
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে চীন ও রাশিয়া। দেশ দুটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপের কারণে বেইজিং ও মস্কো তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। ইরানকে অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ বা টিকে থাকার পথ করে দিচ্ছে—এমন যেকোনো দেশকে আর্থিকভাবে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। তেহরানের বিরুদ্ধে তাঁর ভাষায় এটি হবে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ানোর পর দেশটির ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্পের এটি সর্বশেষ উদ্যোগ। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর একের পর এক বাণিজ্যযুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি। তবে ইরানের ক্ষেত্রে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, ট্রাম্পের এই চাপের কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়ন করা ‘খুবই কঠিন’ হবে। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন এক ধরনের সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা একতরফাভাবে কার্যকর করতে চাইছেন, যা অতীতে বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে করা হয়েছে। এ জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের (পি-৫) সমর্থনও প্রয়োজন হতে পারে।
গত মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান হবে ‘কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’।
ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সহায়তা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ‘ভয়ানক অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করার হুমকি দেন তিনি। তেল চোরাচালান, মুদ্রা বিনিময়ের ব্যবস্থা, নগদ অর্থ স্থানান্তর, এক্সচেঞ্জ হাউস, জাহাজ নিবন্ধন এবং ভুয়া বা শ্যাডো কোম্পানির মাধ্যমে ইরানকে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, এসব কর্মকাণ্ড ‘এখনই বন্ধ করতে হবে’।
এর আগে একই দিন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বাজারে প্রবেশের জন্য ইউএইর ওপর নির্ভরশীল। ইউএইর অভিযোগ, ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবি মনে করেন, ইউএইর এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থাকতে পারে। তাঁর মতে, ইরানের অন্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবে ওয়াশিংটন। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে চীন।
তবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য থামানো কঠিন। কারণ চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে চীন-ইরান বাণিজ্য বন্ধ বা সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কিনেছে চীন। ফলে ইরানের তেল বিক্রির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে হলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও বিবেচনায় নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।
তবে চীনের তেল শোধনাগারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা সহজ নয়। দেশটির বেশির ভাগ শোধনাগার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে ইরানের তেল কেনার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
ইরানের অর্থ লেনদেনে সহযোগিতা করা বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে চীনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এতে চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে, তখন এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল করে তুলতে পারে।
চ্যাথাম হাউসের চীন ও এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে ট্রাম্পের হুমকি চীনের ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বদলাতে পারবে না। তিনি বলেন, ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চান। অন্যদিকে বেইজিংও ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি ‘সাময়িক যুদ্ধবিরতি’ বা উত্তেজনা কমানোর পথ খুঁজছে।
পল মাসগ্রেভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর সেকেন্ডারি স্যাংশন আরোপ করে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে চাইবেন না। কারণ দুই দেশ বর্তমানে অনেকটা ‘অর্থনৈতিক শীতল যুদ্ধের’ অবস্থায় রয়েছে।
ট্রাম্পের চাপের প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আগামী মাসে ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের শেষ দিকে দুই দেশের নেতাদের আরও দুটি বৈঠক হতে পারে।
এদিকে চীনের তুলনায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছোট হলেও মস্কো-তেহরানের সম্পর্ক ওয়াশিংটনের জন্য আলাদা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতার পথ তৈরি করতে কয়েক বছর ধরেই কাজ করছে রাশিয়া ও ইরান।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ ২০ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। রুশ জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই তসিভিলেভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের পাশাপাশি রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামও আদান-প্রদান হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কাস্পিয়ান সাগর ব্যবহার করে এসব সরঞ্জাম পরিবহনের অভিযোগও রয়েছে।
গত সোমবার এনবিসি নিউজ একটি ইউরোপীয় সরকারের নথির বরাত দিয়ে জানায়, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি পাঠিয়েছে।
রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে মস্কোকে ইরান থেকে দূরে সরাতে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগও ওয়াশিংটনের জন্য সীমিত।
ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক চাপের কঠোর সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গতকাল বুধবার তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অভিযান ওয়াশিংটনের ব্যর্থ নীতিরই ধারাবাহিকতা এবং এর ফল হবে আরও একটি পরাজয়।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
ইরান পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প অর্থনৈতিক পথ তৈরির চেষ্টাও করছে। এ ক্ষেত্রে ব্রিকসকে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে তেহরান। ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিলসহ বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশ রয়েছে।
গত সপ্তাহে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি জানান, ইরান ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এই ব্যাংকের সদস্য হতে পারলে পশ্চিমা বাজারের বাইরে ইরানের জন্য অর্থায়নের আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হেম্মাতি বলেন, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো নিজেদের জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন করতে পারে। ইরান অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় মুদ্রা সহযোগিতার পথও খুঁজছে। তবে এনডিবি এখনো ইরানের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সদস্য হতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে তেহরানকে।
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলি আকবর দারেইনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান কোনো না কোনোভাবে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধে আটকে গেছেন, যা তিনি জিততে পারছেন না এবং সেখান থেকে বের হয়ে আসতেও পারছেন না।
সব মিলিয়ে, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা শুধু তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও। ফলে ইরানের ওপর সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর করতে গেলে ওয়াশিংটনকে একই সঙ্গে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে নতুন করে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ সামলাতে হবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

চলতি মাসে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর কোনো নির্দিষ্ট ও তাৎক্ষণিক হুমকির জবাবে রিয়াদের নেওয়া পদক্ষেপ ছিল না, যেমনটা অনেকে মনে করছেন। গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এই চুক্তির পেছনে তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের মিল তৈরি হয়েছে। তিন দেশের ভৌগোলিক অ
৯ ঘণ্টা আগে
২৫ বছর ধরে ক্ষমতার ঘোড়ায় চড়ে আছেন নরেন্দ্র মোদি। প্রথমে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে, পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তাই এখন তাঁর ক্ষমতার শীর্ষে থাকার দিন যে শেষের দিকে চলে এসেছে, সেটি বিশ্বাস করাও হয়তো তাঁর জন্য কঠিন। কিন্তু পুলওয়ামার মতো আরেকটি ঘটনা বা অন্য কোনো ‘অলৌকিক’ ঘটনা না ঘটলে...
১২ ঘণ্টা আগে
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলার মধ্যেই ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের দাবি জোরালো হচ্ছে। দেশটির বরখাস্ত হওয়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভসহ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
১ দিন আগে
জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে বিশ্বের অনেক দেশে জনসংখ্যা এখন আর বাড়ছে না, বরং স্থায়ীভাবে কমতে শুরু করেছে। জনসংখ্যাবিদদের কাছে এটি মানব ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ বা মহামারির মতো সাময়িক কারণে অতীতে জনসংখ্যা কমেছে।
২ দিন আগে