Ajker Patrika

দুর্গন্ধ যাচ্ছেই না, নিষ্ফল ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প

আবুল বাসার সাজ্জাদ, ঢাকা
দুর্গন্ধ যাচ্ছেই না, নিষ্ফল ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প
হাতিরঝিলের নষ্ট পানি ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। গতকাল তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজধানীর যানজট নিরসনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা হাতিরঝিল প্রকল্প একই সঙ্গে দারুণ দৃষ্টিনন্দন। নগরবাসীর অবসর বিনোদনের অন্যতম গন্তব্য। কিন্তু প্রকল্পটি যার নামে, সেই হাতিরঝিলের পানিতে অসহনীয় দুর্গন্ধের ভোগান্তি কমছে না। বিশাল এই জলাশয়ের পানি শোধনে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া একটি প্রকল্প পরে বন্ধ হয়ে যায়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দূষণের উৎস বন্ধ না হলে লেকের পানি শোধনের উদ্যোগে সাময়িক উপকার মিলবে মাত্র।

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (প্রকল্প ও ডিজাইন) মো. মুজাফফর উদ্দিন বলেন, ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন লাইন দিয়ে আসা বর্জ্য হাতিরঝিলের পানিতে মিশছে। দূষণের উৎস বন্ধ না হলে পানি শোধনের উদ্যোগে সাময়িক উপকার মিললেও স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

সরেজমিন দেখা যায়, হাতিরঝিলে বেড়াতে আসা মানুষকে পানির দুর্গন্ধে অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে। লেকের পাড়ে হাঁটাহাঁটি কিংবা ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাতায়াতের সময়ও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিলের পানি ঘেঁষে সবুজ ঘাসের ওপর বসতে অনেকের ইচ্ছা হয়। কিন্তু দুর্গন্ধের কারণে তা প্রায় অসম্ভব।

বন্ধুদের সঙ্গে হাতিরঝিলে এসেছিল দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. অয়ন। কিছুটা সময় প্রকৃতির সঙ্গে কাটাতে সেখানে এলেও পানির দুর্গন্ধে তার আনন্দ অনেকটাই মাটি হয়ে যায়।

অয়ন এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘হাতিরঝিলে ঘুরতে ভালো লাগে। কিন্তু পানির কাছে গেলেই দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। লেকের পাড়ে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আর সওয়া যাচ্ছিল না। আমরা তাই উঠে এসেছি।’

রামপুরার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা বিথী ইসলাম বন্ধুকে নিয়ে হাতিরঝিলের গুলশান ঘাট থেকে ওয়াটার ট্যাক্সিতে রামপুরায় ফিরছিলেন। পুরো যাত্রাপথে পানির দুর্গন্ধে নাকমুখ কুঁচকে ছিলেন তাঁরা।

বিথী ইসলাম বলেন, ‘সঙ্গে মাস্ক না থাকায় পানির গন্ধের কারণে বেশ কষ্ট হলো। বাধ্য হয়ে নাক চেপে ধরে পথটা পার হলাম। ঘুরতে এসেছি একটু ভালো পরিবেশের জন্য, তবে এমন দুর্গন্ধের বিষয়টা মেনে নেওয়ার মতো না।’

ঝিলের অদূরের এফডিসি এলাকার বাসিন্দা সাইদুল আলম বলেন, কুনিপাড়া ও এফডিসি মোড়ের দিকে দুর্গন্ধ বেশি।

উত্তরা থেকে বেড়াতে আসা নূরে আলম, মগবাজারের মো. হাসানও এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে হাতিরঝিলের পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা-আবর্জনা থাকার অভিযোগ করলেন।

হাতিরঝিলের পানিদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে পয়োবর্জ্য ও শিল্পকারখানার বর্জ্য প্রবেশের বিষয়টি সামনে এসেছে। আশপাশের এলাকার নালা ও বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থার মাধ্যমে এসব দূষিত পদার্থ লেকে এসে মেশে। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় বেড়াতে আসা এবং আশপাশের বাসিন্দাদের একাংশের আবর্জনা ফেলার প্রবণতা আছে বলে জানা গেছে।

সেনাবাহিনীর নির্মাণকাজের পর ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে হাতিরঝিল প্রকল্প জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ক্রমে লোকসমাগম বাড়তে থাকলে বিশেষ করে শুকনা মৌসুমে পানির বর্জ্য ও দুর্গন্ধের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এর ধারাবাহিকতায় লেকের দূষিত পানি শোধনের জন্য ২০১৮ সালে ‘হাতিরঝিল লেকের দূষিত পানি পরিশোধন’ প্রকল্পে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। প্রসঙ্গত, কয়েক বছর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকার পর প্রকল্পের দেখভালের দায়িত্ব রাজউকের হাতেই যায়।

দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজউকের বক্তব্য

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. মুজাফফর উদ্দিন বলেন, পানি পরিশোধন প্রকল্পের কাজ করেছিল স্ট্রাক্টর নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত লেকে তাদের স্থাপন করা যন্ত্রপাতি চালু ছিল। পরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া এবং যন্ত্রপাতিতে লিকেজ দেখা দেওয়ায় পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

প্রধান প্রকৌশলী জানান, এখন রাজউক আবার নিজস্ব অর্থায়নে পানি পরিশোধনের যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ কাজে আগের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই মাসের মধ্যে যন্ত্রপাতি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মো. মুজাফফর উদ্দিন মনে করেন, প্রকল্পটি আবার চালু হলেও দূষিত পানির লেকে প্রবেশ অব্যাহত থাকলে দুর্গন্ধের স্থায়ী সমাধান হবে না। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির সময় বাড়তি পানি নিষ্কাশনের জন্য হাতিরঝিলের বিশেষ ডাইভারশন কাঠামোর গেট খুলে দিতে হয়। তা না হলে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। এ সময় বিভিন্ন ড্রেন ও লাইন দিয়ে ময়লা পানি লেকে প্রবেশ করে। এই উৎস বন্ধ না করা পর্যন্ত লেক পরিষ্কার রাখার চেষ্টা হয়তো সাময়িক উপশম হবে।’

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলীর মতে, ঢাকা ওয়াসার ডাইভারশন লাইন সম্পন্ন না হলে হাতিরঝিলের পানিদূষণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ওয়াসার নেওয়া প্রকল্পটি শেষ হলে লেকে দূষিত পানি প্রবেশের চাপ কমবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

বিশেষজ্ঞ যা বললেন

নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, হাতিরঝিলে বছরের পর বছর ধরে পয়োবর্জ্য ও বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য মিশছে। এ কারণে সেখানকার দুর্গন্ধের সমস্যা কমছে না। বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।’

আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, পয়োবর্জ্য ও শিল্পকারখানার বর্জ্যের সরাসরি নির্গমন বন্ধ করা না গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য বর্জ্য নির্গমনের উৎস বন্ধ করা, নিয়ম ভাঙলে জরিমানা করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, সেপটিক ট্যাংকসহ বিকল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিল্পকারখানার মালিকদেরও সচেতন করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত