Ajker Patrika

রিক্রুটিং এজেন্সির গ্রেডিং ব্যবস্থা চালু হয়নি, অনিশ্চয়তায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা

• অভিবাসন ব্যয় ও প্রতারণা কমাতে স্বচ্ছ নিয়োগ

• নিবন্ধিত সাব-এজেন্ট এবং জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৮: ৩৩
রিক্রুটিং এজেন্সির গ্রেডিং ব্যবস্থা চালু হয়নি, অনিশ্চয়তায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা
উইটনেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘অনিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন প্রতিরোধ এবং সাব-এজেন্টের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক অভিবাসন সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

বিদেশে কর্মী পাঠানো রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মান যাচাইয়ের কার্যকর গ্রেডিং ব্যবস্থা এখনো চালু করতে পারেনি সরকার। ফলে বিদেশে চাকরির জন্য অর্থ ব্যয়ের আগে কোন এজেন্সি নির্ভরযোগ্য, তা যাচাই করার নির্ভরযোগ্য সরকারি ব্যবস্থা পাচ্ছেন না অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। একই সঙ্গে সাব-এজেন্টদের নিবন্ধন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে জোর দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আজ বুধবার দুপুরে উইটনেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘অনিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন প্রতিরোধ এবং সাব-এজেন্টের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক অভিবাসন সংলাপে এসব কথা বলেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর। তিনি বলেন, বিদেশে চাকরি নিতে আগ্রহী নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষকেও কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির বিষয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সুপারিশ করতে পারেন না তিনি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হলেও এজেন্সিগুলোর শ্রেণিবিন্যাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

প্রতিমন্ত্রী জানান, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সাব-এজেন্টদের তথ্য জমা দেওয়ার সফটওয়্যার সুবিধাও এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। ভবিষ্যতে এজেন্সিগুলোকে তাদের প্রতিনিধিদের তালিকা জমা দিতে হবে এবং তা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এতে বিদেশগামী কর্মীরা টাকা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির পরিচয় যাচাই করতে পারবেন।

গ্রামপর্যায়ে অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দিতে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে তথ্য ও কর্মী-তথ্যভান্ডারের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাবকে স্বাগত জানান প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে সম্ভাব্য অভিবাসীদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণ কোর্সের সামঞ্জস্য এবং প্রশিক্ষণ শেষে কতজন বিদেশে চাকরি পাচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেন প্রতিমন্ত্রী।

সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ শতাংশ কমেছে। উইটনেস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী জানান, এ সময়ে বিদেশে গেছেন ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জন কর্মী। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯২। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

পারভেজ সিদ্দিকীর উপস্থাপনায় বলা হয়, বিদেশে যেতে একজন কর্মীর নিয়োগসংক্রান্ত ব্যয় তুলে আনতে গড়ে প্রায় ১৪ মাস সময় লাগে। এ খাতে ১ হাজার ৪১৪টি অভিযোগের মধ্যে ৭৮৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক কর্মীর কাছে অর্থ পরিশোধের রসিদ বা প্রমাণ না থাকায় মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পারভেজ সিদ্দিকী আরও বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বিদেশগামী কর্মীদের ৭৩ শতাংশই সৌদি আরবে গেছেন বলে তাঁর উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।

ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক অভিযোগ করেন, অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি অর্থ আদায় করলেও রসিদ দেয় না। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে লেনদেন হওয়ায় দায় নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু এজেন্সির বিরুদ্ধে ভিসা কেনাবেচার অভিযোগও তোলেন তিনি।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী আবুল কালাম বলেন, ২০২০ সালে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর শ্রেণিবিন্যাসের ব্যবস্থা চালু করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। বিদেশে নিজস্ব প্রতিনিধি থাকার পরিবর্তে এজেন্সিগুলো কেন ভিসার মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়া কিংবা বিদেশে যাওয়ার তিন মাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসার ঘটনাগুলোর কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের আইনজীবী ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, আইনে সাব-এজেন্টদের স্বীকৃতি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৩ সালের আইনি সংশোধন এবং ২০২৫ সালের বিধিমালার প্রসঙ্গ তুলে তিনি নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারীদের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের প্রস্তাব দেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রেহনুমা সালাম খান বলেন, সমস্যার গভীরে রয়েছে সুশাসনের ঘাটতি। কতজন কর্মী বিদেশে পাঠানো হলো, শুধু সেই সংখ্যা দিয়ে সাফল্য পরিমাপ না করে তাঁদের দক্ষতা, কর্মপরিবেশ, সুরক্ষা এবং অভিবাসীদের অভিযোগ কমছে কি না—এসব বিষয় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম সচিব ফখরুল ইসলাম নিয়োগপ্রক্রিয়ার অনলাইন রেকর্ড রাখার প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, নির্বাচিত কর্মী ও অনুমোদিত খরচের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ এবং ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন নিশ্চিত করা গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়কারী এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় চাকরিপ্রার্থীরা ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত পথে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ, চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) প্রতিনিধি আহমেদ আজিজ নিয়োগপ্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার এবং সহজলভ্য অভিযোগ ব্যবস্থার আহ্বান জানান। অভিবাসনবিষয়ক বৈশ্বিক চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পরিমাপেরও তাগিদ দেন তিনি।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমাদুল হক জানান, অভিবাসন ব্যয় পর্যালোচনায় একটি কমিটি কাজ করছে। তবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিয়োগ সীমিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এবং যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) অর্থায়নে পেরি কর্মসূচির আওতায় উইটনেস ফাউন্ডেশন ঢাকার হলিডে ইন সিটি সেন্টারে এ সংলাপের আয়োজন করে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত