Ajker Patrika

ইসরায়েলে নির্বাচন: প্রথমবারের মতো রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে আরবরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইসরায়েলে নির্বাচন: প্রথমবারের মতো রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে আরবরা
ইজরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের দিন টেলিভিশনে প্রথম বুথফেরত জরিপের (এক্সিট পোল) ফলাফল প্রকাশের পর উত্তর ইজরায়েলের নাজারেথ শহরে আরব নেতৃত্বাধীন দল জয়েন্ট লিস্টের নির্বাচনী কার্যালয়ে সমর্থকদের উল্লাস প্রকাশ। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে রেকর্ডসংখ্যক ১৮টি আসন পেতে যাচ্ছে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো। গতকাল মঙ্গলবারের নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে এমন আভাস পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটদানের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। নির্বাচনের ফলাফলে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে—বুথফেরত জরিপের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে আরব নেতৃত্বাধীন প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট উভয়ই ৫১টি করে আসন পেতে পারে বলে জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ মঙ্গলবার জানায়, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটদানের হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। ১৯৯৯ সালের রেকর্ড ছাড়িয়ে এই হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আরব দল

রা’আম বা ইউনাইটেড আরব লিস্টের নেতা মানসুর আব্বাস আশা প্রকাশ করেছেন, নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে তাঁর দলসহ নেতানিয়াহুবিরোধী জোট ৬১টি আসন পাবে। ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে আব্বাস বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের হাতে যে সংখ্যাগুলো রয়েছে, তা দিয়ে সরকার গঠন সম্ভব নয়।’

বর্তমানে নেসেটে আব্বাসের দল রা’আমের পাঁচটি আসন রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলে ক্ষমতায় থাকা জোট সরকারেও অংশ নিয়েছিল দলটি। আব্বাস জানান, নির্বাচনের আগে ও পরে ইসরায়েলের প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটই তাঁর দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

‘আরবদের বাইরে রাখা যায় না’

ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিঙ্কাস আল জাজিরাকে বলেন, গাদি আইজেনকোটের মতো বিরোধী দলগুলোর জন্য সরকার গঠন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর আগে প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে আইজেনকোটের দলকে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় এসব দল আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

পিঙ্কাস বলেন, ‘এর জন্য মূল্য দিতে হবে।’ তাঁর ভাষায়, ‘আরবদের বাইরে রাখা যায় না; আবার যখন তাদের ভোটের প্রয়োজন হবে, শুধু তখনই তাদের বিবেচনায় নেওয়া এবং নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করাও যায় না।’ তিনি আরও বলেন, আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দাবি জানাবে, যেগুলো ইহুদি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

আরবদের ভোট নিয়ে নেতানিয়াহুর প্রচার

নির্বাচনের দিন মঙ্গলবার শেষ মুহূর্তে নেতানিয়াহু ও তাঁর কট্টর ডানপন্থী জোট সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যেতে জোর প্রচেষ্টা চালায়। এ সময় তারা ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আনে। আরব রাজনীতিকেরা এই কৌশলকে বর্ণবাদী ও উসকানিমূলক বলে নিন্দা জানান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পতাকাবাহী কয়েকটি গাড়ি জেরুজালেমের বিভিন্ন সড়কে ঘুরে বেড়ায়। গাড়িগুলোতে উচ্চ শব্দে আজান বাজানো হচ্ছিল। পাশাপাশি সমর্থকদের ভোট দিতে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছিল, কারণ ‘আরবরা ভোট দিচ্ছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে নেতানিয়াহু আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ সারির ছবি তুলে ধরেন। তিনি একটি ছবিও প্রকাশ করেন, যেখানে তাঁর দাবি অনুযায়ী, আরব ভোটারদের ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে নিকাব পরা নারীরাও ছিলেন। নিকাব এমন একধরনের মুখাবরণ, যা মুখের নিচের অংশ ঢেকে রাখে।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা যদি এখনই সজাগ না হই, তাহলে নিজেদের মানসুর আব্বাস ও আহমাদ তিবির নেতৃত্বাধীন একটি সরকারের অধীনে দেখতে পাব।’ তিনি নেসেটের দুই বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি সদস্যের কথা উল্লেখ করেন।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের নির্বাচনে সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ১৯৯৯ সালের পর এটিই দেশটির সর্বোচ্চ ভোটদানের হার। প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ। ঐতিহাসিকভাবে ইহুদি ইসরায়েলিদের তুলনায় তাঁদের ভোটদানের হার কম ছিল। এবারের নির্বাচনে তাঁদের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো নেসেটে রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে পারে বলে বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে।

‘ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলিদের জন্য অস্তিত্বের সংকটময় মুহূর্ত’

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে প্রতিবেদন দিতে গিয়ে আল জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহ এবারের নির্বাচনকে ‘ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলিদের জন্য অস্তিত্বের সংকটময় মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, রেকর্ডসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটারগোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এমন অনেকেও ভোট দিয়েছেন, যাঁরা সাধারণত নির্বাচন বর্জন করেন। অতীতে তাঁদের বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে অংশ নিয়ে কোনো ধরনের প্রভাব তৈরি করা সম্ভব নয়, তাঁদের বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটবে না কিংবা তাঁদের মুখোমুখি হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের অবসান হবে না।

নূর ওদেহ আরও বলেন, ইসরায়েলের নেসেট ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক ১০০ টিরও বেশি আইন পাস করেছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রের তহবিল ও সরকারি অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁরা বৈষম্যের শিকার হন।

নির্বাচনের বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ১৮টি আসন এবং দুই প্রধান জোটের ৫১টি করে আসনের হিসাব সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আগে আসনসংখ্যা ও সরকার গঠনের সম্ভাব্য চিত্রকে বুথফেরত জরিপের ইঙ্গিত হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত