Ajker Patrika

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ

সড়কের দুপাশে সবুজ বিপ্লব কলেজশিক্ষকের

  • এলাকায় ‘গাছপাগল শিক্ষক’ হিসেবে পরিচিতি পান সফিয়ার রহমান।
  • সড়ক, রেললাইন, নদীতীরে তাল, খেজুরসহ নানা প্রজাতির বীজ রোপণ।
জাহিদ হাসান, যশোর 
সড়কের দুপাশে সবুজ বিপ্লব কলেজশিক্ষকের
যশোরের ঝিকরগাছার রাজগঞ্জ সড়কের পাশে সম্প্রতি তালবীজ রোপণ করেন কলেজশিক্ষক সফিয়ার রহমান। ছবি: সংগৃহীত

যশোর শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রাম মদনপুর। ঝিকরগাছা উপজেলার গ্রামটির বটতলা মোড় থেকে দক্ষিণ দিকের পিচঢালা পথ ধরে এগিয়ে গেলে দেখা মিলবে মাঠের পর মাঠ। এই মাঠের বুক চিরে যে পিচঢালা পথ, সেটি গিয়ে মিশেছে রাজগঞ্জ বাজারে। যে সড়কের দুই পাশে যত দূর চোখ যাবে, দেখা মিলবে সারি সারি ছোট-বড় তালগাছের। এগুলো লাগিয়েছেন সফিয়ার রহমান। তিনি মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক।

কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুদানে নয়, সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে এক যুগের বেশি সময় ধরে এভাবে রাস্তার পাশে, রেললাইনের ধারে, নদীতীরে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে বীজ কিংবা গাছের চারা রোপণ করে চলেছেন এই শিক্ষক। এলাকায় তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘গাছপাগল শিক্ষক’ হিসেবে।

চলতি বছর কলেজ থেকে অবসরে যাচ্ছেন সফিয়ার রহমান। তিনি জানালেন, কিছু পাওয়ার জন্য নয়; বরং সড়কের ক্ষতি ঠেকানো, বজ্রপাত থেকে রক্ষা, সৌন্দর্য বাড়ানো এবং দুর্ঘটনা রোধে গাছগুলো লাগিয়েছেন।

বৃক্ষপ্রেমী শিক্ষক সফিয়ার রহমানের সবুজ বিপ্লবের শুরু নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯১ সালে তিনি ঝিকরগাছার পারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। সে সময় সরকার দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করে। ওই কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বারবাকপুর বিলপাড়ের রাস্তার ধারে অসংখ্য শিশুগাছ ও জামগাছের চারা রোপণ করেন সফিয়ার রহমান। সময়ের ব্যবধানে অনেক গাছ হারিয়ে গেলেও কয়েকটি জামগাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে সেই উদ্যোগের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।

ঝিকরগাছার পারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ছেড়ে ১৯৯৬ সালে মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজে যোগ দেন সফিয়ার রহমান। এরপর নিজের এলাকা এবং আশপাশের জনপদে গাছ লাগানোর কাজ আরও বিস্তৃত করেন। তবে তাঁর চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ হয় ২০১৪ সালের দিকে। মনিরামপুরের খর্দ গ্রামের রুহুল গাজীর সঙ্গে সাংবাদিক রুকুনউদ্দৌলা ও শাহাদত হোসেন কবিলের মাধ্যমে পরিচয়ের পর তিনি নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হন।

রুহুল গাজী লাঙল চাষ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কপোতাক্ষ নদের তীরে তালবীজ রোপণ করতেন। একজন সাধারণ কৃষকের এই অসাধারণ উদ্যোগ সফিয়ার রহমানকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন, একজন কৃষক যদি প্রকৃতির জন্য এতটা দায়িত্বশীল হতে পারেন, তবে একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর আরও বড় ভূমিকা রাখা উচিত।

সফিয়ার রহমান
সফিয়ার রহমান

এরপর শুরু হয় তালগাছ ও খেজুরগাছ রোপণের বিশেষ উদ্যোগ। কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় ১০০ তালের বিচি রোপণ করেন। বর্তমানে সেখান থেকে জন্ম নেওয়া ২৫-৩০টি তালগাছ রাস্তার পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ১২ বছর পর গাছে ফলও ধরেছে।

গত এক যুগে সফিয়ার রহমানের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিস্ময় জাগানোর মতো। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের দিকে ঝিকরগাছা-রাজগঞ্জ সড়কে তিনি আম, জাম, কাঁঠালসহ প্রায় ১০ হাজার তালের বিচি রোপণ করেন। এগুলোর মধ্যে প্রায় এক হাজার গাছ এখনো বেঁচে আছে। মনিরামপুরের খড়িঞ্চা-রাজগঞ্জ সড়কে দুই বছরে প্রায় দুই হাজার খেজুরগাছ রোপণ করেছেন। এ ছাড়া শৈলি, বসন্তপুর ও তেঁতুলিয়া সড়কে প্রায় ১০ হাজার দেবদারুর বীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন। পুলেরহাট-রাজগঞ্জ সড়কে প্রশাসনের উদ্যোগে রোপণ করা গাছ নষ্ট হয়ে গেলে বা ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে তিনি আবার নতুন করে সেখানে তালবীজ রোপণ করেন।

শুধু রাস্তার ধারে নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও সবুজে ঘিরে রাখতে কাজ করে চলেছেন এই কলেজশিক্ষক। মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজ এলাকায় লাগিয়েছেন ৩০-৩৫টি তালগাছ, বটবৃক্ষসহ নানা প্রজাতির গাছ। কলেজ ক্যাম্পাসে লাগানো একটি বটগাছের নাম দিয়েছেন ‘জ্ঞানবৃক্ষ’। যশোর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড অধ্যয়নকালে তাঁর নেতৃত্বে ২০টি পেয়ারাগাছও রোপণ করা হয়েছিল।

সম্প্রতি মদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ৩০ কেজি খেজুরের বিচি সংগ্রহ করেছেন। পরে সেগুলো বসন্তপুর, দিঘিরপাড়, তেঁতুলিয়া মোড় হয়ে খাটুরা বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় রোপণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি বেনাপোল থেকে বাগেরহাটের মোংলাগামী ট্রেনে চড়ে রেললাইনের দুপাশে ছিটিয়েছেন কয়েক লাখ খেজুরের বিচি। সফিয়ারের এসব উদ্যোগে কখনো শুভানুধ্যায়ী, আবার কখনো প্রবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পাশে দাঁড়িয়েছে।

সফিয়ার রহমান বলেন, ‘আমার দেখাদেখি একজন মানুষও যদি একটি গাছ রোপণ করেন এবং সেটির যত্ন নেন, তাহলেই আমার এই দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে।’

ঝিকরগাছার মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একজন ব্যতিক্রম শিক্ষক সফিয়ার রহমান। তিনি আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। কখনো কখনো তাঁর রোপণ করা গাছের নিচেও পাঠদান করেন তিনি। পরিবেশ রক্ষায় সফিয়ারের মতো অন্যদেরও এগিয়ে আসা উচিত।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত