাহল ও ভিড়ে পাখিরা ধীরে ধীরে তাদের পুরোনো আবাস ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

পরিবেশ সচেতন ব্যক্তি ও প্রবীণ সাংবাদিক মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না, এটি একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। অসংখ্য পাখি, কীটপতঙ্গ ও ছোট প্রাণীর জীবন এমন গাছকে ঘিরেই গড়ে ওঠে। একটি শতবর্ষী গাছের শরীরে পেরেক ঠুকে বিনোদনের কাঠামো তৈরি করা প্রকৃতির প্রতি নির্মম আচরণ।’

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিনোদনের নামে এভাবে বটগাছকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে গাছটির ওপর নির্মিত ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো অপসারণ করে শতবর্ষী বটগাছটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

কাপাশহাটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হাকিম জানান, গত রোজার ঈদের আগে রেস্টুরেন্টটি তৈরি করা হয়েছে এবং এখনো কার্যক্রম চলছে। গাছের ক্ষতি হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার চোখে তেমন কোনো ক্ষতি ধরা পড়েনি।’

রেস্টুরেন্ট উদ্যোক্তাদের একজন আবির হাসান বলেন, ‘মাথায় আসা একটি চিন্তা থেকেই রেস্টুরেন্টটি তৈরি করেছি। জায়গাটি আগে অপরিচ্ছন্ন ছিল। পরে পরিষ্কার করে সুন্দর পরিবেশ তৈরি করেছি। গাছের ক্ষতি হয়—এমন কিছু করা হয়নি।’

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘কোনোভাবেই এটি ঠিক হয়নি। এভাবে পেরেক, লোহার পাত ও বিভিন্ন কাঠামো বসালে গাছের মারাত্মক ক্ষতি হবে।’ তিনি বলেন, বন বিভাগের আইনে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ফেনী ও পঞ্চগড়ের আলোচিত দুই এসপি প্রত্যাহার

৯০ লাখ ভোটার বাদ দিয়ে হারানো হয়েছে তৃণমূলকে, মমতার আবেদনে সাড়া দিলেন আদালত

বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণে ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর: শুভেন্দু

জঙ্গল সলিমপুরে হবে দুটি পুলিশ একাডেমি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

হাজিরা খাতায় মা উপস্থিত থাকলেও শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নেন ছেলে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত