
বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্পাদক ও লেখক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের তিনটি ভ্রমণগ্রন্থ—‘প্রান্তরে পান্থজন’, ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ এবং ‘নাইরোবি থেকে মাসাইমারা: এক সুন্দরের আরাধনা’—আলাদাভাবে পড়লে তিনটি ভৌগোলিক পরিসরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা মনে হলেও, একত্রে বিবেচনায় এরা একটি সুসংহত দার্শনিক ও নান্দনিক ত্রয়ী, ইংরেজিতে যাকে বলে ট্রিলজি। এই ত্রয়ীর ভেতরে ভ্রমণ শুধু স্থানান্তরের অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি মানুষের আত্মপরিচয়, বিশ্ব-অনুভব, সংস্কৃতিগত সেতুবন্ধন এবং অস্তিত্বগত অনুসন্ধানের এক ধারাবাহিক রূপান্তর প্রক্রিয়া। ফলে এই তিনটি বইকে আলাদা আখ্যান হিসেবে নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক ‘মানব-ভ্রমণচক্র’ হিসেবে পড়াই যৌক্তিক।
এই ত্রয়ীর উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এখানে ভ্রমণ একটি সরলরৈখিক বর্ণনা নয়। প্রচলিত ভ্রমণসাহিত্যে আমরা স্থান, বর্ণনা, অভিজ্ঞতা—এই ধারাবাহিকতা দেখি। কিন্তু ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের লেখায় এই বিন্যাস ভেঙে গিয়ে তৈরি হয়েছে অভিজ্ঞতার বহুতল নির্মাণ। আমেরিকার প্রান্তর, মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কিংবা আফ্রিকার প্রকৃতি এবং মানবজীবন—এসব কোথাও বিচ্ছিন্ন নয়; বরং পরস্পরের সঙ্গে এক অন্তঃসলিলা সংযোগে আবদ্ধ।
এই সংযোগ ভৌগোলিক নয়, মানবিক। নিউজার্সির বাসযাত্রা, মক্কার প্রার্থনা, মারাকেশের রাত কিংবা মাসাইমারার তৃণভূমি—সবকিছু মিলিয়ে এক অভিন্ন অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়। মানুষ নিজেকে কোথায় খুঁজে পায়? এই প্রশ্নই ত্রয়ীর কেন্দ্রীয় সুর।

‘প্রান্তরে পান্থজন’-এ ‘পান্থজন’ ধারণাটি বহুমাত্রিক—লেখক, প্রবাসী, সহযাত্রী, এমনকি পাঠকও এই পরিচয়ের অংশ। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তী দুটি বইয়ে আরও বিস্তৃত হয়ে ‘মানবজন’-এ রূপ নেয়। ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’-এ ধর্ম, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ একটি অভিন্ন মানবিক সত্তা হিসেবে উঠে আসে; আর ‘নাইরোবি থেকে মাসাইমারা: এক সুন্দরের আরাধনা’-তে ‘ওরা’ ও ‘আমরা’র বিভাজন সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়ে তৈরি হয় এক সর্বজনীন মানব পরিচয়।
এই বিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম বইয়ে পরিচয়-সংকট, দ্বিধা ও প্রবাসী চেতনার টানাপোড়েন রয়েছে; দ্বিতীয় বইটিতে সেই সংকট ধীরে ধীরে বহু সাংস্কৃতিক সহাবস্থানে রূপ নেয়; আর তৃতীয় বইয়ে এসে তা সম্পূর্ণভাবে মানবিক ঐক্যে পরিণত হয়। অর্থাৎ, এই ত্রয়ী একধরনের পরিচয়-যাত্রা—নিজ থেকে বিশ্বে এবং বিশ্ব থেকে আবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা।
এই তিনটি গ্রন্থের ভেতরে একটি গভীর অভিন্ন থিম হলো—অস্থায়িত্ব। বাসযাত্রা, বিমানযাত্রা, মরুভূমির পথ, সাভানার বিস্তৃতি—সবকিছুই যেন এক চলমান বাস্তবতার প্রতীক। কোথাও স্থায়িত্ব নেই; আছে শুধু অস্থায়ী অবস্থান, ক্ষণিক সম্পর্ক আর স্মৃতির ভেতর জমে থাকা অভিজ্ঞতা।
প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা এই দর্শনকে আরও তীব্র করে। আমেরিকার প্রান্তরে প্রবাসী বাঙালির জীবন, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম কিংবা আফ্রিকার মানুষের সরল জীবন—সবখানেই দেখা যায়, মানুষ একটি অস্থায়ী জগতে স্থায়িত্বের সন্ধান করছে। কিন্তু সেই স্থায়িত্ব কোনো ভৌগোলিক গন্তব্যে নয়; তা নিহিত মানুষের সম্পর্ক, ভাষা, স্মৃতি ও অনুভূতিতে।
এই উপলব্ধি ত্রয়ীকে অস্তিত্ববাদী মাত্রা দেয়। জীবন এখানে একটি দীর্ঘ যাত্রা, যেখানে ‘পৌঁছানো’ নয়, বরং ‘চলা’ই মুখ্য।

তিনটি বইয়ের একটি অভিন্ন শক্তি মানুষকে কেন্দ্র করে আখ্যান নির্মাণ। শহর, প্রকৃতি, ইতিহাস—সবকিছুই উপস্থিত, কিন্তু কখনোই প্রধান নয়; বরং প্রতিটি স্থানের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ—তার গল্প, তার সংগ্রাম, তার নীরবতা।
আমেরিকার বাসস্টেশনের অপরিচিত মানুষ, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক, মারাকেশের আদিলা, আফ্রিকার ড্রাইভার বা স্থানীয় বাসিন্দা—এই চরিত্রগুলো ভিন্ন ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে অবস্থান করলেও তাঁদের অভিজ্ঞতার ভেতরে একধরনের অভিন্নতা রয়েছে। এই অভিন্নতাই লেখকের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল শক্তি।
তিনি মানুষকে ‘অন্য’ হিসেবে দেখেন না; বরং তাদের ভেতরে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান। ফলে পাঠকও ধীরে ধীরে এই উপলব্ধিতে পৌঁছায়—পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেন, মানুষের মৌলিক অনুভূতি একই।
ত্রয়ীর দ্বিতীয় বইয়ে এই দিক সবচেয়ে স্পষ্ট হলেও আসলে তিনটি বইজুড়েই ধর্ম, ইতিহাস ও আধুনিকতার একটি জটিল সংলাপ বিদ্যমান। আমেরিকার বহু সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্য এবং আফ্রিকার ঔপনিবেশিক ইতিহাস—এসব একত্রে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক বাস্তবতার চিত্র নির্মাণ করে।
লেখক কোথাও সরাসরি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন না; বরং অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এই সংলাপকে তুলে ধরেন। ফলে পাঠক নিজেই উপলব্ধি করতে পারেন, মানবসভ্যতা একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে নিবিষ্ট, অন্যদিকে ইতিহাসের সহিংসতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে।
এই দ্বৈততা—আলোক ও অন্ধকারের সহাবস্থান—ত্রয়ীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ভিত্তি।

এই তিনটি বইয়ে ভ্রমণ একটি ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতা। দৃশ্যের পাশাপাশি গন্ধ, স্বাদ, শব্দ—সবকিছুই বর্ণনায় উপস্থিত। মারাকেশের খাবারের গন্ধ, প্রবাসী রান্নাঘরের স্মৃতি, আফ্রিকার প্রকৃতির শব্দ—এসব পাঠককে শুধু ‘পড়তে’ দেয় না; বরং ‘অনুভব’ করতে বাধ্য করে।
এই ইন্দ্রিয়গত বর্ণনা ভ্রমণকে জীবন্ত করে তোলে। ফলে পাঠক শুধু দর্শক নয়; সে অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠে।
খোকনের ভাষার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একাধারে কাব্যিক ও বিশ্লেষণধর্মী। তাঁর বাক্যে যেমন আছে চিত্রকল্প ও আবেগ, তেমনি আছে পর্যবেক্ষণের নির্ভুলতা ও বিশ্লেষণের গভীরতা। এই দুইয়ের মেলবন্ধন তাঁর গদ্যকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তাঁর ভাষাকে দিয়েছে দৃঢ়তা; আর সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা দিয়েছে আবেগ ও নান্দনিকতা। ফলে তাঁর লেখায় তথ্য ও অনুভূতি সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়।
ত্রয়ীর শেষ গ্রন্থে ‘সুন্দরের আরাধনা’ ধারণাটি স্পষ্টভাবে উঠে এলেও আসলে এই ধারণা তিনটি বইজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এখানে সুন্দর মানে শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়; বরং মানুষের আচরণ, সহমর্মিতা, সম্পর্ক এবং ক্ষুদ্র মুহূর্তের আন্তরিকতা।
একটি ফুল, একটুখানি হাসি, কথোপকথন—এই ছোট ছোট বিষয়ের মধ্যেই লেখক সৌন্দর্য খুঁজে পান। ফলে সৌন্দর্য কোনো দূরের বিষয় নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের ভেতরেই নিহিত।
এই ত্রয়ীর একটি বড় সাফল্য হলো, লেখক পাঠককে দূরে রাখেন না। তিনি নির্দেশক নন; তিনি সহযাত্রী। তাঁর বর্ণনায় এমন এক অন্তরঙ্গতা রয়েছে, যা পাঠককে আখ্যানের ভেতরে টেনে নেয়।
পাঠক মনে করেন, তিনি নিজেই বাসে বসে আছেন, মরুভূমির পথে হাঁটছেন কিংবা আফ্রিকার তৃণভূমিতে দাঁড়িয়ে আছেন। এই সহযাত্রার অভিজ্ঞতাই বইগুলোর স্থায়িত্ব তৈরি করে।
ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের এই তিনটি ভ্রমণগ্রন্থ সম্মিলিতভাবে একটি গভীর মানবিক দর্শনের দিকে নিয়ে যায়। এখানে ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়; বরং মানুষের কাছে ফেরা, নিজের কাছে ফেরা।
এই ত্রয়ী আমাদের শেখায়—
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ‘প্রান্তরে পান্থজন’, ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ এবং ‘নাইরোবি থেকে মাসাইমারা: এক সুন্দরের আরাধনা’—তিনটি বই নয়; ধারাবাহিক আত্ম-অন্বেষণ, যা ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে মানবিকতার এক সর্বজনীন ভূগোলে পৌঁছে দেয়।
মিহিরকান্তি চৌধুরী: লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট

শিল্পী সারা জাবীনের দ্বিতীয় একক শিল্প প্রদর্শনী ‘চৌকাঠ’-এর উদ্বোধন হলো আজ শুক্রবার ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে। প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত শিল্পকর্মগুলোতে নারী, গৃহস্থালি পরিসর, স্মৃতি, পরিচয়সহ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনুসন্ধান করা হয়েছে।
৯ দিন আগে
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা, গান, গল্প ও প্রবন্ধ থেকে নির্বাচিত রচনা নিয়ে সাজানো ‘রবীন্দ্রনাথের বাঁশি’। ধানমন্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে আজ শুক্রবার এই আবৃত্তি আয়োজন মঞ্চস্থ করল আবৃত্তিসংগঠন শ্রুতিঘর। এটি তাদের নতুন আবৃত্তি প্রযোজনা...
৯ দিন আগে
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দেশজুড়ে বাঙালি সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে ছায়ানট। এই কার্যক্রমের অঙ্গীকার নিয়ে গঠিত হয়েছে ছায়ানটের নতুন কার্যকরী সংসদ। এতে সারওয়ার আলী সভাপতি এবং লাইসা আহমদ লিসা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন...
৯ দিন আগে
কবি রাজীব কুমার দাশের ‘সুখবতী’ কাব্যগ্রন্থ থেকে তিনটি কবিতা আবৃত্তি করেন নূরুননবী শান্ত। এরপরে রাজীবের কবিতা নিয়ে দুটি প্রবন্ধ পাঠ করা হয়। নাট্যকার ও গবেষক শরণ এহসান ‘রাজীব দাশের নিরন্ন ললাট: কাব্যতত্ত্ব, সাহিত্যতত্ত্ব ও নন্দনতাত্ত্বিক পাঠ’ শীর্ষক প্রবন্ধ এবং গবেষক হাসান দবির উদ্দিন ‘প্রেম,....
১৫ দিন আগে