Ajker Patrika

সেন্ট মার্টিন: ভ্রমণে কালোবাজারির দৌরাত্ম্য, দুই মাসেই হুমকিতে পরিবেশ

  • সরকারের বিধিনিষেধ পালনে নিয়মিত তদারকি নেই, পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড চলছে
  • ট্রাভেল পাস ও জাহাজের টিকিট কালোবাজারে। ভ্রমণ খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ
  • ডিসেম্বর থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেছে
মাইনউদ্দিন শাহেদ, সেন্ট মার্টিন থেকে ফিরে
সেন্ট মার্টিন: ভ্রমণে কালোবাজারির দৌরাত্ম্য, দুই মাসেই হুমকিতে পরিবেশ
সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ সৈকতে বসানো হয়েছে দোকানপাট ও যানবাহনের স্ট্যান্ড। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

বঙ্গোপসাগরের বুকে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় সরকার নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, কমিয়ে এনেছে পর্যটন মৌসুমের ব্যাপ্তি। নতুন নির্দেশনা অনুসারে ডিসেম্বর থেকে প্রতিদিন ২ হাজার করে পর্যটক এই দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু পর্যটন মৌসুমের দুই মাস না যেতেই ফের হুমকিতে পড়েছে প্রবালদ্বীপটি। এদিকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, দ্বীপ ভ্রমণে ট্রাভেল পাস ও জাহাজের টিকিট নিয়ে রীতিমতো কালোবাজারি শুরু হয়েছে। কিছু ট্রাভেল এজেন্সি সিন্ডিকেট করে এসব করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

১১ জানুয়ারি থেকে তিন দিন সেন্ট মার্টিন ঘুরে শুধুই চোখে পড়েছে শর্ত মেনে না চলার প্রবণতা আর পরিবেশ ধ্বংসের সেই আগের চিত্র। ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিন দেশের সর্বদক্ষিণের উপজেলা টেকনাফের একটি ইউনিয়ন। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমারের রাখাইন উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় এই দ্বীপের অবস্থান। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, সেন্ট মার্টিনে রাতযাপনের সুযোগ শুরু হয়েছে ডিসেম্বর থেকে। এরপর ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত এই দ্বীপে ভ্রমণ করেছে প্রায় ১ লাখ পর্যটক। ৩১ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ শেষ হচ্ছে।

অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই দ্বীপ গত দুই দশকে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, অব্যবস্থাপনা ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে হুমকিতে পড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই প্রবালদ্বীপের হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ-প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারে পর্যটন মৌসুম ছোট করে দ্বীপটি ভ্রমণে ১২টি নির্দেশনা জারি করে। এসব শর্ত মেনে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে জাহাজে করে দৈনিক ২ হাজার পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ ও রাতযাপনের অনুমতি পাচ্ছে।

তবে সম্প্রতি সেন্ট মার্টিন গিয়ে দেখা যায়, দ্বীপে পর্যটক সীমিত করা ছাড়া অন্য শর্তগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। দ্বীপের চারপাশের বালুচরে মোটরযান চলাচল, সাইক্লিং ও ভ্রমণনিষিদ্ধ ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে পর্যটকদের অবাধ বিচরণ দেখা গেছে। শুধু তা-ই নয়, দ্বীপের ভ্রমণ পাস ও জাহাজের টিকিটও গেছে কালোবাজারে।

ভ্রমণ পাস ও জাহাজের টিকিট কালোবাজারে

সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে চলতি মৌসুমে ভ্রমণ পাসের সঙ্গে জাহাজের টিকিট যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সেন্ট মার্টিন ট্রাভেল পাস নামের ওয়েবসাইটে ঢুকে ভ্রমণ পাস ও টিকিট একই সঙ্গে নেওয়া বাধ্যতামূলক। একজন ব্যক্তির একটি এনআইডি দিয়ে চারটি পর্যন্ত পাস নেওয়া যায়।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, ট্রাভেল এজেন্সিগুলো দ্বীপের বিলাসবহুল কয়েকটি হোটেল-রিসোর্টের সঙ্গে চুক্তি করে জাহাজের টিকিট, ট্রাভেল পাস ও থাকা-খাওয়ার প্যাকেজ করে পর্যটকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ১০ জানুয়ারি এই প্রতিবেদকও কালোবাজার থেকে ট্রাভেল পাস ও টিকিট সংগ্রহ করে এমভি টেকনাফ জাহাজে সেন্ট মার্টিন গেছেন। ৩ হাজার ৬০০ টাকার টিকিট নিতে হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। এই জাহাজে এদিন সাড়ে ৩০০ জনের মতো যাত্রী ছিল। তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা কালোবাজার থেকে টিকিট সংগ্রহ করেছে।

সৈকতের বালিয়াড়িতে মোটরযান ও সাইক্লিং নিষিদ্ধ হলেও এর তোয়াক্কা  করছে না কেউ। ছবি: আজকের পত্রিকা
সৈকতের বালিয়াড়িতে মোটরযান ও সাইক্লিং নিষিদ্ধ হলেও এর তোয়াক্কা করছে না কেউ। ছবি: আজকের পত্রিকা

সেন্ট মার্টিন রুটের জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর আজকের পত্রিকাকে বলেন, কিছু ট্রাভেল এজেন্সি ও হোটেল-রিসোর্টের মালিক সিন্ডিকেট করে টিকিট নিয়ন্ত্রণ করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা দাবি করেন, কালোবাজারে ট্রাভেল পাস পাওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই।

তবে ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, ‘সংঘবদ্ধ চক্র পর্যটকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে টিকিট ও ট্রাভেল পাস দিচ্ছে। অনিয়ম ঠেকাতে কয়েকবার অভিযান চালিয়ে ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

ভ্রমণে বেড়েছে খরচ ও ভোগান্তি

মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘাতের কারণে ২০২৩ সাল থেকে টেকনাফ থেকে নাফ নদী হয়ে সেন্ট মার্টিনে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এই রুটে দুই-আড়াই ঘণ্টায় সেন্ট মার্টিন যাওয়া যেত। জাহাজমালিকেরা বলছেন, সে সময় টেকনাফ থেকে ৮০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকায় সেন্ট মার্টিনের জাহাজের টিকিট ছিল। এখন রুট বড় হয়ে যাওয়ায় টিকিটের মূল্য ৩ হাজার ৬০০ থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। কালোবাজারের দৌরাত্ম্যে সেই দামেও টিকিট পাওয়া কঠিন। ফলে পর্যটকদের ভোগান্তি যেমন হচ্ছে, পাশাপাশি আগের তুলনায় খরচও হচ্ছে দ্বিগুণ কিংবা তারও বেশি।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছিলেন তৌফিক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘দুই দিনে থাকা-খাওয়া এবং আসা-যাওয়ায় লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। ভোগান্তিও বেশি। এর সঙ্গে আর কিছু খরচ যোগ করলেই মালদ্বীপ কিংবা শ্রীলংকা ভ্রমণ করা যাবে।’

পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড থেমে নেই

সেন্ট মার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ১৯৮৮ সালে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে জমি কিনেছিলেন কথাসাহিত্যিক ড. হুমায়ূন আহমেদ। ১৯৯৩ সালে তিনি ‘সমুদ্র বিলাস’ নামে একটি ঘর নির্মাণ করেন। ২০০৭ সালে তাঁর পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি ‘দারুচিনির দ্বীপ’ বেশ জনপ্রিয়তা পায়। প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের বাড়ির আশপাশের যে প্রকৃতি ঘিরে এই ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে, সেই প্রকৃতি এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সমুদ্র বিলাসের সামনের কেয়া, নিশিন্দা ও বিস্তীর্ণ সাগর লতা এবং থরে থরে সাজানো প্রবাল পাথর অনেকটা বিলুপ্ত। এখন সেখানে দোকানপাট ও চেয়ারছাতা বসিয়ে মৌসুমি পর্যটন ব্যবসা চলছে।

দক্ষিণ পাশের লেগুনাটি (জলাধার) মাস-তিনেক আগে উচ্চ জোয়ারে বালুচাপা পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জোয়ারের মধ্যে ঢুকে পড়া লবণাক্ত পানি বের হতে না পেরে সেন্ট মার্টিনের হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ ও আবহাওয়া অফিস এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। সেখানকার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা।

দ্বীপের হারানো পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ফেরানোর যে ১২ শর্ত আরোপ করা হয়েছে, তার মধ্যে সৈকতে মোটরযান চলাচল ও সাইক্লিং নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ ও শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ না করা অন্যতম। অথচ তা মানা হচ্ছে না।

দ্বীপের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় মাঝেমধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালালেও সার্বক্ষণিক তদারকি নেই। সৈকতের কোথাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা ডাস্টবিনও নেই। ফলে যেখানে-সেখানে পর্যটকেরা ময়লা-আবর্জনা ফেলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বাগেরহাটে কারাবন্দী ছাত্রলীগ সভাপতির স্ত্রী ও শিশুপুত্রের লাশ উদ্ধার

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার জের, কাতারে যুদ্ধবিমান পাঠাল যুক্তরাজ্য

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পথসমাবেশে ডিম নিক্ষেপ

স্বৈরাচার সাচ্চু আমাদের বাসার জায়গা দখল করেছে: তারেক রহমানের কাছে নারীর অভিযোগ

ময়মনসিংহে গ্রামীণ ব্যাংক কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত