Ajker Patrika

কার্যকর গণতন্ত্র ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়: কামাল আহমেদ

ঢাবি প্রতিনিধি
কার্যকর গণতন্ত্র ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়: কামাল আহমেদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা) কর্তৃক আয়োজিত ‘গণতন্ত্রের উত্তরণ ও সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক বার্ষিক সেমিনার। ছবি: আজকের পত্রিকা

কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় উপদেষ্টা কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, পেশার মর্যাদা ও মতপ্রকাশের অধিকার–সবই একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রকৃত স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আজ রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা) কর্তৃক আয়োজিত ‘গণতন্ত্রের উত্তরণ ও সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক বার্ষিক সেমিনার ও দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।

কামাল আহমেদ বলেন, চল্লিশ বছর আগে সামরিক শাসনের সময় যেসব দাবি নিয়ে আন্দোলন করা হয়েছিল, আজও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও কার্যকর গণতন্ত্রের প্রশ্নে একই দাবিগুলো উচ্চারণ করতে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, দেশে গণতন্ত্র থাকলেও সেটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর গণতন্ত্রে রূপ নেয়নি। ফলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত মর্যাদাও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

কামাল আহমেদ বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের এক জরিপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে এক-তৃতীয়াংশ সাংবাদিক মনে করেন, তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও সাংবাদিকদের ওপর চাপের উদাহরণ তুলে ধরে কামাল আহমেদ বলেন, বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও এ সংকট থেকে মুক্ত নয়। তাই বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বড়।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কামাল আহমেদ বলেন, দেশজুড়ে সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক, প্রশাসন, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি।

এ উপদেষ্টা বলেন, একজন সাংবাদিক যদি অর্থনৈতিকভাবে অনিরাপদ থাকেন বা কারও ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে যায়।

গণমাধ্যমের মালিকানা ও সংখ্যা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক সংবাদপত্র ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থাকলেও এর বড় একটি অংশের প্রকৃত পাঠক বা দর্শক নেই। অনেক ক্ষেত্রেই গণমাধ্যম রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য পরিচালিত হচ্ছে। এতে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এখন যাচাই-বাছাইহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য সঠিক হলেও প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট ছাড়া প্রকাশিত হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। ফলে গণমাধ্যমে এক ধরনের কোলাহল সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে সবাই কথা বলছে কিন্তু কেউ কারও কথা শুনছে না।

কামাল আহমেদ বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে গণমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রণ জরুরি। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি নৈতিক মানদণ্ড প্রণয়ন এবং একটি স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। সম্পাদকদের সংগঠন ইতিমধ্যে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বলেও তিনি জানান।

সাংবাদিকতা পেশার ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে কামাল আহমেদ বলেন, বর্তমানে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী সাংবাদিকতায় আসতে আগ্রহী হন না, কারণ পেশাটি আর্থিকভাবে যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমকে টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারলে এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে সাংবাদিকতা আবারও মেধাবীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের কলমের শক্তি অত্যন্ত বেশি। তবে সেই শক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন সাংবাদিকেরা ব্যক্তিগত পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠভাবে সংবাদ পরিবেশন করবেন। তিনি বলেন, কোনো মানুষই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব মতাদর্শ থাকে। কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের সময় সেই পক্ষপাতকে নিয়ন্ত্রণ করে সত্য ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করাই সাংবাদিকের দায়িত্ব।

উপাচার্য বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের সংবাদমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সাহসী, তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি নতুন নেতৃত্বকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

ওবায়দুল ইসলাম আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা যেন আর পিছিয়ে না যায়। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের কাজের প্রতিফলন সমাজ ও রাষ্ট্রে পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির বর্তমান ও সাবেক নেতৃবৃন্দ, সদস্যবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা। অনুষ্ঠানে ডুজার নবনির্বাচিত কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত