Ajker Patrika

চিতলমারীতে চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষ, নিহত ১

বাগেরহাট ও চিতলমারী প্রতিনিধি
চিতলমারীতে চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষ, নিহত ১
চিতলমারীতে চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ছবি: আজকের পত্রিকা

বাগেরহাটের চিতলমারীতে মধুমতী নদীর চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় রাজিব শেখ (২৫) নামের একজন নিহত ও আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। এ ছাড়া হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে অন্তত ৪০টি বসতবাড়ি-দোকান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত উপজেলার চিংগড়ী গ্রামে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

খবর পেয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তাৎক্ষণিকভাবে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে সৌরভ বিশ্বাস (১৯) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আজ শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সরেজমিনে দেখা যায়, চিতলমারী-পাটগাতি সড়কের চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে সড়কজুড়ে ইটের গুঁড়ি। এক পাশে চিংগড়ী গ্রামের শেখ বাড়ি অন্য পাশে মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি। শেখ বাড়িতে ঢুকতেই বাতাসে পোড়া গন্ধ আর চোখের সামনে বসতবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।

বিভিন্ন স্থান থেকে দল বেঁধে লোকজন আসছেন আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়িঘর দেখতে। কারও পুরো ঘর পুড়ে গেছে, আবার কারও অর্ধেক ঘর পুড়ে গেছে। অনেকে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন। একবেলা খাবারেরও ব্যবস্থা নেই বেশির ভাগ ঘরে।

নিহত রাজিবের বাড়ির পেছনে দুটি বড় পাতিলে সবার জন্য একসঙ্গে রান্না হচ্ছে। আর শেখ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য লুট হওয়া সম্পদ ও পুড়ে যাওয়া বাড়িঘর হারানোর কষ্টে ঘরের সামনে বসে আছেন। পুড়ে গেছে শেখ বাড়ির বৈদ্যুতিক খুঁটিও, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এলাকার অনেক বাড়িঘর।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অভিযোগ, গতকাল বিকেলে আরিফ শেখ নামের এক যুবক চিতলমারী-পাটগাতি সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেল করে যাচ্ছিলেন। বিশ্বাস পরিবারের লোকজন ওই যুবককে ফুলকুচি (লোহার শিকের তৈরি একধরনের মাছ ধরা অস্ত্র) দিয়ে আঘাত করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে শেখ পরিবার ও বিশ্বাস পরিবারের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়।

চিতলমারীতে চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষে সংঘর্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
চিতলমারীতে চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষে সংঘর্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

সন্ধ্যা নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেখ পরিবারের সদস্যদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। সেই সুযোগে সাইদ বিশ্বাস ও সোহাগ মেম্বারের নেতৃত্বে শেখ বাড়িতে হামলা হয়। দুই শতাধিক মানুষ একসঙ্গে হামলা চালিয়ে অন্তত ৪০টি বাড়িঘর লুট ও ভাঙচুর করে এবং পেট্রল ও পিচ (বিটুমিন) ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

ক্ষতিগ্রস্ত লিয়াকত শেখ বলেন, ‘আগুন দিয়ে আমার সব শেষ করে দিয়েছে। কী খাব আর কী করব, জানি না। আমার ছেলে বা আমি তো কারও সঙ্গে মারামারি করতে যাইনি, তাহলে আমার ঘর পোড়াল কেন।’

মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘আমার স্বামী প্যারালাইজড (পক্ষাঘাতগ্রস্ত), বিছানায় শোয়া। মারামারির ভয়ে ছোট ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়েছি আর বড় ছেলে ভ্যান চালায়। ঋণ করে ছয় মাসের ধান কিনে রাখছিলাম ঘরে। তাও পুড়ে গেছে। কী খাব জানি না।’

আব্দুর গণি শেখের স্ত্রী জয়নব বেগম বলেন, ‘ঘর ঠিক করার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলাম। তা নিয়ে গেছে। একটা ছাগল ও কয়েকটা হাঁস ছিল, তাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কীভাবে বাঁচব, জানি না।’ হামলাকারীদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন এই নারী।

ক্ষতিগ্রস্ত মো. বাবলু শেখ বলেন, ‘ওরা সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একসঙ্গে আসছে, এসে আমাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে মারধর শুরু করে। আমরা ঠ্যাকানোর চেষ্টা করেছি। এর মধ্যে পুলিশ আসছে, নুরে আলম দারগা (এসআই) পুলিশ নিয়ে আমাদের লোকজনকে পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করেছে। আর পুলিশের সামনেই আমাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। নুরে আলম দারগা ওদের দিয়ে এসব করিয়েছে। আমার ঘরে ৯ ভরি স্বর্ণ ও ৫ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। আর অন্তত ৪০টি ঘরে আগুন দিয়েছে। হামলা থেকে বাদ যায়নি কোটি টাকার ভবনও। দোতলা দুটি ও একতলা অন্তত চারটি ভবনে আগুন, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে।’

দোতলা ভবনের মালিক ইদ্রিস শেখের ছেলে নুরু শেখ বলেন, ‘আমার দুই ভাই বিদেশে থাকে। অনেক কষ্ট করে দোতলা ঘর করেছিলাম। গতকাল সব শেষ করে দিয়েছে। ঘরে যে মালামাল ছিল, সব লুটে নিয়ে গেছে। আমাদের ঘর থেকে স্বর্ণ, মালামালসহ অন্তত দেড় কোটি টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। সাইদ বিশ্বাস, কালা বিশ্বাস ও সোহাগের নেতৃত্বে এসব হয়েছে।’

চিতলমারীতে চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষে সংঘর্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
চিতলমারীতে চরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষে সংঘর্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

বিশ্বাস ও শেখ পরিবারের বিরোধের কারণ সম্পর্কে নুরু জানান, দীর্ঘদিন ধরে মধুমতী চরের জমি দখল নিয়ে আলম শেখের সঙ্গে বিশ্বাস পরিবারের বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধের জেরে বিশ্বাস পরিবারের সদস্যরা আলম শেখকে হত্যা করেন। হত্যার পরেও থামেনি দুই পরিবারের বিরোধ। এই বিরোধে এর আগেও কয়েকবার দুই পক্ষের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই বিরোধে এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হয়েছেন। যেকোনো মূল্যে এলাকার মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিরোধের সমাধান করা দরকার বলে জানান তিনি।

এদিকে শেখ পরিবারের হামলার আশঙ্কায় মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি থেকে টিভি, ফ্রিজ, খাটসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল ভ্যান, নসিমন ও পিকআপে করে আত্মীয়দের বাড়ি পাঠাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, ‘শেখ পরিবারের লোকজন সংগঠিত হচ্ছে, তারা আমাদের বাড়িতে হামলা করবে। আলম শেখ মারা গেলেও এমন হামলা করেছিল।’

পান্না বিশ্বাসের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমার স্বামীকে মেরে পঙ্গু করে দিয়েছে শেখ পরিবারের লোকজন। তাদের ভয়ে আমরা সব মালামাল নিরাপদ স্থানে পাঠাচ্ছি। আমাদের তো বাঁচতে হবে। ওরা হুমকি দিয়েছে, সবকিছু পুড়িয়ে দেবে। আগের বারও আমাদের সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছিল।’

এ বিষয়ে চিতলমারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে আসি। তবে বাধার সম্মুখীন হওয়ায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়। ২০-২৫টি বসতঘর পুড়ে গেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, চারটি ইউনিট একযোগে কাজ করে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হই।’

বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শামীম হোসেন বলেন, অনেক বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে এবং রাজিব নামের এক যুবক নিহত ও অনেকে আহত হয়েছেন।

নিহত রাজিবের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, ফের সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত