Ajker Patrika

ভুট্টার বীজ না কিনলে ‘সার নেই’ ডিলার খায়রুলের কাছে

মো. জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৮: ১৬
ভুট্টার বীজ না কিনলে ‘সার নেই’ ডিলার খায়রুলের কাছে
বিএডিসি ডিলার মো. খায়রুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

নিয়মবহির্ভূতভাবে স্ত্রী ও নিজের নামে দুটি ডিলারশিপ নিয়েছেন তিনি। তাঁরা দুজনই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তার ওপর অভিযোগ উঠেছে, নিজের বীজের দোকান থেকে ভুট্টার বীজ না কিনলে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করছেন না গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বিএডিসি ডিলার মো. খায়রুল ইসলাম।

২০২৬ সালের ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা’ অনুযায়ী কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে সারের ডিলারশিপ নিতে পারবেন না। এ ছাড়া একই পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তি বা সদস্য সারের ডিলারশিপ বা খুচরা বিক্রেতা হতে পারবেন না। অথচ এসব নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন খায়রুল ইসলাম। উল্টো ভুট্টার বীজ না কিনলে সার পাবেন না—এমন শর্তে এলাকার শত শত কৃষককে জিম্মি করে রেখেছেন।

মো. খায়রুল ইসলামের বাড়ি উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের পূর্ব বেলকা গ্রামে। তাঁর বাবা আলহাজ মো. মোজাব্বর হোসেন। খায়রুল ইসলাম বেলকা ডিগ্রি কলেজে ও তাঁর স্ত্রী বটতলা দাখিল মাদ্রাসায় কর্মরত। তাঁদের দুজনের নামে দুটি বিএডিসি ডিলারশিপ পরিচালনা করেন খায়রুল। একটি মেসার্স খায়রুল ইসলাম ও অন্যটি মেসার্স রুফাইদা ট্রেডার্স।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ফসল চাষের জন্য সরকারি বরাদ্দের সার নিতে গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের পক্ষ থেকে কৃষকদের ভুট্টার বীজ কিনতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। বীজ কিনতে রাজি না হলে সার দেওয়া হচ্ছে না।

কৃষকদের ভাষ্য, নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার কিনতে গেলেও ডিলারের পক্ষ থেকে ভুট্টার বীজ কেনার শর্ত দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রয়োজনীয় সার পেতে তাঁদের অতিরিক্ত পণ্য কিনতে হচ্ছে। সরকারি সার বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে তাঁদের দাবি।

বেলকা ইউনিয়নের পঞ্চানন্দ পলাশতলা গ্রামের মৃত বাচ্চা মণ্ডলের ছেলে কৃষক মো. বাবুল মণ্ডল (৫০) বলেন, ‘আমি খায়রুল ইসলামের ঘরে সার নিতে গিয়েছিলাম। তখন তাঁর ছেলে ঘরে ছিলেন। সার চাইলে তিনি বলেন, ‘‘একটা করে বিআরডির সার নিতে হলে চার প্যাকেট ভুট্টার বীজ নিতে হবে।’’ তখন আমি বলি, ‘‘ভাই, এখন তো আমার কাছে এত টাকা নেই। তা ছাড়া এখনো জমিতে ধান আছে। এত তাড়াতাড়ি ভুট্টার বীজ নিয়ে কী করব আমি?’’ তবু তিনি রাজি হননি।’

পঞ্চানন্দ পলাশতলা গ্রামের আরও এক কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম (৪৮) বলেন, ‘আমি খায়রুল ইসলামের ঘরে সার নিতে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, সার নিতে হলে ভুট্টা নিতে হবে, তা ছাড়া সার বিক্রি করব না। পরে আমরা কৃষি অফিসে এসে অভিযোগ দিই।’

বেলকা বাজারের কৃষক মো. আবদুর রহিম মিয়া (৫৫) বলেন, ‘সার এলেও নাটক শুরু হয়। বলে, ‘‘এখনো সার আসেনি, পরে আসেন।’’ তখন আবার গিয়ে দেখি ঘর বন্ধ। অথচ তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই ডিলার। সার পেলেই তাঁরা সারের একটা অংশ বাইরে বিক্রি করে দেন—এ ধরনের কথা শোনা যায়।’

আবদুর রহিম মিয়া বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের প্রতি অনুরোধ জানান।

এদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে সার ডিলার মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যাঁরা কৃষি অফিসে অভিযোগ দিয়েছেন, তাঁদের কেউ আমার ঘরে সার নিতে আসেননি। তাঁরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন।’

ডিলার খায়রুল ইসলামের দোকান। ছবি: আজকের পত্রিকা
ডিলার খায়রুল ইসলামের দোকান। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্বামী-স্ত্রী দুজনই ডিলার কি না—জানতে চাইলে ব্যস্ততার কথা বলে মোবাইল ফোনের সংযোগ কেটে দেন খায়রুল ইসলাম।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী হওয়ার পাশাপাশি বিএডিসির সার ডিলার হওয়া কতটা যুক্তিসংগত—এ প্রশ্নের জবাবে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

সরকারি সার বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সার বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতায় কোনো ঘাটতি নেই। তবে সব সময় কোনো ডিলারের কাছে কোনো উপসহকারীকে বসিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কারণ, তাঁদের আরও কাজ আছে। তাঁরা বিশেষ একটি দিনে বিশেষ একটি সময়ে ডিলার পয়েন্টে যান এবং খোঁজখবর নেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধানকে বলব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত