Ajker Patrika

‘কলিজার পাখিটা চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না’—নিহত তাজমিনের মায়ের আহাজারি

­যশোর প্রতিনিধি
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৯: ৩৪
‘কলিজার পাখিটা চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না’—নিহত তাজমিনের মায়ের আহাজারি
সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাজমিনের মা। ছবি: আজকের পত্রিকা

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ আজ শুক্রবার যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার মা-বাবা। তাঁদের কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে মেয়েকে হারানোর অসহায়তা। এ ঘটনায় হত্যা মামলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে থাকত সে। পড়ত স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়াতনের সপ্তম শ্রেণিতে।

আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গ্রামের বাড়িতে দেখা যায়, তাজমিনের মা-বাবা ও স্বজনেরা শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন। মেয়েকে হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়া মা কেয়া খাতুন একপর্যায়ে মেয়ের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সাংবাদিকেরা স্বজনদের ছবি তুলতে গেলে তাজমিনের মা কেয়া খাতুন আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘কী হবে এসব ছবি তুলে। আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না।’

যশোরের গ্রামের বাড়িতে তাজমিনের মরদেহ পৌঁছানোর পর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা
যশোরের গ্রামের বাড়িতে তাজমিনের মরদেহ পৌঁছানোর পর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

কেয়া খাতুন জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মাকে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে বলেছিল। কেয়া খাতুন মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও সে কিছু জানায়নি। মেয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটনে ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান তিনি।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরের একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তিনিও বাক্‌রুদ্ধ। মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে কীভাবে তার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি।

আবদুল আলীম জানান, ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানায়। গতকাল রাত পৌনে ২টার দিকে মেয়ের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পান তিনি। বার্তায় মেয়েকে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি বার্তাটি দেখতে পারেননি। সকালে বার্তা দেখে লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান।

আবদুল আলীম বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাজমিনের আর কোনো ভাই-বোন নেই। সে মেধাবী ছিল। বিভিন্ন ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তাকে এভাবে হারিয়ে শোকাহত স্বজন ও এলাকাবাসী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল তাজমিন। কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যাওয়ার পর গত বুধবার দুপুরের পর বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয় সে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, পদুয়ার বাজারে নামার পর তাজমিন কীভাবে লালমাইয়ের ওই স্থানে গেল, তা তদন্ত করা হচ্ছে। নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত চলছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানখেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এতে কিশোরীটি জীবন বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।

এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। এদিকে, আজ সকালে চট্টগ্রাম নগরী থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত