Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অনিশ্চিত, ইরানে কি ফের ‘অতর্কিত হামলা’

আব্দুর রহমান 
আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৩৩
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অনিশ্চিত, ইরানে কি ফের ‘অতর্কিত হামলা’
নতুন দফার আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তান। ছবি: এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল রোববার জানিয়েছিলেন, তাঁর পাঠানো প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে যাবে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে। এমনকি আজ সোমবার কিংবা আগামীকাল মঙ্গলবার আলোচনা হতে পারে এমনও একটি আশা ছিল। আগামীকাল মঙ্গলবারই ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এই অবস্থায় ইরান নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং দেশটি আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও তাদের ওপর ‘অতর্কিত হামলা’ চালিয়ে বসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে ‘যুদ্ধক্ষেত্রের ধারাবাহিকতা’ হিসেবেই দেখছে ইরান। দেশটি আলোচনার ক্ষেত্রে দুটি চূড়ান্ত সীমা বা রেডলাইন নির্ধারণ করেছে। তারা লেবাননে যুদ্ধবিরতি ও জব্দ সম্পদ মুক্তির দাবিতে অনড়। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, ইরান তাদের পূর্বশর্তে এখনো অনড়। তিনি বলেন, ‘লেবাননের বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জব্দ করা সম্পদ মুক্তির বিষয়টিও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পূর্বশর্তগুলোর একটি। স্বাভাবিকভাবেই, ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো এসব মূলনীতির ওপর দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে।’

এই শর্তগুলো মানা না হলে পরিণতি ভালো হবে মর্মেও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে সতর্ক করেন আজিজি। তিনি বলেন, ‘যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় যা রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়—যা আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রেরই অংশ—অথবা তারা যদি পূর্বের প্রতিশ্রুতিগুলো মেনে না চলে, তাহলে সেটির অর্থ হবে তারা ইরানের পূর্বশর্তগুলো গ্রহণ করেনি, এবং এর স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়বে।’

ইরানিরা আলোচনা থেকে ইতিবাচক ফলাফল আসবে—এমন বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী নন। বরং, তাদের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অতীতের মতো যেকোনো সময় ‘অতর্কিত হামলা’ চালিয়ে বসতে পারে। ইরানের সূত্র জানিয়েছে, ‘ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনার ফলাফলের ক্ষেত্রে খুব একটা আশাবাদী নন। তারা মনে করছেন, ট্রাম্পের আলোচনার আলাপ মূলত মার্কিন অতর্কিত হামলার একটি মোড়ক মাত্র।’

ইব্রাহিম আজিজির কথা থেকেও যেন বিষয়টি ধরা পড়ে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান আলোচনাগুলোকে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখি এবং এর বাইরে আমরা কিছুই দেখি না। যদি এটি যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে, তাহলে আলোচনার ক্ষেত্রও আমাদের জন্য একটি সুযোগ... কিন্তু যদি আমেরিকানরা তাদের দাদাগিরির কৌশলের ভিত্তিতে এটিকে অতিরিক্ত দাবি চাপিয়ে দেওয়ার মঞ্চে পরিণত করতে চায়, তাহলে নয়।’

ইরান ইসলামাবাদে কোনো প্রতিনিধি দল পাঠাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আজিজি ইঙ্গিত দেন, এটি নির্ভর করবে তেহরান ইতিবাচক কোনো সংকেত পায় কি না তার ওপর। তিনি বলেন, ‘আমরা কখনো আলোচনার মূলনীতিকে ভয় পাইনি। হয়তো আজ বা আগামীকাল, আরও মূল্যায়নের পর আমরা এটিকে সম্ভাব্য মনে করতে পারি—যদি আমেরিকান আলোচক দল এবং তারা ইরান থেকে যে বার্তা পেয়েছে, তা ইতিবাচক সংকেত দেয়।’

আজিজির বার্তা থেকে স্পষ্ট যে, ইরান আলোচনা চায়। তবে যে দুটি রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করেছে—সেই বিষয়ে তারা অনড়। একই সঙ্গে, তারা মার্কিন–ইসরায়েলের ফের সম্ভাব্য হামলার জন্যও প্রস্তুত। পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, ইরান এরই মধ্যে তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নতুন করে নির্ধারণ করছে, পুনরুদ্ধার করছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাজিদ মুসাভি বলেছেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার সক্ষমতা আগের তুলনায় দ্রুত বাড়াচ্ছে ইরান। আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার মাজিদ মুসাভি বলেন, যুদ্ধবিরতির সময়েও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম আধুনিকীকরণ এবং পুনরায় প্রস্তুত করার গতি আগের চেয়ে বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রতিপক্ষ এ সময় নিজেদের গোলাবারুদ পুনর্গঠনে সফল হয়নি।

মাজিদ মুসাভি জানান, প্রতিপক্ষকে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে অস্ত্র সরবরাহ করতে হচ্ছে, যা তাদের সামরিক প্রস্তুতিকে সীমিত করছে। তিনি বলেন, ‘এই পর্যায়ে তারা পরাজিত হয়েছে।’ এ ছাড়া আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও প্রতিপক্ষের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইরানের রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদমাধ্যম নূর নিউজে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনে একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি ভূমি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের দৃশ্যও দেখানো হয়েছে। তবে ইরানের এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের বক্তব্য অনেক সময় কৌশলগত বার্তা হিসেবেও দেওয়া হয়ে থাকে।

এদিকে, মার্শাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোশেস বলেছেন, ইরানের সমর্থনে সংঘাতে জড়াতে ইয়েমেনের হুতিরা ‘খুব একটা আগ্রহী নয়।’ কিন্তু গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

রোশেস বলেন, ‘ইরান এবারে যখন প্রক্সি বাহিনীগুলোকে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেয়, তখন কেবল লেবাননের হিজবুল্লাহ সক্রিয় হয়ে ওঠে, কিন্তু হুতিরা এখানে কেবল প্রতীকী বা নামমাত্র পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা আসলে ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে কর্তৃত্ব আরও মজবুত করার দিকে বেশি মনোযোগী এবং আরেকটি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়।’

তিনি আরও যুক্তি দেন, বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের কোনো পদক্ষেপকে বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হবে না। তিনি বলেন, ‘বাব এল-মান্দেব প্রণালি এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বর্তমানে হামলার ঝুঁকি ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক বিমা কোম্পানিগুলোর হিসাবের মধ্যেই ধরা আছে এবং সবচেয়ে উচ্চমূল্যের পণ্যবাহী জাহাজগুলো ইতিমধ্যেই এই প্রণালি এড়িয়ে চলছে।’

কিন্তু ট্রাম্প সম্ভবত ইরানে আবারও আগ্রাসন শুরু করার বিষয়টি মাথা থেকে সরিয়ে ফেলেননি। অতীতের বিভিন্ন প্রতিবেদন যেমনটা বলে যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কাছে ভুয়া তথ্য দিয়ে তাঁকে ইরানে হামলা করতে প্ররোচিত করেছেন। তেমনটা এবারও যে হবে তাঁর কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, ইসরায়েলের রাজনীতিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর টিকে থাকার একমাত্র পথই এখন যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা জারি রাখা। যাতে, তাঁকে কেন্দ্র করে আদালতে চলতে থাকা দুর্নীতি মামলা স্থগিত রাখা যায়।

এই মামলা যত দিন স্থগিত থাকবে তত দিনই তিনি তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখতে পারবেন। ফলে, তিনি যে সর্বশক্তি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়ে তাঁর ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিক যুদ্ধ টেনে নিয়ে যেতে চাইবেন সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কতটা সফল হবেন সেই বিষয়ে অবশ্য প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক কাউন্টার টেররিজম প্রধান জো কেন্ট বলেছেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট দুটি পথ সামনে রাখছেন—একটি হলো সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি, আরেকটি বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি। কিন্তু তৃতীয় একটি পথ আছে এবং সেটিই তাঁর নেওয়া উচিত। তাঁর স্বীকার করা উচিত যে—জোর করে ইতিবাচক ফল আনা সম্ভব নয় এবং সেখান থেকে সরে আসা।’

ইতিহাস বলে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল কখনোই বল প্রয়োগ করে নিজেদের স্বার্থ অনুসারে পুনর্গঠন করা সঠিক জায়গাটি নয়। ট্রাম্প এখন ইরানে যা করছেন, ১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান লেবাননে এই পথই বেছে নিয়েছিলেন। বৈরুতের ব্যারাকগুলোতে ব্যাপক বোমা হামলার পর যখন পরিষ্কার হয়ে যায় যে, লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নয়, তখন তিনি মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করেন। এর মাধ্যমে সরাসরি মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততার ইতি ঘটে এবং একটি গভীর জটিলতা ও দীর্ঘমেয়াদি জড়িয়ে পড়া এড়ানো সম্ভব হয়।

আবার বাস্তবতাও বলে, সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিংবা ইরান সমঝোতার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নেবে এমন সম্ভাবনাও কম। অবশ্য আজিজি যেমনটা উল্লেখ করেছেন, লেবানন ইস্যু, জব্দ করা অর্থ ছাড় এবং পরমাণু সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে মার্কিন ছাড়ের বিষয়টি সামনে আসলে ইরান নমনীয় হলেও হতে পারে।

জো কেন্ট বলছেন, এই অবস্থায় ‘বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি ইরান, পুরো অঞ্চল এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে। যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও বল প্রয়োগের পথ বেছে নেন এবং বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেন, তাহলে আমরা আরেক প্রজন্মের কট্টরপন্থী ইরানিদের তৈরি করব, যারা শাসনব্যবস্থার পক্ষে একত্রিত হবে এবং যেকোনো উপায়ে যুদ্ধকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।’

আর যদি ট্রাম্প বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হেনে বিজয় ঘোষণা করে সরে যাওয়ার পথ বেছে নেন, তাহলে বৈশ্বিক পরিসরে মার্কিন অবস্থান আরও দুর্বল করব, পেট্রোডলার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার অধিকারী হিসেবে মার্কিন ডলারের অবস্থানও নড়বড়ে হয়ে যাবে। জো কেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘ব্যর্থতার ওপর আরেকবার বাজি ধরবেন না। অহেতুক ব্যয়ের ফাঁদে (sunk cost trap) পড়বেন না। এখনই সরে আসুন এবং আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: নিবন্ধনের বদলে সরাসরি পরীক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে যা আছে (দ্বিতীয় পর্ব)

ইরান যুদ্ধে নিহত সর্বকনিষ্ঠ কুর্দি নারী যোদ্ধা গজল মোলান

সিনেমা হলে হঠাৎ পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার তরুণ-তরুণী, কেন

সিটি ও আন্তজেলা বাসে ২২ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর আলোচনা, সিদ্ধান্ত কাল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত