
এ যেন এক সুরের সাম্রাজ্য! ঘরের মেঝেজুড়ে সাজানো সারি সারি বাদ্যযন্ত্রে বেজে ওঠে হরেক রকমের সুর। সেই সুর মন দোলায়, হৃদয় জুড়ায়। দোতারা, একতারা, ঢোল, খমক, বাঁশি, সারিন্দাসহ নাম না জানা শতাধিক বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে ছোট্ট একটি ঘরই যেন বাংলার লোকসংস্কৃতির জীবন্ত জাদুঘর। আর এই সুরের রাজ্যের কারিগর গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলী ইউনিয়নের গান্দিয়াসুর গ্রামের তরুণ সুনির্মল দাস বাপী।
শুধু বাদ্যযন্ত্র তৈরি করাই নয়, সেগুলো বাজিয়েও মানুষকে মুগ্ধ করেন তিনি। তাঁর হাতে যেন কথা বলে ওঠে কাঠ, বাঁশ আর চামড়ার তৈরি বাদ্যযন্ত্রগুলো। বহু বছর ধরে তিনি নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকবাদ্য সংরক্ষণে।
শৈশব থেকেই সুরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। পরিবারে ছিল সংগীতচর্চার পরিবেশ। ছোট বেলায় বাবার কাছে বাদ্যযন্ত্র তৈরির প্রথম পাঠ। সময়ের সঙ্গে সেই শেখা পরিণত হয় ভালোবাসায়। আর সেই ভালোবাসার মিশ্রণে দক্ষতা হয়ে ওঠে পরিচয়। প্রথমে প্রতিবেশী বর্ষীয়ান কারুশিল্পী বিজয় পাণ্ডের কাছ থেকে দোতারা ও বেহালা তৈরির হাতে খড়ি। এরপর একের পর এক যন্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা ও সফলতা। এখন তিনি শুধু একজন কারিগর নন, তিনি লোক ঐতিহ্যের একজন নীরব রক্ষক।
সুনির্মলের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় শতাধিক প্রকারের বাদ্যযন্ত্র। একতারা, দোতারা, ঢোল, সারিন্দা, খমক ছাড়াও মন্দিরা, ডুগডুগি, বেহালা, ডমরু, শিঙ্গাসহ আরও অনেক দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। এগুলোর অনেকগুলোই এখন দেশের কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্মের অনেকে এসবের নাম পর্যন্ত জানে না।
প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে লাগে আলাদা কৌশল। কোনটি তৈরিতে প্রয়োজন হয় শুকনো কাঠ, কোনটি বাঁশ, আবার কোনটি তৈরি হয় মাটি বা নারকেলের খোল দিয়ে। এরপর চামড়া, তার, পেরেক ও নানা উপকরণের সমন্বয়ে সম্পূর্ণ হয় একটি বাদ্যযন্ত্র। একটি যন্ত্র তৈরি করতে কখনো কয়েক দিন, আবার কোনটি তৈরি করতে কয়েক সপ্তাহও লেগে যায়।
সুনির্মল দাস বলেন, ‘আগে গ্রাম বাংলার পালাগান, যাত্রা, বাউলগান বা লোকজ অনুষ্ঠান এসব বাদ্যযন্ত্র ছাড়া কল্পনাই করা যেত না। এখন আধুনিক প্রযুক্তির কারণে লোকবাদ্যের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। কিন্তু আমি চাই আমাদের শিকড়ের এই সুর যেন হারিয়ে না যায়।’
তার কণ্ঠে আক্ষেপ থাকলেও তিনি আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে লোকবাদ্য আবার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে।
কেবল বাদ্যযন্ত্র তৈরি আর বাজানোতেই নিজেকে ব্যস্ত রাখেননি সুনির্মল। নতুন প্রজন্মের কাছে লোকবাদ্যের পরিচয় তুলে ধরতেও কাজ করছেন তিনি। শিশু-কিশোরদের বাদ্যযন্ত্র দেখান, বাজিয়ে শোনান, আবার বোঝান প্রতিটি যন্ত্রের ইতিহাস ও ব্যবহার। তাঁর স্বপ্ন একদিন এমন একটি কেন্দ্র গড়ে তুলবেন, যেখানে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র সংরক্ষণ ও শেখানো হবে নিয়মিত।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী এবং গোপালগঞ্জের ত্রিবেনী সংগীত একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা রাখাল কিশোর ঠাকুর বলেন, ‘সুনির্মল দাস বাপী আমাদের দেশের হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিজের প্রচেষ্টায় তৈরি ও সংরক্ষণ করছেন। এর মাধ্যমে আমাদের হারানো ঐতিহ্য সংরক্ষণ হচ্ছে। এমন একটি প্রতিভা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সুনির্মল দাস বাপীর মতন তরুণ শিল্পানুরাগী আরও বেশি বেশি দরকার। আর সেজন্যই সরকারিভাবে তাঁদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা করা দরকার।’
উদীচী শিল্পগোষ্ঠী, গোপালগঞ্জ জেলার সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সুনির্মল দাস বাপী অত্যন্ত শিল্পানুরাগী একজন মানুষ। তিনি বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেন এবং এগুলো যাতে হারিয়ে যেতে না পারে সে জন্য সেগুলো নিজে নিজে তৈরি করে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন, যা সত্যি প্রশংসনীয়।
গোপালগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার ফারহান কবীর সিফাত বলেন, ‘ফেলে দেওয়া বাঁশ, কাঠ, নারকেলের খোলের মধ্যেও যেন সুর খুঁজে পান সুনির্মল। বিভিন্ন লোক কথা আর গল্পের মধ্যেও তিনি খুঁজে ফেরেন আমাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের নকশা ও সুর। আর তার সঙ্গে নিজের অনুভূতি ও নকশা যোগ করে তৈরি করেছেন শতাধিক ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। সুনির্মলের মতো মানুষেরাই বাংলার সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে জীবিত রেখেছেন। তিনি শুধু বাদ্যযন্ত্র তৈরি করছেন না, সংরক্ষণ করছেন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিকড়ের পরিচয়। সুনির্মলের এমন কর্মকাণ্ড ধরে রাখতে প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা।’
আধুনিক এই দ্রুতগতির সময়ে যখন অনেক লোকজ উপাদান হারিয়ে যাচ্ছে, তখন সুনির্মল দাস বাপীর মতো মানুষেরা নীরবে মনে করিয়ে দেয় বাংলার মাটি, মানুষ আর সুরের বন্ধন এখনো অটুট। শত বাদ্যের এই কারিগর শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলার হারাতে বসা সুরের এক নিবেদিত প্রহরী।
প্রতিভাবান এই তরুণ শিল্পানুরাগী ২০১৭ সালে গোপালগঞ্জ সবকারী কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করেন। বর্তমানে তিনি ভেড়ারহাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে চাকরিরত। ২০১৭ সালে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁর তিন দিনের একটি প্রদর্শনী হয়। ২০১৪ সালে গোপালগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ডিজিটাল মেলায়, ২০১৫ সালে পৌর পার্কে উন্নয়ন মেলায়, ২০১৬ তে বিভিন্ন স্কুল কলেজে এবং ২০২২ সালে টুঙ্গিপাড়ায় অনুষ্ঠিত লোকজ মেলায় তাঁর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে।

মোহাম্মদপুরে এস আর ব্যাটালিয়নের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি, অভিযান পরিচালনার জন্য কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানো, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার এবং সাইবার মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে যত ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, তার সবগুলোই নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন আকারের ছোট-বড়...
৪ মিনিট আগে
কক্সবাজারের চকরিয়ায় একটি বসতঘর থেকে দেশীয় একটি একনলা বন্দুক উদ্ধার করেছে পুলিশ। অপর একটি অভিযানে পরিত্যক্ত স্থান থেকে গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
৫ মিনিট আগে
আন্তর্জাতিক সমমজুরি দিবস তাঁদের জন্য নতুন কোন অর্থ বহন করে না। উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও তাঁদের কপাল ফেরে না। একজনের আয়ে সংসার না চলায় ঘরের কাজের পাশাপাশি এসব নারী মাঠে নেমে আসেন কৃষিকাজের জন্য। কৃষিকাজে তাঁদের চাহিদাও রয়েছে। কিন্তু মজুরি এখনো বৈষম্যমূলক। এ অবস্থার অবসান চান তাঁরা।
৭ মিনিট আগে
ভোলায় ফেসবুকে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের পোস্টকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারিতে এক নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আজ শুক্রবার সকালে উপজেলার উত্তর জয়নগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নজির ব্যাপারী বাড়ি থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
১৩ মিনিট আগে