Ajker Patrika

এক প্রৌঢ়া এবং একটি জং ধরা বন্দুক

সবুর শুভ, চট্টগ্রাম    
এক প্রৌঢ়া এবং একটি জং ধরা বন্দুক
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্ধার করা জং ধরা বন্দুক। ছবি: আজকের পত্রিকা

মো. ইকবাল হোসেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ২২ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ১১ বছর আগে তাঁর বড় ভাই জিল্লুর রহমান ভান্ডারিকে প্রকাশ্যে খুন করে সন্ত্রাসীরা। ভাই হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের রোষানলে পড়েন ইকবাল। গত ৩১ জানুয়ারি তিনি সৌদি আরব থেকে ফেরেন সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে। কিন্তু একটি পক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তাঁকে ঘায়েলে নেমে পড়ে। সম্প্রতি ইকবাল অভিযোগ করেন, ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি জং ধরা বন্দুক দিয়ে তাঁকে ফাঁসিয়েছে।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জিসাসের সহসভাপতি মো. ইকবাল হোসেনকে গত ১০ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের খবর শুনে তাঁর বৃদ্ধ মা স্ট্রোকে মারা গেছেন। অভিযানের তিন দিন আগে পুলিশের করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি), অভিযান, জং ধরা বন্দুক ও মামলা—সবকিছুই গোঁজামিলে ভরা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সবকিছু আগেই ছক করা ছিল বলে দাবি ইকবালের।

অভিযান, ইকবালকে গ্রেপ্তার, বন্দুক জব্দ এবং মামলার বিষয়ে আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানেও তথ্যের সামঞ্জস্যহীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

জিডি ও অভিযান

ইকবালকে গ্রেপ্তার করতে অভিযানের তিন দিন আগেই রাঙ্গুনিয়া থানা-পুলিশ জিডি করে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি করা ওই জিডির নম্বর-৩৪৭। ১০ ফেব্রুয়ারি অভিযানের আগে রাত ১০টা ১৪ মিনিটে (কললিস্ট অনুযায়ী) থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এসআই) কিংকর দাশ ইকবালকে ফোন করেন। ওই সময় ইকবাল ঘুমাচ্ছিলেন। এভাবে কৌশলে ইকবালের বাড়িতে থাকার বিষয়টি পুলিশ নিশ্চিত হয়।

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, রাঙ্গুনিয়া থানা-পুলিশ ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ২টা ৩০ মিনিটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অপর একটি বাহিনীর টহল দলের মাধ্যমে জানতে পারে, ইকবাল বাড়িতে রয়েছেন। সেই রাত ৩টা ১০ মিনিটে তাঁর বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইকবালের দেখানো মতে, পাশের পরিত্যক্ত ঘরের পেছন থেকে একটি একনলা বন্দুক উদ্ধার করার কথা জানান বাদী। পুলিশ জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে রাত ৩টা ৩০ মিনিটে। থানায় এজাহার দায়ের দেখানো হয় রাত ৪টা ২০ মিনিটে। বন্দুকটি পরদিন সংসদ নির্বাচনে অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে রাখা হয়েছিল বলেও এজাহারে উল্লেখ করেন বাদী উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইমরান হোসাইন।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুরের সাহাবনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইকবালকে একনলা বন্দুকসহ আটকের তথ্য দেওয়া হয়। সেখানে অভিযানের সময় উল্লেখ রয়েছে রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে ৪টা ২০ মিনিট পর্যন্ত। ভোর ৫টায় তাঁকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এজাহার ও প্রতিবেদনে দুই ধরনের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

থানা ঘেরাও এবং বিক্ষোভ

ইকবালকে আটকের পর স্থানীয় নারী-পুরুষ মূল সড়কে ও থানার সামনে বিক্ষোভ দেখায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাউজান থানার ওসি (সম্প্রতি বদলি) মো. আরমান হোসেন তাঁকে চট্টগ্রাম (শহরে) আদালতে পাঠিয়ে দেন। এই বিষয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য সেকান্দার হোসেন জানান, এই ধরনের অন্যায় মানা যায় না। তাই স্থানীয়রা বিক্ষোভ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নালিশ

হয়রানি-গ্রেপ্তারের প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ সদর দপ্তর, ডিআইজি (চট্টগ্রাম) ও চট্টগ্রামের এসপির কাছে সম্প্রতি নালিশ দিয়েছেন ইকবাল হোসেন। ঘটনা স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) হুমাম কাদের চৌধুরীকেও সরাসরি জানিয়েছেন তিনি। নালিশে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাঁকে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

দুই প্রতিবেদনে দুই তথ্য

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি বাহিনীর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিযান চলে রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে ৪টা ২০ মিনিট পর্যন্ত। ভোর ৫টায় আসামিকে থানায় হস্তান্তর করা হয়। থানা-পুলিশের এজাহারে বলা হয়, রাত ২টা ৩০ মিনিটে তারা অস্ত্রধারীর সংবাদ পায়। ৩টা ১০ মিনিটে অভিযান চালায়। আর ৩টা ৩০ মিনিটে জব্দ তালিকা করা হয়।

আসামি ইকবাল এবং এলাকার লোকজন বলছেন, ইকবালকে থানায় আনা হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযান শেষ করার আগেই মামলা হয়েছে। এত গোঁজামিল কেন—প্রশ্ন করলে বাদী এসআই মো. ইমরান হোসাইন বলেন, প্রতিবেদন ঠিক বলছে, নাকি এজাহার ঠিক বলছে, সেটা তদন্তের বিষয়।

প্যারোলে মায়ের জানাজায় এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইকবাল (হাতকড়াসহ সাদা শার্ট)। ছবি: আজকের পত্রিকা
প্যারোলে মায়ের জানাজায় এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইকবাল (হাতকড়াসহ সাদা শার্ট)। ছবি: আজকের পত্রিকা

পেছনে কারা

২০১৫ সালে প্রকাশ্যে ওই প্রবাসীর বড় ভাই জিল্লুর রহমানকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হত্যা করে বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় হত্যা মামলা করেন তিনি। বিচারে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি ৬ আসামির যাবজ্জীবন সাজা হয়। ইকবালের অভিযোগ, ওই আসামি এবং তাদের ঘনিষ্ঠরা মোটা অঙ্কের (৩০ লাখ) টাকা দিয়ে তাঁকে (ইকবাল) ফাঁসিয়েছে। ক্ষোভের সঙ্গে ইকবাল বলেন, পুলিশ চাইলে সব পারে।

অভিযানের দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, অস্ত্রের গোড়ার কাঠের বাঁটটি ভাঙা, ট্রিগারের নিচের অংশে লাল টেপ দিয়ে মোড়ানো এবং ট্রিগারও ভাঙা। এ ছাড়া পুরো অস্ত্রটি জং ধরা।

ওসি, তদন্ত কর্মকর্তা ও বাদী যা বলেন

রাঙ্গুনিয়া থানার তখনকার ওসি মো. আরমান হোসেনের কাছে অভিযান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ৩০ লাখ টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারার মাধ্যমে ওই প্রবাসীকে ফাঁসানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ৩০ লাখ টাকা কারা নিয়েছে জানা নেই। জং ধরা অকেজো বন্দুক দিয়ে কীভাবে ভোটে অপরাধ সংঘটিত হতো—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাহফুজের রহমান বলেন, ‘মামলাটি তদন্ত করে যেটা পাওয়া যাবে, সেটা উপস্থাপন করা হবে।’ অভিযানের ‍তিন দিন আগে থানায় জিডি, অভিযান শেষ হওয়ার আগেই মামলা এবং অস্ত্র জং ধরা—এত সব গোঁজামিলের একটি মামলার তদন্ত কীভাবে করছেন জানতে চাইলে তিনি ফোন রেখে দেন।

মামলার বাদী এসআই মো. ইমরান হোসাইন বলেন, ঘটনার তদন্ত করছেন তদন্ত কর্মকর্তা। জং ধরা ওই অস্ত্র দিয়ে ইকবাল কীভাবে ভোটের দিন অপরাধ সংঘটিত করতেন, জানতে চাইলে বাদী এসআই মো. ইমরান হোসাইন বলেন, অস্ত্রটি সচল না অচল, তার রিপোর্ট এখনো আসেনি। আর এই ঘটনায় কোনো টাকা লেনদেন হয়েছে কি না জানি না।

এ বিষয়ে ইকবাল বলেন, ‘রাত ৩টা ৩০ মিনিটে তল্লাশি চালায় প্রায় ৩০ মিনিট। এরপর অভিযান দল বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়ার পর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁকে থানায় আনে। এর আগে রাশখালী নদীর পাড়, কাউখালীর বগাবিলি ব্রিজ, দক্ষিণ রাজানগরের রাজারহাট ও থানায় আমাকে অস্ত্রটি হাতে নেওয়ার জন্য ক্রসফায়ারেরও হুমকি দেওয়া হয়।’

জব্দ তালিকার সাক্ষী

পুলিশের রিকুইজিশন করা মাইক্রোবাসের চালক মো. ইয়াসিন আরাফাত মুরাদ অভিযান ও অস্ত্র সম্পর্কে বলেন, ‘অস্ত্র আমি চোখে দেখিনি। পুলিশ আমাকে বলায় স্বাক্ষর করেছি। আসামির নাম কী জানি না।’ আসামি ইকবালের ভাই জব্দ তালিকার সাক্ষী মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা। অথচ আমাকে করা হলো জব্দ তালিকার সাক্ষী। সাক্ষী হওয়ার জন্য পুলিশ আমাকে বারবার অনুরোধ করে।’

জব্দ তালিকা প্রস্তুতকারী এসআই মো. ইমরান হোসাইনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরহীন থাকেন।

মা ও চাকরি—দুটোই গেল

অভিযানের সময় ইকবালকে পুলিশের মারধর দেখে স্ট্রোক হয় তাঁর মায়ের। হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় ঘটনার ১০ দিন পর তিনি মারা যান। ওই সময় কারাগারে থাকা ইকবাল প্যারোল নিয়ে জানাজায় হাজির হন। গত ৬ এপ্রিল তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হন। এই ঘটনায় বিদেশে তাঁর চাকরিও চলে যায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নিয়োগ

ভিসা সহজীকরণে ৮ মুসলিম দেশের বৈঠক, সভাপতিত্বে বাংলাদেশ

ইরানি যুদ্ধবিমানগুলোকে আশ্রয় দিয়েছিল পাকিস্তান: প্রতিবেদন

শুভেন্দু অধিকারীর পিএ খুন: অযোধ্যা থেকে গ্রেপ্তার ‘শুটার’ বিজেপি-ঘনিষ্ঠ

বরফ জমাট পানির বোতল দিয়ে স্কুলছাত্রের মাথায় শিক্ষকের আঘাত, মুহূর্তেই জ্ঞান হারাল ছাত্র

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত