Ajker Patrika

যশোর

ছয় মাসে ১৬ হত্যাকাণ্ড, বেড়েছে চাকুর ব্যবহার

  • নিহত ১৬ জনের মধ্যে ৯ জনকে চাকু ও ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
  • পুলিশ বলছে, অনলাইনে আধুনিক ছুরি ও চাকুর সহজলভ্যতায় এর ব্যবহার বেড়েছে।
জাহিদ হাসান, যশোর 
আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০২: ২০
ছয় মাসে ১৬ হত্যাকাণ্ড, বেড়েছে চাকুর ব্যবহার
প্রতীকী ছবি

গত ২৪ জুন যশোর সদর উপজেলার রঘুরামপুর গ্রামে বাড়ির পাশের ঝোপ থেকে সাইদ সরদার ওরফে ‘চশমা সাইদ’ (৩২) নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১২টি মামলার এই আসামিকে দুর্বৃত্তরা পা বেঁধে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। মাদক কারবার নিয়ে দুপক্ষের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ডে ঘটেছে বলে ধারণা পুলিশের। এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এর আগে, ২১ জুন চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের খালে ভাসমান অবস্থায় আতিয়ার রহমান (৪২) নামের একজন বিএনপিকর্মীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তে জানা যায়, তাঁকেও গলা কেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। বাঁওড় ইজারাকেন্দ্রিক পূর্ব বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পরিবারের দাবি।

থানা-পুলিশ ও বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, যশোরে চলতি বছরের ২৪ জুন পর্যন্ত এমন ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে গলা কেটে। অন্যগুলো পিটিয়ে বা গুলিতে। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৫টি ঘটেছে জুনে। মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা পূর্বশত্রুতার জেরে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। এ ছাড়া, প্রতিনিয়ত চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার বেড়েছে চাকু, ছুরি ও ধারালো অস্ত্রের।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, গুলি-বোমার বদলে যশোরে হত্যায় ছুরি-চাকুর ব্যবহার বেড়েছে। কাউকে গুলি বা বিস্ফোরক দিয়ে মারলে হত্যা মামলার পাশাপাশি অস্ত্র কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাও মোকাবিলা করতে হয়। এ ছাড়া ছুরি ও চাকু সহজলভ্য। বাড়তি মামলার ঝক্কি এড়াতে ছুরি-চাকুর ব্যবহার হয়ে আসছে বেশ আগে থেকে। তবে বছর তিনেক নানা অপরাধমূলক ঘটনায় ছুরি-চাকুর ব্যবহার বেড়েছে। সম্প্রতি বছরগুলোয় সংঘটিত হওয়া হত্যাকাণ্ডের ধরন পর্যালোচনা করে পুলিশ এ তথ্য পেয়েছে।

ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল

যশোর শহরে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমিক-প্রেমিকা বা যুগলদের লক্ষ্য করে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ায়। একটু ফাঁকা স্থানে কিংবা রিকশা চলাচলরতদের টার্গেট করে। এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চায়। সুযোগ বুঝে অস্ত্র ঠেকিয়ে নগদ অর্থ, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেয়।

এমন একটি ঘটনার ভুক্তভোগী কলেজশিক্ষার্থী সানি। ২ জুন হাসপাতালে রোগী দেখে সানি ও তাঁর বান্ধবী রিকশাযোগে শহরের মুজিব সড়ক দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তাঁদের গতিরোধ করে মোটরসাইকেলে আসেন দুই যুবক। তাঁরা রিকশা থেকে সানিকে নামিয়ে কৈফিয়ত তলব করেন, কেন তাঁরা ঘাড়ের ওপর হাত দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে কী সম্পর্ক, মোবাইল ফোন বের করতে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, বাসায় কল দিয়ে অভিভাবককে আসতে। অন্যদিকে, তাঁর বান্ধবীকে অপরজন উল্টো পাশে নিয়ে কাছে কত টাকা আছে, মোবাইল ফোন ইত্যাদি দিয়ে দিতে বলেন। কাছে চাকু থাকায় ভয়ে ভয়ে সানি তাঁর ওয়ালেটে থাকা এক হাজার টাকা দিয়ে দেন; কিন্তু নাছোড়বান্দা ছিনতাইকারীরা তাঁর বিকাশে থাকা টাকার অঙ্ক এবং ব্যাংকের ডেবিট কার্ড নিয়ে পাসওয়ার্ড বলতে বলেন।

সানি জানান, বিকাশ কিংবা কার্ডে কোনো টাকা নেই। একপর্যায়ে হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখা টাকাও দিতে বাধ্য হন। শেষে ছিনতাইকারীরা তাঁকে পরামর্শ দেন, এভাবে রাস্তাঘাটে মেয়েবন্ধু নিয়ে যেন আর না ঘোরেন। শুধু নতুন স্টাইলে ছিনতাই নয়, দিনে কিংবা সন্ধ্যায় নির্জন সড়কে যশোর ও শহরতলিতে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিনই ছিনতাইকারীদের কাছে জখম হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাও নিতে আসছেন অহরহ।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অধিকাংশ ঘটনার মোটিভ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং জড়িতদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি, তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

হত্যাকাণ্ডের ধরন প্রসঙ্গে সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধীরা একেক সময় একেক ট্রেন্ডিংয়ে থাকে। ভারী অস্ত্রের চেয়ে ছুরি ও চাকু কেনা এখন সহজলভ্য হয়ে গেছে। যে কেউ অনলাইনে কিনতে পারছে। এ বিষয়ে সরকারকে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কে অনলাইনে এসব পণ্য বিক্রি করতে পারবেন বা কে কিনতে পারবেন। তবে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ নিয়মিত টহল ও যশোরবাসীকে শান্তিতে রাখতে কাজ করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত