Ajker Patrika

এইচএসসি পরীক্ষা: বাসায় ডেকে পরীক্ষার্থীকে খাতায় লেখালেন পরীক্ষক

  • ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের খাতায় মোবাইল নম্বর লিখেছিল এক পরীক্ষার্থী।
  • ফোন পেয়ে গত ১৪ আগস্ট সকালে কয়েক পরীক্ষার্থী যায় পরীক্ষকের বাসায়।
  • ওই পরীক্ষার্থী পেয়েছিল ২৫ নম্বর। পরীক্ষককে ২ হাজার টাকা দিয়ে তা বাড়িয়ে করা হয় ৫০।
রিমন রহমান, রাজশাহী
এইচএসসি পরীক্ষা: বাসায় ডেকে পরীক্ষার্থীকে খাতায় লেখালেন পরীক্ষক
ছবি: সংগৃহীত

ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের খাতায় মোবাইল নম্বর লিখে এসেছিল এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী। খাতা দেখতে গিয়ে নম্বরটি চোখে পড়ে পরীক্ষকের। তিনি ফোন করে ডাকেন ওই পরীক্ষার্থীকে। সে গিয়ে দেখে, পেয়েছে ২৫ নম্বর। পরে পরীক্ষকের হাতে গুঁজে দেয় ২ হাজার টাকা। এরপর পরীক্ষক তাকে খাতা দেন লিখতে। লেখার পর তার নম্বর হয় ৫০।

গত ১৪ আগস্ট সকালে এমন ঘটনাই ঘটে রাজশাহীতে। আর ওই পরীক্ষার্থীর নাম মেহেদী হাসান। সে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর এলাকায় অবস্থিত আইডিয়াল ডিগ্রি কলেজের ছাত্র। মানবিক বিভাগ থেকে সে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। পুরো বিষয়ের সত্যতা স্বীকার করেছে মেহেদী।

অভিযুক্ত পরীক্ষক কে: পরীক্ষার্থী মেহেদী হাসান সেদিন রুহুল আমিন নামের অপর এক বন্ধুকে নিয়ে ওই পরীক্ষকের বাসায় গেলেও তাঁর পরিচয় জানাতে পারেনি। তবে আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এই পরীক্ষক কে। তাঁর নাম সেকেন্দার আলী। তিনি রাজশাহী নগরের হাজী জমির উদ্দীন সাফিনা মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইংরেজির প্রভাষক। মেহেদীর সঙ্গে এই প্রভাষকের কথোপকথনের রেকর্ড শুনে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হক মণ্ডল নিশ্চিত করেছেন, এই কণ্ঠ প্রভাষক সেকেন্দার আলীর।

ফোনকল রেকর্ডে কী আছে: দেখা করার আগে ওই পরীক্ষকের সঙ্গে মেহেদীর মোবাইলে কথোপকথন হয়। এতে শোনা যায়, সেকেন্দার আলী টাকা নিয়ে মেহেদীকে ডাকেন। বিষয়টি অভিভাবকদের জানাতেও নিষেধ করেন। মেহেদী বলে, টাকা নিতে হলে তো অভিভাবককে জানাতে হবে। পরীক্ষক তখন বলেন, ‘একজন ভিক্ষুকের কাছেও ২-১০-২০ হাজার টাকা থাকে।’

জবাবে মেহেদী বলে, ‘স্যার তো বুঝতে পারছেন, আমরা তো বেকার ছেলে, ভিক্ষুক না। ভিক্ষুকের কাছে তো টাকা থাকবেই, আমরা তো বেকার।’ পরীক্ষক বলতে থাকেন, ‘না না ঠিক আছে। আরও ক্যান্ডিডেটদের নিয়ে আসো।’

যেভাবে দেখা হয়: গত ১৪ আগস্ট সকালেই মেহেদী, ইমন আলী, সৌরভ, রুহুল, সোহাগ ও সামিসহ ছয়জন যায় রাজশাহীর বিনোদপুর বাজারে। কিছুক্ষণ পর একটি মোটরসাইকেলের পেছনে বসে আসেন পরীক্ষক। এরপর সেই পরীক্ষকের বাড়ি যায় তারা। তারপর বের করে দেন খাতা। মেহেদীর মোবাইল নম্বর লেখা খাতাটি সহজেই পাওয়া যায়, কিন্তু রুহুলের খাতা পাওয়া যায়নি। বাজারে অপেক্ষমাণ অন্য সহপাঠীদেরও খাতা পাওয়া যায়নি।

২৫ নম্বর হয় ৫০: ১৪ আগস্ট দুপুরেই মেহেদীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। সে জানায়, মোটরসাইকেলে প্রায় ১০ মিনিটে পরীক্ষকের বাড়িতে পৌঁছায়। কিন্তু জায়গাটা চেনে না। খাতায় লেখা শেষে পরীক্ষক নিজেই তাদের বিনোদপুরে রেখে যান।

মেহেদী জানায়, পরীক্ষক তাদের নাম জানাননি। বরং তার মোবাইল নিয়ে নিজের নম্বরটি ডিলিট করে দেন। মেহেদী বলে, ‘আমার খাতায় ২৫ মার্ক ছিল। স্যার ২ হাজার টাকা নিয়েছে। খাতায় লিখতে দিল। যেগুলো ভুল লিখেছিলাম সেগুলো ঠিক করে দিয়েছি। আর যেটা লিখিনি, সেটা ফাঁকা জায়গায় লিখে দিয়েছি।’ এখন কত নম্বর হয়েছে জানতে চাইলে মেহেদী বলে, ‘৫০ প্লাস হবে।’

পরীক্ষককে যেভাবে খুঁজে পাওয়া যায়: পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, ১৪ আগস্ট পরীক্ষক যে মোটরসাইকেলে এসেছিলেন সেটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর রাজশাহী-হ ১৫-২৪০৫। বিআরটিএ থেকে জানা যায়, গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন সুজন কুমার বিশ্বাসের নামে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গাড়িটি তিনি অনেক আগে বিক্রি করে দিয়েছেন। এভাবে গাড়িটি তিন হাত বদল হয়েছে। একপর্যায়ে রফিকুল ইসলাম সেন্টুকে পাওয়া যায়। তিনিই বর্তমানে মোটরসাইকেলটির মালিক। সেন্টু ওই প্রভাষকের আত্মীয়। তার বাড়ি চারঘাট উপজেলার কাকালকাটি গ্রামে। ৫ সেপ্টেম্বর সেন্টুর বাড়ির সামনেই ওই মোটরসাইকেল পাওয়া যায়। ওই এলাকার এক ব্যক্তিকে ছবি দেখাতেই তিনি প্রভাষক সেকেন্দার আলীর পরিচয় নিশ্চিত করেন। তাঁর বাড়ি বেলঘরিয়া গ্রামে।

সেদিন বিকেলে বাড়িতেই পাওয়া যায় সেকেন্দার আলীকে। ফোনকল রেকর্ড এবং ছবি দেখানো হলেও তিনি পরীক্ষার্থীকে বাসায় নিয়ে টাকার বিনিময়ে লেখানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন: হাজী জমির উদ্দীন সাফিনা মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হক মণ্ডল বলেন, অনেক আগে থেকে তাঁর কলেজের ইংরেজির প্রভাষক সেকেন্দার আলী এইচএসসির খাতা দেখেন। কিন্তু তিনি এমন কাজ করেন, তা জানেন না। এ জন্য শিক্ষা বোর্ড যদি কোনো পদক্ষেপ নিতে বলে, তাহলে তিনি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

এ ছাড়া মেহেদীর সঙ্গে এই প্রভাষকের কথোপকথনের রেকর্ড শুনে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেকেন্দার আলীর পরিচয় নিশ্চিত করেন।

এ নিয়ে কথা হয় রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. শামীম আরা চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এমন হলে এটা তো খুবই ভয়াবহ ঘটনা। আমরা এটা কোনোভাবেই বরদাশত করব না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত