Ajker Patrika

লাইফলাইন গ্রাহকদের ৮৭ শতাংশের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে, ৬৯ শতাংশের বেড়েছে বিলের চাপ: জরিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
লাইফলাইন গ্রাহকদের ৮৭ শতাংশের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে, ৬৯ শতাংশের বেড়েছে বিলের চাপ: জরিপ
গণসংলাপে প্রধান অতিথির হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। ছবি: আজকের পত্রিকা

গত এক দশকে নিম্ন আয়ের পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার, জীবনমান, শিক্ষা ও নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি আয়ের তুলনায় বিলের চাপও বেড়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভা এলাকার ৫৫৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত এক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের ৮৭ শতাংশ জানিয়েছে, গত ১০ বছরে তাদের মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে। ৭৭ শতাংশ পরিবারের বিদ্যুৎ চালিত যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বেড়েছে। অন্যদিকে, ৬৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের আয়ের তুলনায় বিদ্যুৎ বিলের চাপ বেড়েছে।

আজ বুধবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও ক্যাব যুব সংসদ আয়োজিত ‘রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও শৈলকুপা পৌরসভা এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাব্যতা যাচাই ও লাইফলাইন গ্রাহক সমীক্ষা: ফলাফল ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক গণসংলাপে জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়।

জরিপের ফলাফলে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম বলেন, আগে মূলত ঘরে আলোর জন্য বিদ্যুতের সংযোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে গৃহস্থালি কাজ, বিনোদন, শিক্ষা, যোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবায় এর ব্যবহার বেড়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, গত ১০ বছরে টেলিভিশনের মালিকানা ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৮ শতাংশ, ফ্রিজের মালিকানা ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ এবং কম্পিউটার বা ল্যাপটপের মালিকানা ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। মোবাইল ফোনের চার্জার ব্যবহারের হারও ৬৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮ শতাংশ হয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বিদ্যুতের কারণে ঘরে পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়েছে। ৪৮ শতাংশ পরিবার অনলাইন শিক্ষা এবং ৬৫ শতাংশ পরিবার ঘরে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ৪৪ শতাংশ নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। শিক্ষার্থী রয়েছে এমন পরিবারগুলোর মধ্যে দৈনিক এক ঘণ্টার বেশি পড়াশোনার হার ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর আয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া গেছে। মাসিক আয় ১০ হাজার টাকার কম এমন পরিবারের হার ৪১ শতাংশ থেকে কমে ২১ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে মাসিক আয় ২০ হাজার টাকার বেশি এমন পরিবারের হার ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ শতাংশ হয়েছে।

জরিপে ২১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের আয়ের উৎস পরিবর্তিত হয়েছে এবং তারা নতুন আয়ের কাজ শুরু করেছে। তবে বিদ্যুতের সহায়তায় নতুন আয়ের কাজ বা ব্যবসা শুরু করেছে মাত্র ১০ শতাংশ পরিবার। অধ্যাপক এম. শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুফল জীবনমান ও গৃহস্থালি সুবিধায় বেশি দৃশ্যমান হলেও উৎপাদনশীল কাজে এর ব্যবহার এখনো সীমিত।

জরিপে অংশ নেওয়া ৮৯ শতাংশ পরিবার মনে করে, বিদ্যুৎ তাদের জীবনমান উন্নত করেছে। ৮২ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, রাতে তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। এ ছাড়া ৮১ শতাংশ পরিবার মনে করে, বিদ্যুতের ব্যবহারে নারীদের গৃহস্থালি কাজের সময় কমেছে। ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বেড়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, ১০ বছর আগে ৪২ শতাংশ পরিবার আলোর জন্য কেরোসিনের বাতি ব্যবহার করত। বর্তমানে মাত্র ২ শতাংশ পরিবার নিয়মিত কেরোসিন বা মোমবাতি ব্যবহার করে। ৫৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা এখন আর কেরোসিন বা মোমবাতি ব্যবহার করে না।

বিদ্যুতের ব্যবহার ও জীবনমানের উন্নতি হলেও বেড়েছে ব্যয়ের চাপ। জরিপে ৬৩ শতাংশ পরিবার সেবার আরও উন্নতি প্রত্যাশা করে। তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের ভর্তুকি পর্যাপ্ত নয়।

জরিপে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার ৩৩৪টি এবং ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভা এলাকার ২২২টি পরিবার অংশ নেয়।

অনুষ্ঠানে জরিপের পাশাপাশি চারটি এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়। শামসুল আলম জানান, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৫২ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ১৫০টি কলেজ এলাকায় ৫১ দশমিক ১২ মেগাওয়াট, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৪ দশমিক ৬৩ মেগাওয়াট এবং শৈলকুপা পৌরসভা এলাকায় ৪ দশমিক ৩৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা ১৩২ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট।

গণসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিদ্যুৎ খাতের যে হযবরল বা নয়-ছয় আমরা বিগত সময়ে দেখেছি তা যেন আর না হয়। বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতে আওয়ামী লীগ সরকার দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল।

তিনি আরও বলেন, ছাদভিত্তিক বা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ এর দ্বার খুব সম্ভাবনাময়। অষ্ট্রেলিয়া ভিত্তিক একটা দল বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুত এর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন।

জ্বালানি সংকট বৈশ্বিক সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুদ্ধ চলছে, হরমুজ দিয়ে জাহাজ আসতে পারছে না। তবে ধীরে ধীরে সংকট কাটছে। রিজভী আরও বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিটি খাত ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের প্রতিটি কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, অনেক দরিদ্র পরিবার অন্যের সঙ্গে বিদ্যুৎ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে। ফলে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দিয়ে হতদরিদ্র মানুষের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা কঠিন।

অনুষ্ঠানে ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির, সাংবাদিক কাজল রশীদ, জরিপের গবেষণাকর্মী শাকিল কবির, লেখক আনিস রায়হান, প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত