Ajker Patrika

মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনা

নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই সংস্থার রশি-টানাটানি

  • মেট্রোরেল আইন সংশোধনে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে প্রস্তাব ডিএমটিসিএলের।
  • প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত জানতে চেয়ে মহাসড়ক বিভাগের কয়েক দফা চিঠি ডিটিসিএ-কে।
  • মতামত না দিয়ে চিঠিতে ডিটিসিএ-কে পাশ কাটিয়ে আইন সংশোধনের উদ্যোগে জোর আপত্তি।
  • ডিটিসিএ বলেছে, ডিএমটিসিএল তাদের অধীন সংস্থা; প্রস্তাব তাদের মাধ্যমে যাওয়া সমীচীন।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই সংস্থার রশি-টানাটানি
ফাইল ছবি

মেট্রোরেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) মধ্যে আবার রশি টানাটানি চলছে। মেট্রোরেল পরিষেবাকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ ঘোষণার জন্য মেট্রোরেল আইন, ২০১৫ সংশোধনে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ডিএমটিসিএলের প্রস্তাব ঘিরে এবারের এই বিরোধ।

ডিটিসিএ বলছে, আইন অনুযায়ী মেট্রোরেল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ তারা। মেট্রোরেল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ডিএমটিসিএল তাদের অধীন সংস্থা। তাই সংশোধনের প্রস্তাব ডিটিসিএর মাধ্যমে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত। মতামত চাওয়ায় ডিটিসিএ তা না দিয়ে বরং আপত্তি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে।

ডিটিসিএর আপত্তিতে আইন সংশোধনের বিষয়টিও ঝুলে আছে।

সূত্র জানায়, মেট্রোরেলকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ ঘোষণা এবং মেট্রোরেল আইন, ২০১৫ সংশোধনের জন্য ডিএমটিসিএল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত জানতে চেয়ে ডিটিসিএ-কে চিঠি দেয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ও ২০২৫ সালের মে মাসে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এমন চিঠি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের ৪ জুন ডিটিসিএ তাদের আপত্তি ও মতামত মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এসব চিঠিতে প্রস্তাবিত সংশোধনে জোরালো আপত্তি জানিয়ে ডিটিসিএ বলেছে, আইন সংশোধনের প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ডিটিসিএর মাধ্যমেই প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো যুক্তিযুক্ত।

চিঠিগুলোতে বলা হয়েছে, মতামতের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ১৮ আগস্ট মন্ত্রণালয় থেকে আবারও মতামত চাওয়া হয়। এর জবাবে ২৭ আগস্ট চিঠি দিয়ে আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ডিটিসিএ।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ডিটিসিএর অধিভুক্ত একটি কোম্পানি ডিএমটিসিএল। নিয়ম অনুযায়ী অধীনস্থ কোনো কোম্পানি বা সংস্থা সরাসরি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা নয়। এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে হয়। এর আগে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্তেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার অধীন কোম্পানিগুলো যেমন সরাসরি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে না, ডিএমটিসিএলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। ডিটিসিএর পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বিষয়টি কঠোরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ডিটিসিএ বলছে, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১২-এর ধারা ১৯ অনুযায়ী ডিএমটিসিএল হলো ডিটিসিএর গঠিত একটি কোম্পানি। মেট্রোরেল আইন, ২০১৫-এর ধারা ২(৩) অনুযায়ী ডিটিসিএ হলো ডিএমটিসিএলের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ।

২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ডিটিসিএর অধীন সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানায় মাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) বাস্তবায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিএমটিসিএল গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়।

ডিটিসিএর যুক্তি, ভবিষ্যতে তাদের অধিক্ষেত্রে নির্মিত ও পরিচালিত অন্যান্য মেট্রোরেল প্রকল্পের কোম্পানিগুলোও মেট্রোরেল আইনের অধীনে লাইসেন্সি অপারেটর হবে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত সাবওয়ে, সিটি করপোরেশন কিংবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে পরিচালিত কোম্পানিও লাইসেন্সি অপারেটর হতে পারে। ফলে ডিএমটিসিএল বর্তমানে একমাত্র অপারেটর হলেও ভবিষ্যতে আরও প্রতিষ্ঠান মেট্রোরেল সেবা দেবে। এ কারণে মেট্রোরেল আইন কোনোভাবেই শুধু ডিএমটিসিএলের জন্য প্রণীত আইন নয়। লাইসেন্সি অপারেটর ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ একই প্রতিষ্ঠান হতে পারে না।

‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ নিয়ে প্রশ্ন

ডিটিসিএর সবচেয়ে বড় আপত্তি প্রস্তাবিত মেট্রোরেল আইনের সংশোধনের উদ্দেশ্য নিয়ে। ডিটিসিএ চিঠিতে বলেছে, পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুরো খসড়ায় ঢাকা মেট্রোরেল পরিষেবাকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ হিসেবে ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ নেই। বরং যাত্রীসেবার বিষয় সামনে রেখে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ডিটিসিএ-কে পাশ কাটিয়ে মেট্রোরেল আইন, ২০১৫ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। মেট্রোরেল পরিষেবাকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ ঘোষণার সঙ্গে বিদ্যমান মেট্রোরেল আইন সংশোধনের কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে একটি বিষয়কে সামনে রেখে অন্য একটি আইনের সংশোধনের উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ডিটিসিএ।

ডিটিসিএ বলেছে, মেট্রোরেল আইন, ২০১৫-এর স্পনসরিং এজেন্সি ডিটিসিএ। তাই আইনে কোনো পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেই প্রস্তাব নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ডিটিসিএর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে আসাই সমীচীন। মেট্রোরেল আইন সংশোধনের প্রয়োজন হলে বিষয়টি ডিটিসিএ-কে জানানোর জন্য ডিএমটিসিএল-কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।

ডিটিসিএর আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমটিসিএলের জনসংযোগ শাখা থেকে লিখিত বক্তব্যে আজকের পত্রিকাকে জানানো হয়েছে, মেট্রোরেলের সার্বিক ব্যবস্থাপনা সময়ের সঙ্গে যুগোপযোগী করার জন্য এবং অধিকতর ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে সংশোধিত আইন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং অনুমোদনের জন্য প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও ফিনল্যান্ডের মেট্রোরেল ব্যবস্থায় অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ পৃথক। এসব দেশে মেট্রোরেল পরিচালনা করে সংশ্লিষ্ট অপারেটর বা কোম্পানি। নিয়ন্ত্রক হিসেবে থাকে সরকার, নগর কর্তৃপক্ষ, পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা পৃথক সরকারি সংস্থা। ভারতের মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও নয়াদিল্লি মেট্রোর ক্ষেত্রেও অপারেটরদের ওপর সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের তদারকি রয়েছে।

আইন সংশোধনে ডিএমটিসিএলের প্রস্তাবে মতামত দেওয়া নিয়ে ডিটিসিএর আপত্তির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গতকাল শনিবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. জিয়াউল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ডিটিসিএ তার কাজ করছে, ডিএমটিসিএলও তার কাজ করছে। তাদের কাজের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ নেই। যদি তাদের মধ্যকার কোনো কাজের বিষয় হয় বা কোনো বিষয়ে আলোচনা বা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয় তা করবে। আমার জানা মতে, উভয় প্রতিষ্ঠানই ভালোভাবে কাজ করছে। তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, মেট্রোরেলও একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা। তাই এর সমন্বয়, নজরদারি ও কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব ডিটিসিএর অধীনেই থাকা উচিত। তবে লাইসেন্স বা নিরাপত্তা সার্টিফিকেট ডিটিসিএ সরাসরি দেবে না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও এ কাজে সক্ষম তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তা করাতে হবে। কারণ, অপারেটর নিজেই যদি নিজের নিরাপত্তা সার্টিফিকেট দেয়, তাহলে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স থাকে না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত