Ajker Patrika

৯ টাকার চারা রোপণে খরচ ৫০০ টাকা

আনোয়ার হোসেন, মনিরামপুর (যশোর)
৯ টাকার চারা রোপণে খরচ ৫০০ টাকা
নেট আর খাঁচা আছে। কিন্তু ভেতরে নেই চারা। গতকাল যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মশ্মিমনগর খালের তীরে। ছবি: আজকের পত্রিকা

যশোরের মনিরামপুরে সরকারি অর্থে দুটি খাল পুনঃখননের পর তীরে বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে নিম্নমানের চারা লাগিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) দপ্তরের বিরুদ্ধে। উপজেলার মশ্মিমনগর ও মোবারকপুর খালের তীরে ১৪০টি চারা রোপণে ৭০ হাজার ১৯৬ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। তবে সরেজমিনে কয়েকটি স্থানে চারা, বাঁশের খাঁচা ও নেট পাওয়া যায়নি।

পিআইও দপ্তরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি চারা রোপণ এবং তিন মাসের পরিচর্যায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০১ টাকা ৪০ পয়সা। এর মধ্যে ৫০ টাকা করে চারার দাম, ১২০ টাকা বাঁশের খাঁচা, ৫০ টাকা বাঁশের খুঁটি, ৭৫ টাকা নেট, ১৭ টাকা পরিবহন এবং ১৫০ টাকা পরিচর্যা বাবদ ধরা হয়েছে। ভ্যাট বাদ দেওয়ার পর এই হিসাব করা হয়েছে বলে দপ্তর সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা বন বিভাগে ৯ টাকা দরে আমলকী, অর্জুন ও জামের চারা বিক্রি হলেও পিআইও দপ্তর নিম্নমানের চারা ৫০ টাকা দরে কেনার হিসাব দেখিয়েছে। সে হিসাবে ১৪০টি চারা বন বিভাগ থেকে কিনতে খরচ হতো ১ হাজার ২৬০ টাকা। কিন্তু পিআইও দপ্তরের হিসাবে চারার পেছনেই ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭ হাজার টাকা।

মশ্মিমনগর ও মোবারকপুর খাল পুনঃখনন প্রকল্পের সভাপতি দুই ইউপি সদস্যের দাবি, চারা কেনা, রোপণ, খাঁচা এবং নেট লাগানোর সব কাজ করেছেন পিআইও দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী সরোয়ার হোসেন। তাঁরা শুধু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছেন।

মোবারকপুর খাল প্রকল্পের সভাপতি ও সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য হালিমা খাতুন বলেন, ‘চারা, নেট, খাঁচা—সব সরোয়ার ভাই কিনেছেন। আমি শুধু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছি।’ একই কথা বলেন মশ্মিমনগর প্রকল্পের সভাপতি সনৎ দত্ত।

তবে সরোয়ার হোসেন চারা কেনার জন্য পিআইও সেলিম খানকে দায়ী করেছেন। তাঁর দাবি, সরেজমিনে নার্সারিতে না গিয়ে মোবাইল ফোনে ভোজগাতী এলাকা থেকে পিআইও ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে চারা কিনেছেন।

পিআইও সেলিম খান অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চারা কেনা থেকে রোপণ—সব কাজ প্রকল্পের সভাপতিরাই করেছেন। সরোয়ার হোসেন তাঁদের সহযোগিতা করেছেন। পরে তিনি খরচের একটি হিসাব দিয়েছেন।

সরেজমিনে গত বুধবার মশ্মিমনগর ও মোবারকপুর খাল ঘুরে পিআইও দপ্তরের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার বেশ কিছু অমিল পাওয়া যায়। মোবারকপুর খালে ৫০টি চারা লাগানোর কথা থাকলেও পাঁচটির হদিস পাওয়া যায়নি। পিআইও দপ্তর জানিয়েছে, খাঁচাসহ পাঁচটি চারা চুরি হয়েছে। মশ্মিমনগর খালপাড়েও কয়েকটি খাঁচায় চারা পাওয়া যায়নি। কোথাও মৃত চারা, কোথাও নিম্নমানের চারা পাওয়া গেলেও কয়েকটি স্থানে নেট ও খুঁটি ছিল না।

দপ্তরের হিসাবে, ১৪০টি চারার জন্য বাঁশের খুঁটি বাবদ ৭ হাজার, নেট বাবদ ১০ হাজার ৫০০ এবং খাঁচা বাবদ ১৬ হাজার ৮০০ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। তবে সরেজমিনে এসব খরচের পুরোটা বাস্তবায়নের প্রমাণ মেলেনি।

চারা পরিচর্যায় তিন মাসে ২১ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। মশ্মিমনগর ও মোবারকপুরে পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা আব্দুল আলীম ও মতিয়ার রহমান জানান, তাঁরা এক মাসের জন্য ৫ হাজার টাকা করে পেয়েছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশ্মিমনগর ও মোবারকপুর খাল পুনঃখননে ৩৯ লাখ ২৫ হাজার ৫০২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। খাল খনন শেষে দুটি খালের তীরে যথাক্রমে ৯০ ও ৫০টি চারা লাগানো হয়। চারা হিসেবে অর্জুন, আমলকী, জাম ও আমড়া লাগানোর কথা বলা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সেলিম খান বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে গাছের চারার দাম একটু বেশি হয়েছে। উপজেলা বন বিভাগে ৯ টাকায় চারা পাওয়া যায়, তা জানা ছিল না।’ তাঁর দাবি, চারা রোপণের কাজ প্রকল্পের সভাপতিরাই করেছেন। অফিসের কেউ তাঁদের সহযোগিতা করে থাকতে পারেন।

চারা নিম্নমানের হওয়া, মারা যাওয়া বা না থাকার সুযোগ নেই দাবি করে সেলিম খান বলেন, তিন মাসের জন্য দুজনকে পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো গাছ মরে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রকল্পের সভাপতিদের নিজ খরচে তা প্রতিস্থাপন করতে হবে।

সরোয়ার হোসেনের বিষয়ে সেলিম খান বলেন, ২০২৪ সালের জুনে ইজিপিপি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তাঁদের বেতন বন্ধ রয়েছে। চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে তাঁরা মামলা করেছেন। মাস্টার রোলে প্রকল্পের সভাপতিদের সহযোগিতা করে সরোয়ার যে অর্থ পান, তা দিয়ে নিজের খরচ চালান।

অন্যদিকে মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, খালপাড়ে চারা লাগানোর কাজ পিআইও দপ্তর করেছে। তিনি সরেজমিনে গিয়ে চারাগুলো দেখবেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত