Ajker Patrika

বেনাপোলে আমদানি চিত্র: ভারতের ইলিশ হয়ে যাচ্ছে বরিশালের

জাহিদ হাসান, যশোর 
বেনাপোলে আমদানি চিত্র: ভারতের ইলিশ হয়ে যাচ্ছে বরিশালের
আগে ভারতে রপ্তানি হতো ইলিশ। এবার ভারত থেকেই আমদানি করা হচ্ছে। খোলাবাজারে তা বিক্রি হচ্ছে বরিশালের ইলিশ হিসেবে। সম্প্রতি যশোরের বড় বাজারে। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে কলকাতায় পদ্মার ইলিশ যাবে কি না, তা নিয়ে মুখিয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। দেশের বাজারে ইলিশের সংকট মেটাতে ভারত থেকেই ইলিশ আসছে। আর এই আমদানি করা ইলিশই যশোরে বিক্রি হচ্ছে ‘বরিশালের ইলিশ’ নামে। দামও চড়া। এতে করে দাম ও মান—দুই দিক থেকে প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহকেরা। এই পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার যশোরে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের।

বেনাপোল বন্দরের মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ১৯ আমদানিকারকের মাধ্যমে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টেই এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি।

জুলাইয়ে এসেছিল ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি। আমদানি করা এসব ইলিশের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ফেমাস ট্রেডার্স, সততা ফিশ ফিড, শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, স্বর্ণালী ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন আমদানিকারক এসব মাছ এনেছে।

আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হতো পদ্মার ইলিশ। চিত্রটা এবার বদলে গেছে। যশোরের ঐতিহ্যবাহী বড়বাজারে দোকান কিংবা আড়তে ভরে গেছে ভারতীয় ইলিশ। আমদানি করা ইলিশ কার্টন থেকে নামাচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। ইলিশের দামেও ভালো ঝাঁজ। বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়। আর ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে। ক্রেতারা মাছ হাতে নিয়ে দেখছেন, পেট পরীক্ষা করছেন, ওজন ও দাম জেনে দরদাম করছেন। তবে মাছের উৎস জানতে চাইলে কয়েকটি দোকানে বিক্রেতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে ‘বরিশালের ইলিশ’।

আব্দুল কাদের নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘দেশি ইলিশ মনে করেই একটি মাছ কিনেছি। পরে খাওয়ার পর বুঝতে পারি, মাছটির স্বাদ ও গন্ধ দেশি ইলিশের মতো নয়। দেখতে প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বিদেশি ও দেশি ইলিশের পার্থক্য বোঝা কঠিন।’

আমদানিকারকেরা জানিয়েছেন, ২৫২ টাকায় আমদানির পর এক কেজি ইলিশের দাম শুল্ক, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৫১৪ টাকা পড়ে। আমদানিকারকদের কাছ থেকে সেই মাছ যশোরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি। বিপরীতে একই আকারের দেশি ইলিশের দাম প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা কেজি। ফলে কম দামের কারণে ক্রেতাদের বড় একটি অংশ বিদেশি ইলিশের দিকে ঝুঁকছেন। পাইকার ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ অবশ্য স্বীকার করছেন আমদানি করা মাছের ভিন্নতার কথা। ভারত থেকে আসা ইলিশগুলোর চেহারা ও বৈশিষ্ট্যে তফাত আছে।

আলমগীর হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘দেশের বাজারে গুজরাট, মুম্বাই ও মিয়ানমারের ইলিশ ঢুকছে। এসব ইলিশ প্রতিটি কেজির ওপরে। পেটে ডিমে ভরা। স্বাদ নেই।’

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুজরাটের ভারুচ থেকে আসা ইলিশের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক হিসাব কিছুটা ভিন্ন। ভারতের বাজারে এই মাছের চাহিদা তুলনামূলক কম হলেও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাজারে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা রয়েছে।

এদিকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ নেওয়ার অনুমতি চাইছেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠান ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। ৯ সেপ্টেম্বর সংগঠনটি আলাদা চিঠি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। একই সময়ে বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে।

এ নিয়ে কথা হয় ইলিশ ব্যবসায়ী এরশাদ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গুজরাটের ব্যবসায়ীরা কম দামে বেশি ডিমওয়ালা ইলিশ বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সেই মাছের ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাতের পর রপ্তানি করছেন। মাছের বাকি অংশও লবণ দিয়ে সংরক্ষণ বা অন্যভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছেন। অন্যদিকে একই ভারতীয় ব্যবসায়ী সংগঠন বাংলাদেশের কাছে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ চাইছে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা আলাদা।’

যশোরে অভিযান

যশোর বড়বাজারে ভারতীয় ইলিশকে ‘বরিশালের ইলিশ’ বলে বিক্রির অভিযোগে এক আড়তদারকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গতকাল দুপুরে বাজারে অভিযান চালিয়ে কর্ণফুলী ফিশ নামের আড়তটিকে এই জরিমানা করা হয়। অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামানের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে আড়তদার ভারতীয় ইলিশের নির্ধারিত মূল্য ও ক্রয়-বিক্রয়ের কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। পরে তাঁকে নির্ধারিত মূল্যে ইলিশ বিক্রি এবং আমদানিসংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সময় খুচরা ও পাইকারি দোকানগুলোও মনিটরিং করা হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত