Ajker Patrika

বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনি শুধু হরমুজ নয়, পানামা-মালাক্কাও সংকটের মুখে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ২৩: ২২
বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনি শুধু হরমুজ নয়, পানামা-মালাক্কাও সংকটের মুখে
ছবি: সংগৃহীত

ভিক্টোরিয়ান অ্যাডমিরাল স্যার জ্যাকি ফিশার একসময় বলেছিলেন, পাঁচটি কৌশলগত ‘চাবি’ দিয়ে পুরো বিশ্বকে আটকে রাখা সম্ভব। সিঙ্গাপুর, কেপ টাউন, আলেকজান্দ্রিয়া, জিব্রাল্টার এবং ডোভার—এই পাঁচটি জলপথই ছিল বিশ্ব শাসনের মূল চাবিকাঠি। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই তালিকায় আরেকটি নাম যোগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা এখন সবার ওপরে উঠে এসেছে আরব উপদ্বীপের সংকীর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ। ইরান এই জলপথ অবরোধ করে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ কার্যত অচল করে দিয়েছে। তবে সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হরমুজ নয়, বিশ্বের আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এখন চরম ঝুঁকির মুখে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে।

সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ওপর বিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ রপ্তানি নির্ভর করে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগেও বিশ্ব বাণিজ্যের এই ধমনিগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আবারও প্রমাণ করেছে। সস্তা প্রযুক্তির প্রসারের ফলে এখন ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীও অনেক দূর থেকে এসব প্রণালিতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালাতে পারছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লোহিতসাগরে চালানো হামলা এর বড় উদাহরণ। এর ফলে সুয়েজ খালগামী বিশ্ব বাণিজ্যের বড় একটি অংশ এখন আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার আধিপত্য এবং তুরস্কের বসফরাস ও দার্দানেলাস প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

শুধু যুদ্ধ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনও বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তীব্র খরার কারণে পানামা খালের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল সীমিত করতে হয়েছে, যা অনেক বড় বাণিজ্যিক কোম্পানিকে বিকল্প দীর্ঘ পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। অন্যদিকে, আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার ফলে বেরিং প্রণালির মতো দূরবর্তী পয়েন্টগুলোর গুরুত্বও বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে পানামা খাল এবং গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন, যা এই জলপথগুলোকে নিয়ে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

বাণিজ্যিক দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালি হরমুজের চেয়ে বেশি ব্যস্ততম। চীনের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ এই পথ দিয়েই আসে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করছে, যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এই পথ অবরোধ করতে পারে। এই ‘মালাক্কা সংকট’ এড়াতে চীন এখন রাশিয়ার সঙ্গে পাইপলাইন তৈরি এবং পাকিস্তান ও মিয়ানমার হয়ে বিকল্প রুট গড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যদি কোনো বড় সংঘাত বা অবরোধ তৈরি হয়, তবে তা বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহে বিপর্যয় ডেকে আনবে। কেননা এই শিল্পের সিংহভাগই চীনের দখলে।

বর্তমান ইরান যুদ্ধের ফলে বিমা কোম্পানিগুলো উচ্চ ঝুঁকির কারণে কাভারেজ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক অবরোধ ছাড়াও অনেক জলপথ জাহাজ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে ৩০০টির বেশি তেলবাহী ট্যাংকার আটকা পড়ে আছে এবং শিপিং চার্টার রেট প্রতিদিন ৯০ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। লরি, সড়ক বা পাইপলাইনের মাধ্যমে এই বিশাল পণ্য সরবরাহ বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব।

পরিশেষে, মুক্ত নৌ-চলাচলের যে নীতি এক শতাব্দী ধরে বিশ্ব বাণিজ্যকে সচল রেখেছিল, তা এখন গভীর সংকটে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং ইরানের কঠোর অবস্থান বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদি এই প্রধান চাবিকাঠি বা জলপথগুলো দীর্ঘকাল অবরুদ্ধ থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে, যার প্রভাব থেকে কোনো দেশই মুক্ত থাকতে পারবে না।

দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ব্যাংক এশিয়ার কাছে ৪৭.৫ মিলিয়ন ডলারে বাংলাদেশি কার্যক্রম বিক্রি করছে পাকিস্তানি ব্যাংক আলফালাহ

আমির হামজার বিস্ফোরক মন্তব্য: ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী টুকু নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী’

জোড়া লাল কার্ডের ম্যাচে ভারতকে রুখে দিল বাংলাদেশ

সৌদি যুবরাজ আমাকে তোষামোদ করছেন: ট্রাম্প

দেশের সব পেট্রলপাম্পে নিয়োগ হবে ট্যাগ অফিসার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত