Ajker Patrika

কক্সবাজারে আগুন: ‘দূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম স্বজনেরা পুড়ে মরছেন’

কক্সবাজার প্রতিনিধি ও ঢামেক প্রতিবেদক
কক্সবাজারে আগুন: ‘দূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম স্বজনেরা পুড়ে মরছেন’
কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় আহত রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা মেহেরুননেসা। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। ছবি: আজকের পত্রিকা

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন লাগার পর বাঁচার আসা ছেড়েই দিয়েছিলেন মেহেরুননেসা মিলা (৩০)। তাঁর মনে হয়েছিল, মরার আগে হয়তো আর কাউকে দেখতে পাবেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাফিয়ে পড়ে প্রাণে বেঁচে যান তিনি ও তাঁর স্বামী মাসুদ মিয়া। গুরুতর আহত হন দুজনই। এরপর দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনে রিসোর্টের মধ্যে স্বজনদের পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা তাঁরা দেখেন দূর থেকে। তাঁদের উদ্ধারে কিছুই করার ছিল না তাঁদের। মেহেরুননেসা চিকিৎসাধীন আছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে গত শুক্রবার সকালে। এ ঘটনায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পশ্চিম নন্দীপাড়ার বাসিন্দা মেহেরুননেসার স্বজন। বাকি ৪ জন যশোরের একই পরিবারের সদস্য বলে দাবি করেছেন তাঁদের স্বজনেরা।

রিসোর্টের কর্মকর্তাকে রিমান্ডের আবেদন

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। গতকাল সোমবার আদালতে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ বলেন, ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসামি সুমনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। গত শনিবার সন্ধ্যায় সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশীষ সূত্রধর মামলা করেন। মামলায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদ ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদসহ ২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রোববার পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে স্বজনদের দাবি অনুযায়ী একজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রোববার সংগ্রহ করা হয়েছে। ঢাকায় সিআইডি সদর দপ্তরে রোববার নিহতের সাতজন স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, স্বাভাবিকভাবে ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহ ও নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার পর মরদেহ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দ্রুত ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়ার চেষ্টা রয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসাপাতাল মর্গের হিমাগারে রাখা হয়েছে। নিহতদের স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত মরদেহের ময়নাতদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

পরিবারের অন্যদের হারিয়ে বেঁচে গেলাম

ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন মেহেরুননেসা সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গতকাল আজকের পত্রিকাকে জানান, তিনি, তাঁর স্বামী ও তাঁদের এক আত্মীয় মালিহা ও তাঁর স্বামী আশিকুর এক রুমে ছিলেন। শনিবার ভোরের দিকে মালিহা পাশের রুমে সবাইকে ঘুম থেকে ডাকতে যান। কিছুক্ষণ পর মেহেরুননেসা আগুনের ধোঁয়ার গন্ধ পান। তখন তিনিও পাশের রুমে গিয়ে দেখেন আগুন।

মেহেরুননিসা বলেন, ‘বের হওয়ার পথ পাচ্ছিলাম না। স্বামী মাসুদ ও আশিকুরকে ডেকে তুলি। মালিহা পাশের রুমে তাদের ডাকতে গিয়ে আর আসতে পারেনি। আসার পথে ছিল আগুন। তখন আমরা বের হওয়ার জন্য পেছনের দিক দিয়ে জানালার গ্লাস ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিলাম।’

মেহেরুননিসা আরও বলেন, ‘বাঁচার আসা ছেড়ে দিয়েছিলাম। হয়তো মরার আগে কাউকে দেখতে পাব না। শেষ পর্যন্ত একটি চেয়ার দিয়ে মাসুদ কাচের গ্লাস ভেঙে ফেলে। প্রথমে আমি লাফ দিতে গিয়ে ভাঙা গ্লাসে হাত আটকে যায়। এরপর স্বামী মাসুদ আমার হাত ছাড়িয়ে দেয়। তখন কোনো একটা শক্ত বস্তুর ওপর পড়ে আমার বাঁ পায়ের মাংস ঝুলে যায়। এরপর আমি ও আশিক লাফিয়ে পড়ে সামান্য আহত হই। পড়ে গিয়ে সেখান থেকে উঠতে পারছিলাম না। প্রায় দুই ঘণ্টা পর লোকজন আমাদের উদ্ধার করেন।’

মেহেরুননিসা বলেন, ‘কিছুদূর হামাগুড়ি দিয়ে ধানখেতের ভেতরে চলে যাই। আর কেউ বের হতে পারিনি। দূর থেকে স্বজনদের আগুনে পুড়ে মৃত্যু দেখলাম।’

শনিবার রাতে মেহেরুননিসা ও তাঁর স্বামী মাসুদ মিয়াকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসে। সেখানে মাসুদকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর মেহেরুননেসাকে ভর্তি করা হয়। মেহেরুননেসা বর্তমানে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। তিনি প্রিমিয়ার ব্যাংকের কলসেন্টারে চাকরি করেন। স্বামী মাসুদ একমি কোম্পানিতে চাকরি করেন। তাঁরা থাকেন উত্তরায়।

বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, মেহেরুননেসার দুই হাতে সামান্য আঘাত আছে। তবে বাঁ পায়ের আঘাতটা বড়। পায়ের মাংস কেটে ঝুলে গেছে। সেখানে অস্ত্রোপচার লাগবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত