Ajker Patrika

আলু নিয়ে রংপুরে ৩ সংকট

  • এবার আলুর উৎপাদন ৫১ দশমিক ৭৬ লাখ টন, সংরক্ষিত হয়েছে মাত্র ২৩ শতাংশ।
  • হিমাগারে থাকা ৭৩.৮ শতাংশ আলু এখনো বিক্রি হয়নি।
  • পুরোনো আলু শেষ হওয়ার আগেই নতুন আলুর চাষ।
  • কেজিতে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ১০-১১ টাকা।
  • পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ না করায় লোকসান: কর্মকর্তা
শিপুল ইসলাম, রংপুর
আলু নিয়ে রংপুরে ৩ সংকট
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার একটি মাঠে আলু লাগাচ্ছেন কয়েক কৃষক। গত মঙ্গলবার তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

রংপুরে আলুর বাম্পার ফলন এবার কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৫১ লাখ ৭৬ হাজার টনের বেশি উৎপাদনের বিপরীতে হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ হয়েছে মাত্র ২৩ শতাংশ আলুর। সংরক্ষিত আলুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখনো হিমাগারে পড়ে আছে। এরই মধ্যে মাঠে শুরু হয়েছে নতুন আলুর চাষ। ফলে পুরোনো মজুত, সীমিত সংরক্ষণ ক্ষমতা ও বাজারে কম দাম—এই তিন সংকটে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বর্তমান দরে কেজিতে ১০-১১ টাকা লোকসান ধরলে শুধু রংপুর বিভাগের উৎপাদিত আলুতেই কৃষকের সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মুসা এলাকার কৃষক আমজাদ হোসেন এরই মধ্যে জমিতে নতুন আলু লাগিয়েছেন। অথচ তাঁর আগের মৌসুমের আলু এখনো হিমাগারে। লোকসান কমানোর আশায় তিনি পুরোনো আলু রেখে নতুন করে আলু চাষ শুরু করেছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। অথচ ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন, যা উৎপাদনের ২৩.১ শতাংশ। সংরক্ষিত আলুর ৭৩.৮ শতাংশ (৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন) এখনো হিমাগারে মজুত রয়েছে।

লোকসান কেজিতে ১০-১১ টাকা

অন্তত ১৫ জন কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে হিমাগার পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১৪-১৫ টাকায়। এর মধ্যে কেজিপ্রতি প্রায় ৭ টাকা হিমাগার ভাড়া দিতে হচ্ছে। ফলে আলু বিক্রি করে কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র ৭-৮ টাকা।

অন্যদিকে, হিমাগারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন ব্যয় হয়েছে ১৭ থেকে ১৮ টাকা। ফলে বর্তমান দরে বিক্রি করলে কেজিপ্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে ১০ থেকে ১১ টাকা। মৌসুমের শুরুতে আলুর দাম না থাকায় প্রায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে কেজিতে ৮ থেকে ৯ টাকা লোকসানে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, বিভাগের মোট উৎপাদনকে ভিত্তি ধরে কেজিপ্রতি ১০ টাকা লোকসান হলে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ১৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

তারাগঞ্জের বামনদীঘি গ্রামের কৃষক নাহিদুজ্জামান বলেন, ‘এবার বৃষ্টির পানিতে আলু পচে উৎপাদন কমে গেছে, যার কারণে খরচ বেড়েছে। এক কেজি আলু উৎপাদনে ২০ টাকা পড়েছে, বাধ্য হয়ে ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। মৌসুমের শুরুতে কেজিতে ১০ টাকা লোকসান হয়েছে।’

হিমাগারেও বাড়ছে চাপ

শুধু কৃষক নন, আলু নিয়ে চাপে রয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। চলতি বছর রংপুরে হিমাগার ভাড়া নিয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে তাঁরা আন্দোলনও করেছেন।

রংপুর আলু চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘হিমাগার ভাড়া বেশি হওয়ায় আলু সংরক্ষণ করেও লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না।

ভাড়া কমানোর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন হলেও হিমাগারের মালিকেরা তা মানছেন না। আমরা ৫ টাকা কেজি ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানিয়েছি। এতে কিছুটা হলেও লোকসান কম হবে।’

পুরোনো আলু শেষ হওয়ার আগেই নতুন আলু

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে সময়ের ব্যবধান ঘিরে। আগের মৌসুমের আলু এখনো হিমাগারে পড়ে আছে। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে নতুন মৌসুমের আলু চাষ। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে আগাম আলুর চাষ সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের দিকে শুরু হয়। চাষের পর প্রায় ৬০ দিনের মধ্যেই, অর্থাৎ নভেম্বরের দিকে, এসব আলু তোলার উপযোগী হয়ে ওঠে।

তারাগঞ্জের এন এন হিমাগারের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘২ লাখ ৫০ হাজার বস্তার মধ্যে মাত্র ৬৩ হাজার বস্তা আলু বের হয়েছে। অন্য বছরগুলোয় ৩ ভাগের ২ ভাগের বেশি আলু এই সময় বের হতো। ৪৫ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে বাজারে নতুন আলু আসবে। যে হারে এখন হিমাগারে আলু কেনাবেচা হচ্ছে, তাতে হিমাগারে সংরক্ষণ করা সব আলু বের হওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত বছর মাইকিং করেও আলু বের করেননি চাষিরা, ফেলে দিতে হয়েছে। এবারও যদি এমন হয়, তাহলে আমাদেরও লোকসানে পড়তে হবে।’

কেন একই পরিস্থিতি

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়াই বাজারে মন্দাভাবের অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে আলুর স্বল্প জীবনকাল ও উচ্চ ফলনশীলতা। প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে আলুর মতো তুলনামূলক বেশি ফলন দেওয়া লাভজনক বিকল্প ফসল কৃষকের হাতে সীমিত। এই জায়গাতেই সমস্যাটি দীর্ঘমেয়াদি। কৃষক আলু চাষ করে অল্প সময়ে বেশি ফলন পান। কিন্তু সবাই একই সময়ে আলু উৎপাদন করায় মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায়। তখন দাম পড়ে যায়। আবার পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় উৎপাদনের বড় অংশ মৌসুমের শুরুতেই কম দামে বিক্রি করতে হয়। ফলে একদিকে কৃষক বেশি উৎপাদন করছেন, অন্যদিকে সেই উৎপাদন ধরে রাখার মতো সংরক্ষণব্যবস্থা নেই। যেটুকু সংরক্ষণ করা যায়, সেটিও উচ্চ ভাড়া ও দুর্বল বাজারদরের কারণে লাভজনকভাবে বিক্রি করা যাচ্ছে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর থেকে আলুতে লোকসান হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, চাষিরা পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করছে না। উৎপাদনটা চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, শুধু আলু না করে কিছু জমিতে ভুট্টা, সবজি, ধান করার; যাতে একটাতে লোকসান হলে অন্যটাতে পোষাতে পারে। কিন্তু কৃষকদের আলু চাষাবাদ নেশার মতো হয়ে গেছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত