Ajker Patrika

রাজধানীতে গণপরিবহন: বেশির ভাগের পছন্দ এসি বাস

তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
রাজধানীতে গণপরিবহন: বেশির ভাগের পছন্দ এসি বাস
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

রাজধানী ঢাকায় শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের বেশির ভাগের গণপরিবহন হিসেবে পছন্দ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস সার্ভিস। তবে এই বাসে যাতায়াতে কর্মজীবীরা মাসে দুই হাজার টাকার নিচে খরচ করতে চান। শিক্ষার্থীরা চেয়েছেন অর্ধেক ভাড়ার সুবিধা।

বাস রুট রেশনালাইজেশন (বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি) প্রকল্পের অংশ হিসেবে এসি বাস নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে এমন মতামত পাওয়া গেছে। জরিপে ঢাকার ১০ হাজার ৫৭ জন শিক্ষার্থী ও ৫ হাজার ১৪৭ জন কর্মজীবী মানুষের মতামত নেওয়া হয়। জরিপের তথ্য বলছে, যাত্রাপথের দূরত্ব, পারিবারিক আয় ও ভাড়ার পরিমাণই মূলত নির্ধারণ করবে, কারা এসি বাসে যাতায়াত করবেন। এ ছাড়া যাত্রীরা এসি বাসে সিসিটিভি, জিপিএস ট্র্যাকিং ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট এন্ট্রির মতো আধুনিক সুবিধার চেয়ে আরামদায়ক আসন, সময়মতো বাস ছাড়ার নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা এবং চালক-কর্মীদের ভালো আচরণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

বর্তমানে রাজধানীর স্কুলশিক্ষার্থীদের প্রায় ৬২ শতাংশ হেঁটে, রিকশা বা স্কুল ভ্যানে যাতায়াত করে। গণপরিবহনের বাস ব্যবহার করে মাত্র ৯ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী। তবে দূরত্ব বেশি হলে মোটরচালিত (বাস, লেগুনা) বাহনের ব্যবহার বাড়ে। দেড় কিলোমিটারের কম দূরত্বে মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাস বা অন্য মোটরচালিত যান ব্যবহার করে। তবে ৩ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে এই হার ৫০ শতাংশের বেশি।

জরিপে দেখা গেছে, যাতায়াতের দূরত্ব প্রতি ১ কিলোমিটার বাড়লে মোটরচালিত বাহন ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ে। অর্থাৎ বেশি দূরত্বে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ভরযোগ্য বাসসেবা চালু করা গেলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার এই সেবায় আগ্রহী হতে পারে। কর্মজীবী মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় যাতায়াত মাধ্যম এখনো সিটি বাস। কর্মজীবীদের মধ্যে বাস ব্যবহারকারী প্রায় ৩১ শতাংশ। এরপর রয়েছে লেগুনা বা টেম্পো (১৩ দশমিক ৩ শতাংশ) এবং মেট্রোরেল (১১ দশমিক ৯ শতাংশ)। তবে আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ব্যবহারও বাড়ছে। মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি আয় আছে এমন পরিবারে ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর হার প্রায় ৫০ শতাংশ। মেট্রোরেল ব্যবহারকারীদের মাসে গড় পারিবারিক আয় প্রায় ৬২ হাজার ২৯৩ টাকা। সাধারণ সিটি বাস ব্যবহারকারীদের গড় আয় ৪৬ হাজার ৮৯১ টাকা (যা প্রায় ৩২% বেশি)। অর্থাৎ উন্নত ও নির্ভরযোগ্য মেট্রোরেল তুলনামূলক বেশি আয়ের মানুষের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

এসি বাসে সিসিটিভি, জিপিএস ট্র্যাকিং ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট এন্ট্রির মতো আধুনিক সুবিধা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। তবে জরিপে দেখা গেছে, যাত্রীরা প্রযুক্তিগত সুবিধার চেয়ে আরামদায়ক আসন, সময়মতো বাস ছাড়ার নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা এবং চালক-কর্মীদের ভালো আচরণকে বেশি গুরুত্ব দেন। শিক্ষার্থীদের ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কর্মজীবীদের ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ এসি বাস ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবহারকারীদের ৯৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সিটি বাসের যাত্রীদের ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ এই সেবা নিতে চান। তবে ব্যক্তিগত গাড়ি বা ট্যাক্সি ব্যবহারকারীদের এসি বাসে আগ্রহ তুলনামূলক কম।

জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, যাঁরা এসি বাসে উঠতে বেশি আগ্রহী, তাঁদের বড় অংশই উচ্চ ভাড়া বহনে অনাগ্রহী। কর্মজীবীদের প্রায় ৬৩ শতাংশ মাসে ২ হাজার টাকার নিচে ভাড়া দিতে চান। প্রায় ৯০ শতাংশের সক্ষমতা সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়ার সুবিধা চান।

জরিপটি পরিচালনাকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, একক উচ্চ ভাড়া বা প্রিমিয়াম ফ্ল্যাট রেট নির্ধারণ করা হলে বর্তমান বাস, লেগুনা ও রিকশা ব্যবহারকারী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত যাত্রীরা এই সেবা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন। এ জন্য জরিপে কয়েকটি নীতিগত সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ দূরত্বে চলাচলকারী বর্তমান বাস ও লোকাল পরিবহনের যাত্রীদের মূল লক্ষ্য করা, মাসে ২ হাজার টাকার নিচে সাশ্রয়ী ভিত্তি ভাড়া রাখা, একক ভাড়ার বদলে স্তরভিত্তিক ভাড়া চালু করা এবং সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে অতিরিক্ত বাস পরিচালনা করা।

জরিপের বিষয়ে জানতে চাইলে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের পরিচালক ও ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, এসি বাস সার্ভিসের প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত বর্তমানে সাধারণ বাস এবং লোকাল পরিবহন ব্যবহারকারী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত যাত্রীরা। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর উচ্চবিত্তদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা দিয়ে এসি বাস সার্ভিস শুরু করা বাস্তবসম্মত হবে না। বর্তমানে বাসের যাত্রীরাই মেট্রোরেলে স্থানান্তরিত হয়েছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরা নন। তাই এসি বাস চালু করে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের তাতে উৎসাহিত করা দুরূহ হবে। তিনি বলেন, ভাড়া নাগালে রাখা গেলে এবং দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী ও অফিসযাত্রীদের জন্য নির্ভরযোগ্য, সময়নিষ্ঠ ও আরামদায়ক সেবা নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা শহরে এসি বাস সার্ভিস যাত্রী আকর্ষণ করতে পারবে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, এসি বা নন-এসি যেকোনো বাসসেবার ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। বাসের মধ্যে রেষারেষি, ধাক্কাধাক্কি বা প্রতিযোগিতামূলক চালনা বন্ধ করতে হবে, যাতে মানুষ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বাসে যাতায়াত করতে পারেন। বর্তমানে সড়কের বড় একটি অংশ ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে থাকে। তাই এমন মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য বাসসেবা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরাও গণপরিবহনে আসতে আগ্রহী হন। একই সঙ্গে কোনো জরিপের ফলাফল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাধারণীকরণ বা জেনারালাইজেশন করা উচিত নয়; বাস্তব পরিস্থিতি ও বিভিন্ন শ্রেণির যাত্রীর চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত