কালুরঘাট থেকে চৌধুরীহাট: বালুর দেড় শতাধিক অবৈধ স্পট
• ইজারা ছাড়াই চলছে বালুর ব্যবসা।
• বালুবাহী ট্রাক চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু।
• ভেঙে ফেলা হচ্ছে সড়কের নিরাপত্তা খুঁটি, ঘটছে দুর্ঘটনা।

চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট থেকে বোয়ালখালী উপজেলার কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন এলাকায় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই চলছে বালু উত্তোলন ও বিক্রির রমরমা ব্যবসা। কালুরঘাট সেতুর আশপাশ থেকে চরণদ্বীপ হয়ে চৌধুরীহাট পর্যন্ত ৭-৮ কিলোমিটার এলাকায় বালুর দেড় শতাধিক অবৈধ স্পট গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের একাধিক অভিযান, জরিমানা এবং কারাদণ্ডের পরও বন্ধ হচ্ছে না এই কারবার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুর ব্যবসা নির্বিঘ্ন রাখতে সড়কের পাশের নিরাপত্তা খুঁটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। দিনরাত ভারী ট্রাক চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু। ভাঙাচোরা সড়কে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে বিভিন্ন যানবাহন। সম্প্রতি ভারী ট্রাকের চলাচল ঠেকাতে বসানো প্রতিবন্ধকও ভেঙে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, কালুরঘাট রেল-কাম-সড়ক সেতুর আশপাশে অবাধে বালু উত্তোলনে গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়বে। তাঁদের ভাষ্য, সেতুর আশপাশে অন্তত বালুর ৩০টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। চরণদ্বীপ থেকে চৌধুরীহাট পর্যন্ত ভেতরের এলাকায় রয়েছে বালুর আরও দেড় শতাধিক অবৈধ স্পট।
অভিযোগ রয়েছে, আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতা-কর্মী ও সমর্থক ব্যবসাটি নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর নাম ব্যবহার করে কয়েকজন এই ব্যবসা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় যুবদল কর্মী মো. এরফানের বিরুদ্ধে বালুর স্পটের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি ও যুবদলের রাজনীতিতে যুক্ত শওকত, তৌহিদ, মুন্না ও সারওয়ারের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এরফান বলেন, কালুরঘাটে তিনি মাত্র একটি পয়েন্টে বালুর ব্যবসা করেন। অধিকাংশ স্পট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সত্য নয়।
বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. শওকতও বালুর ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক বিরোধ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পৌরসভা যুবদলের সভাপতি মোহাম্মদ সারওয়ার পরে যোগাযোগের কথা বলে আর সাড়া দেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ঠিকাদার বলেন, বৈধভাবে বালুমহাল ইজারা নিয়ে ব্যবসার চেয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রিতে লাভ বেশি। এ কারণে অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ।
বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান ফারুক বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১০ মাসে একাধিক অভিযান চালিয়েছেন তিনি। তবে অভিযানে স্থানীয়দের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিলেও কেউ অংশ নিতে চান না। অবৈধ ব্যবসা বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ইউএনও আরও বলেন, ভারী ট্রাক চলাচল ঠেকাতে কালুরঘাট সেতুসংলগ্ন চরণদ্বীপের মুখে দুটি প্রতিবন্ধক বসানো হয়েছিল। শুক্রবার রাতে দুর্বৃত্তরা একটি ভেঙে ফেলে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
উপজেলা প্রশাসন গত ১০ সেপ্টেম্বর কালুরঘাট-ভাণ্ডালজুড়ি সড়কের নিরাপত্তা খুঁটি উপড়ে বালুর ব্যবসা পরিচালনার দায়ে ফরিদ মিয়া নামের এক ব্যবসায়ীকে সাত দিনের বিনা শ্রম কারাদণ্ড দেন। ১৫ সেপ্টেম্বর অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট পাইপ, বালুভর্তি দুটি ট্রাক ও একটি ভেকু জব্দ করা হয়। এ ছাড়া সাতটি অবৈধ বালু উত্তোলনের স্পট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।









