Ajker Patrika

মানিকগঞ্জ শহর: ৫২ কোটিতেও নিষ্প্রাণ খাল

আব্দুর রাজ্জাক, (ঘিওর) মানিকগঞ্জ
মানিকগঞ্জ শহর: ৫২ কোটিতেও নিষ্প্রাণ খাল
খালের ওপর সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও অপসারণ করা হয়নি বাঁধ। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে বর্জ্য পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে। সম্প্রতি মানিকগঞ্জ জেলা শহরের দেবেন্দ্র কলেজ এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

কালীগঙ্গা নদী থেকে উৎপন্ন খালটি দিয়ে একসময় নৌপথে পণ্য আসত মানিকগঞ্জ শহরে। বর্ষা মৌসুমে শহরের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র খাল এটি। কিন্তু দখল, দূষণ ও বর্জ্যে সেই খাল এখন মৃতপ্রায়। অথচ ছয় কিলোমিটারের এই মানিকগঞ্জ খালের পেছনে তিন দফা সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পে সরকারের ৫২ কোটি ৩৮ লাখ ৪৬ হাজার ৮৭৩ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। দুই দশকে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও খালটির ময়লা, দুর্গন্ধ ও পানিপ্রবাহের সংকট কাটেনি।

সবশেষ ২০২২ সালে প্রায় ২৮ কোটি টাকা বরাদ্দে শুরু হয় খালটির সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজ। খালটি পুনঃখনন, সৌন্দর্যবর্ধন, তিনটি সেতু, গণশৌচাগার নির্মাণ, হাঁটার পথ তৈরি ও নালা নির্মাণ করার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে মেয়াদ বৃদ্ধির পরও কাজ শেষ হয়নি। ২০২৫ সালের জুনে মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি।

পৌরসভার কর্মকর্তার দাবি, বর্তমানে প্রায় ৯৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে খালের দুটি স্থানে বাঁধ দেওয়ায় পানিপ্রবাহ বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা বলছেন, বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন স্থানের বর্জ্য নিয়মিত খালে ফেলা হচ্ছে। ফলে সংস্কারের পরও পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। কোথাও পানি আটকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, বাড়ছে মশার উপদ্রব।

মানিকগঞ্জ পৌরসভার পশ্চিম বান্দুটিয়া (বেউথা) এলাকার কালীগঙ্গা নদী থেকে খালটি উৎপত্তি লাভ করেছে। এরপর এটি পুরো শহর এলাকা অতিক্রম করে সদর উপজেলার সোনাকান্দর বা সন্তোষপুর এলাকায় গিয়ে পুনরায় কালীগঙ্গা নদীতেই মিশেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি মানিকগঞ্জ খাল হিসেবেও পরিচিত।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, বেউথা স্লুইসগেট থেকে সোনাকান্দর স্লুইসগেট পর্যন্ত ৬ দশমিক ১৫০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, ঢাল সংরক্ষণ, হাঁটার পথ তৈরি ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে তিনটি সেতু ও একটি গণশৌচাগার নির্মাণের কথাও রয়েছে।

মানিকগঞ্জ পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে ৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা প্রাক্কলনে বান্দুটিয়া থেকে শুরুণ্ডি পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের দুই পাড়ে সিসি ব্লক ও হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ব্লক উঠে যায়। হাঁটার পথও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এরপর ২০০৮ সালে কালীগঙ্গা নদীর সংযোগস্থল থেকে বকজুরি সেতু পর্যন্ত খাল পুনঃখনন করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় এলজিইডি ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে ১৮ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৭৭ টাকা প্রাক্কলনে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। খালের ১ হাজার ৪৪০ মিটার অংশে নতুন করে সিসি ব্লক বসানো হয়। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই খাল আবার ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়।

২০১৬ সালের শেষ দিকে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ খালটি পরিষ্কার করে পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নেয়। শহর সমন্বয় কমিটির সভায় খাল পরিষ্কারের পর সেখানে মাছ চাষের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগও কাজে আসেনি। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আবারও খালে জমতে থাকে কচুরিপানা, ময়লা ও বর্জ্য। ফিরে আসে আগের চেহারা।

এরপর ২০২২ সালে শুরু হয় খালটির সবশেষ বড় সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ২৭ কোটি ৯৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৬ টাকা ব্যয় ধরা হয়। চুক্তিমূল্য ২৫ কোটি ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪ টাকা। কার্যাদেশ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরুর তারিখ ছিল ২০২২ সালের ১০ মে। দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয় ২০২৪ সালের ১০ মে। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১০ জুন পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেও কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রাখে। পরে পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগের পর আবার কাজ শুরু হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুটি স্থানে সেতু নির্মাণের জন্য খালের মধ্যে বাঁধ দেওয়া হয়। কিন্তু সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও বাঁধ দুটি অপসারণ করা হয়নি। এতে খালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।

জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি লাবলু মিয়া বলেন, ‘খাল পুনঃখনন, সৌন্দর্যবর্ধন, তিনটি সেতু, গঙ্গাধরপট্টি সড়কে সুয়ারেজ ড্রেন ও একটি গণশৌচাগার নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করা হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, খালটিতে কয়েক দফায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও সঠিক বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সুফল মিলছে না।

মানিকগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। প্রায় ৯৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত