Ajker Patrika

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: মধ্যরাতে সারিতে দাঁড়িয়েও সার পাচ্ছেন না কৃষক

আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: মধ্যরাতে সারিতে দাঁড়িয়েও সার পাচ্ছেন না কৃষক
সার পেতে ডিলার পয়েন্টে এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন কৃষকেরা। গতকাল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের বোর্ডপাড়া এলাকার বিসিআইসি ডিলার পয়েন্টে। ছবি: আজকের পত্রিকা

সারের সংকট নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, সারের কোনো সংকট নেই। তবে ডিলারদের দাবি, কৃষকের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় সবাইকে একসঙ্গে প্রয়োজনীয় সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা পর্যাপ্ত সারা পাচ্ছেন না। এমনকি মধ্যরাতে সারিতে দাঁড়িয়েও তা মিলছে না। দিনের পর দিন ডিলার পয়েন্টে ঘুরেও প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে অনেকে ছুটছেন খুচরা বাজারে। সেখানে বাড়তি দাম দিলেই মিলছে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অবস্থান করে সদর উপজেলার দেবীনগর বোর্ডপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সরকারি দামে সার কিনতে ডিলার পয়েন্টে ভিড় করেছেন অন্তত পাঁচ শ কৃষক। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তাঁরা। একপর্যায়ে সেখানে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গেও কৃষকদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ডিলার পয়েন্ট থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সদর উপজেলার দেবীনগর এলাকার কৃষক কাবিরুল ইসলাম বলেন, জমিতে সার দেওয়ার সময় চলে যাচ্ছে। কিন্তু ডিলারের কাছে গেলে সার পাওয়া যাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। অথচ খুচরা দোকানে টাকা বেশি দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে। ডিলার পয়েন্টে মাসে একবার এক থেকে দুই বস্তা সার মিললেও সেটাও যথেষ্ট নয়।

গোমস্তাপুর উপজেলার আরেক কৃষক নিয়ামুল হকের অভিযোগ, সরকারি দামে সার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া যাচ্ছে না। একাধিক দোকান ঘুরে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে সার কেনার পাশাপাশি যাতায়াত ও পরিবহন খরচও বাড়ছে। সময়মতো জমিতে সার না দেওয়ায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।

তবে সার সংকটের কথা মানতে নারাজ কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ডিলারদের দাবি অনুযায়ী এটি কোনো সিন্ডিকেটের কারসাজি নয়। কৃষকের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় সব কৃষককে একসঙ্গে প্রয়োজনীয় সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বাড়তি দামেই মিলছে খুচরা বাজারে

কৃষকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ খুচরা বাজারের দাম নিয়ে। তাঁদের দাবি, ডিলার পয়েন্টে সরকারি দামে প্রয়োজনীয় সার না মিললেও খুচরা দোকানে বাড়তি দাম দিলেই পাওয়া যাচ্ছে। কৃষক বাসার আলীর অভিযোগ, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে যে সার সরকারি দামে কেনার কথা, সেটিই কিনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা দিয়ে।

এক দোকানে সার না পেয়ে আরেক দোকানে ছুটছেন কৃষকেরা। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয়—দুটোই বাড়ছে। বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বাড়তি দামের এই চাপ বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদর উপজেলার দেবীনগরের আরেক কৃষক খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘রাত তিনটা থেকে ডিলারের দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না। এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) জমা নিয়ে মাসে মাত্র এক থেকে দুই বস্তা সার দিচ্ছে। যেখানে আমার ৫ থেকে ৬ বস্তা সার জমিতে প্রয়োজন। এত অল্প সার দিয়ে জমিতে কীভাবে ফসল উৎপাদন করব। আবার অনেক দূর থেকে খুচরা দোকানে বাড়তি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে।’

পাঁচ উপজেলাতেই অভিযোগ

শুধু সদর উপজেলায় নয়, জেলার নাচোল, গোমস্তাপুর, ভোলাহাট ও শিবগঞ্জ উপজেলাতেই কমবেশি একই ধরনের অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। কোথাও ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ অপেক্ষা, কোথাও সার না পেয়ে বিক্ষোভ করেছেন। এমনকি মারামারির ঘটনাও ঘটছে।

সম্প্রতি গোমস্তাপুর উপজেলা চত্বরে সার না পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা। এমনকি গতকাল ভোলাহাট উপজেলায় একটি ডিলার পয়েন্টে সারিতে দাঁড়ানো নিয়ে মারধরের ঘটনাও ঘটে। কোথাও ডিলার পয়েন্টে উত্তেজনা, কোথাও হাতাহাতির মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।

জেলা কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম বলেন, জেলায় সার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। সার, বীজ ও মনিটরিং কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁর মতে, মাঠপর্যায়ে কৃষকের প্রকৃত চাহিদা, ডিলারদের বরাদ্দ এবং বাজারে সারের সরবরাহ—এই তিনটি বিষয় সমন্বয় করে নজরদারি করা প্রয়োজন। তা না হলে সরকারি বরাদ্দ থাকার পরও কৃষক পর্যায়ে সংকট তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত