Ajker Patrika

শাহজাহান চৌধুরীর পিএসই সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার বস

  • স্থানীয় ব্যবসায়ীকে তুলে এনে নির্যাতনের পর টাকা আদায়
  • খাল খননে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার নামে ডিও লেটার ইস্যু
  • স্থানীয় জামায়াত নেতারা বিব্রত, উদ্বিগ্ন
সবুর শুভ, চট্টগ্রাম    
শাহজাহান চৌধুরীর পিএসই
সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার বস
মো. আরমান উদ্দিন।

অনিয়ম, দুর্নীতি, হাঙ্গামা, তুলে নিয়ে মারধর করে টাকা আদায়, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে কাজ পাইয়ে দিতে ডিও লেটার-কাণ্ড—সব ঘটনায় নাম এসেছে চট্টগ্রাম-১৫ সংসদীয় আসনের (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. আরমান উদ্দিনের। এ নিয়ে জামায়াত নেতারাও বিব্রত এবং উদ্বিগ্ন। এলাকায় তাঁকে ‘আরমান এমপি’ বলেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আর্থিক কর্মকাণ্ডে শাহজাহান চৌধুরীর কাছে কেউ ঘেঁষতে পারছেন না আরমানের কারণে।

তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর লোহাগাড়ার ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর টাকা আদায়ের ঘটনা দিয়ে শুরু পিএস মো. আরমান উদ্দিনের। এরপর সম্প্রতি খাল খননের নামে বালু উত্তোলনের জন্য স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাদাত হোসেন নামের একজনকে ডিও লেটার পাইয়ে দেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মো. নেজাম উদ্দিন নদভীসহ দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাহাদাত তাঁর পুরোনো বন্ধু ও আরমান উদ্দিনকে ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে গড়ে তোলেন।

সরকারি নথি সূত্রে জানা যায়, নিজের টাকায় টংকাবতী খাল খননের অনুমতি চেয়ে শাহজাহান চৌধুরীর কাছে আবেদন করেন শাহাদাত হোসেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শাহজাহান চৌধুরী চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর টংকাবতী খাল খননে অনুমতির অনুরোধ জানিয়ে ডিও লেটার দেন গত ১৩ মে। চিঠিটি লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে পৌঁছায়। বর্তমানে লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দপ্তরে আবেদনটি তদন্তাধীন রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘আমার নাম ব্যবহার করে ইজারার অনুমোদন দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। এলাকায় বর্ষার কারণে রাস্তার ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে, মানুষকে ইট বিছিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আমি নিজে সরকারি ইজারা পর্যন্ত বন্ধ রেখেছি। অনিয়মের সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

যদিও এলাকাবাসীর অভিযোগ, আরমানের সহযোগিতায় আড়ালে থেকে টংকাবতী খালের বিভিন্ন স্থান থেকে ঠিকই বালু উত্তোলনের পর স্তূপ করা হয়েছে। খাল খননের নামে মূলত শাহাদাত-আরমানের নেতৃত্বে চক্রটি বালু উত্তোলনের ব্যবসা শুরু করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বালু না তোলার কারণেই মূলত রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। এখন বালু তোলা না হলে পুরো এলাকা আবারও প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

‘আরমান এমপি’

গত ১৯ জুনের একটি অডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। লোহাগাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং এ-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের কথা রয়েছে অডিওটিতে। এই কথোপকথন পিএস আরমান এবং যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মো. তারেকুল হক নামের এক ব্যক্তির। মো. তারেকুল হকও অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ফাঁস হওয়া অডিওতে তারেকুলকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘লোহাগাড়ায় এমপি কেন আসবে? আসলে পায়ে গুলি করে জিজ্ঞেস করব, কেন এসেছে। এখানে আরমান সাহেবের কথাই চলবে। লোহাগাড়ার এমপি আরমান।’ জবাবে আরমান উদ্দিনও কথা বলেন।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বালু উত্তোলন নিয়ে অডিও ফাঁসের ঘটনায় মুখ খুলেছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াত। গত ২২ জুন রাতে এ নিয়ে বিবৃতি দেয় দলটি। দক্ষিণ জেলা জামায়াতের মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক আবু নাছের বলেন, ‘শাহজাহান চৌধুরীকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ঘটনার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।’ তবে আরমানের বিষয়ে এখানে কোনো কথা ছিল না।

সেই আকাশের সঙ্গেও আরমান

২০২৫ সালের ২৮ মে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক নারীকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে প্রকাশ্যে জামায়াতের কর্মী আকাশ চৌধুরীর লাথি মারার ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরদিন ২৯ মে জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের করার পর ওই বছরের ১ জুন পুলিশ নগরীর লালদীঘি এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। জামিন পেয়ে তিনি আবারও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। গত জানুয়ারিতে সাতকানিয়া পৌরসভার জামায়াত-সমর্থক আবদুল মোমেন ও আকাশ চৌধুরীর একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ইটভাটার মাটির ব্যবসার আলোচনা ছিল। একপর্যায়ে আকাশ চৌধুরী ধমকের সুরে মোমেনকে জানান, পিএস আরমানও তাঁর সঙ্গে এই ব্যবসায় রয়েছেন।

এ নিয়ে পিএস আরমান ও শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসার পর দলের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়। এরপর গত ১৩ জুন শাহজাহান চৌধুরীকে মহানগর আমিরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এ নিয়ে মো. আরমান উদ্দিনের বক্তব্য জানতে গত ২৭ জুন থেকে বার্তা আদান-প্রদানে মোবাইল অ্যপ্লিকেশন ওয়াটসঅ্যাপে ১৫ বার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হয় তাঁর কাছে। মোবাইলে সরাসরি কল করা হয় ১৯ বার। তবে তিনি সাড়া দেননি। এর মধ্যে একবার মোবাইলের কল রিসিভ হলেও তিনি নিরুত্তর থাকেন। ৫ দিন ধরে তাঁর বক্তব্য জানার জন্য এই কলগুলো করা হয়েছে। পরে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের কার্যালয়েও যোগাযোগ করা হয় তাঁর বক্তব্যের জন্য। তবে জানা যায়, পিএস মো. আরমান সেখানেও যাচ্ছেন না।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শাহজাহান চৌধুরী, পিএস আরমান ও তাঁদের কর্মকাণ্ডে জামায়াতের ভেতরেও অস্বস্তি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে প্রশাসন—সবখানে যোগাযোগের সেতু হচ্ছেন আরমান। তবে একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, জামায়াত নেতাদের সাধারণত পিএ বলতে কেউ থাকেন না, কিন্তু শাহজাহান চৌধুরী এর ব্যতিক্রম। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আরমানকে সঙ্গে রাখেন। দলীয় গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়েও শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে আরমান থাকেন। এতে বিব্রত হন বেশির ভাগ নেতা।

এই বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘ওই বিষয়ে দক্ষিণ জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে লিখিত প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে। এরপরও সব বিষয়ে আমরা সতর্ক।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত