Ajker Patrika

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: এক আম্মার, একের পর এক বিতর্ক

  • আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পান আম্মার।
  • শিক্ষার্থী মারধর ও লাইব্রেরিতে হামলার অভিযোগ।
  • শিক্ষক হেনস্তা ও মব সৃষ্টির অভিযোগও উঠেছে।
  • চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ।
দীন ইসলাম, রাবি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: এক আম্মার, একের পর এক বিতর্ক
সালাহউদ্দিন আম্মার

আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি; এরপর একে একে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে আলোচনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। শিক্ষার্থীদের মারধর, লাইব্রেরিতে হামলা, শিক্ষক-প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত, মব সৃষ্টি করে ডিনদের পদত্যাগে বাধ্য করা, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ—গত দুই বছরে নানা ঘটনায় সামনে এসেছে তাঁর নাম। সর্বশেষ রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাঙচুরের অভিযোগে নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন তিনি।

গত রোববার রাতে রাজশাহী স্টেশনে রাবি শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীর ওপর হামলার অভিযোগে রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে এক ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন আম্মার। পরে রেলওয়ের চার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকে বহিষ্কার করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এরপরও তিনি ‘মার্চ টু রাজশাহী স্টেশন’ ঘোষণা দিয়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে স্টেশনে ভাঙচুড় চালান।

এটিই একমাত্র ঘটনা নয়। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অর্থ আত্মসাৎ, লাইব্রেরিতে হামলা, চাঁদাবাজি, শিক্ষক হেনস্তা এবং মব সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে এই ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে। গত ২৭ জুলাই এক শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে এবং তাঁর দুই সহপাঠীর ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ঢুকে হামলার নেতৃত্ব দেন আম্মার।

সে সময় আম্মার একটি বেলচা হাতে ওই শিক্ষার্থীকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোরে মাইরা ফেলমু, পুইতা ফেলমু। পুইতা ফেলমু একেবারে।’ পরে প্রক্টর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই দুই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করলে অ্যাম্বুলেন্স থেকে বের করে আবারও বাঁশ দিয়ে সংস্কৃতি বিভাগের মাহমুদুল হাসানকে পেটানো হয়।

মাসুদ হত্যাকাণ্ডে আলোচনায়

আম্মার প্রথম আলোচনায় আসেন রাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদ হত্যাকাণ্ডের মামলায়। ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিনোদপুর বাজারে দুধ এবং ওষুধ কিনতে গিয়ে অপহরণের শিকার মাসুদকে পরে বোয়ালিয়া থানার সামনে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে আম্মারের উপস্থিতি ছিল বলে ভিডিওতে দেখা যায়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে মাসুদকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনায় আম্মারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে পিবিআইয়ের তদন্ত এখনো চলমান।

আছে চাঁদাবাজির অভিযোগ

গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই ৩৬, মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের জন্য ৭০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন আম্মার।

গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পোষ্য কোটা’ সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় আসেন আম্মার। আন্দোলনের সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ধস্তাধস্তি, উপ-উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও এবং গাড়িতে টাকা ছোড়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। একই দাবিতে ভিসি, প্রো-ভিসিসহ দেড় শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীকে অবরুদ্ধ রাখার ঘটনাতেও তিনি নেতৃত্ব দেন।

একই বছরের ২১ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়টি অনুষদের আওয়ামী লীগপন্থী ডিনদের বিরুদ্ধে ‘মব সৃষ্টি করে’ জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করেন আম্মার। পদত্যাগপত্র হাতে নিয়ে তাঁদের অফিসে তালা দিতেও দেখা যায় আম্মারকে।

তবে সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন আম্মার। তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগ এবং তাদের মাদার সংগঠন আমার বিরুদ্ধে সব সময় তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এগুলো ছড়িয়েছে। আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ থাকলে তারা যেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়।’

যা বলছেন নেতা ও শিক্ষকেরা

গণতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, আম্মার প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের উসকানি দিয়ে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছেন এবং সেই সংঘাতের মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব ও স্বার্থ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এসব ঘটনায় বারবার শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারা অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, ‘আম্মারের প্রতিটি আন্দোলনের সূচনা হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিষয় নিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পাকিস্তান, আল-কায়েদা বা শিবিরের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে চলে যায়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ‘মব কালচার’ কোনোভাবেই থাকা উচিত নয়। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, মব কালচার শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নষ্ট করে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত