Ajker Patrika

ইরান যুদ্ধে আইআরজিসির মাঘ মাস, জনগণের সর্বনাশ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরান যুদ্ধে আইআরজিসির মাঘ মাস, জনগণের সর্বনাশ
ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে সংঘাতের ধরন ও লক্ষ্যবস্তুতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যুদ্ধের প্রথম মাসে পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোকে কিছুটা ‘নিরাপদ’ রাখলেও, এপ্রিলের শুরু থেকে কৌশল বদলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন ও জেরুজালেম এখন সরাসরি ইরানের ‘অর্থনৈতিক ইঞ্জিন’ ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যাকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে, সেই শাসকগোষ্ঠী কি আদৌ বেসামরিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল?

২ এপ্রিল ইরানের উচ্চতম সেতু ‘বি-১’ ধ্বংস করার মাধ্যমে আমেরিকা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, এখন থেকে বেসামরিক স্থাপনাও তাদের নিশানায় থাকবে। এর প্রতিক্রিয়ায় কুয়েতের তেল শোধনাগারে ইরান ড্রোন হামলা করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ট্রাম্পের ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম (না খুললে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু গুঁড়িয়ে দেওয়া) যুদ্ধকে এক সর্বাত্মক রূপ দিচ্ছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য হলো, জনজীবন স্থবির করে দিয়ে সরকারের ট্যাক্স রেভিনিউ কমিয়ে দেওয়া, যাতে তাঁরা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারায়।

যুদ্ধের আগুনে ইরান এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে সাধারণ ইরানিদের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। গত জুন মাসের বোমা হামলা এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির অর্থনীতি আগেই পঙ্গু ছিল। বর্তমানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশই কর্মহীন। বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যুদ্ধের মাত্র কয়েক দিনে ইরানি রিয়ালের মান আরও ৮ শতাংশ পড়ে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা চরম আকার ধারণ করেছে। বিক্ষোভ দমনে সরকারের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট সেবা খাতকে ধ্বংস করে দিয়েছে। দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য প্রায় বন্ধ করে দেওয়ায় এবং হাজার হাজার ‘শেল কোম্পানি’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় বিদেশি পণ্যের আকাল দেখা দিয়েছে।

এত কিছুর পরও যুদ্ধের মধ্যে ফুলেফেঁপে উঠছে ইরানের সামরিক কোষাগার। সাধারণ মানুষ যখন না খেয়ে মরছে, তখন ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) বা পাসদারানরদের পোয়াবারো হয়েছে। যুদ্ধ যেন তাঁদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো তেল-বাণিজ্য একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। ২০২৫ সালে ইরানের মোট তেল রপ্তানির অর্ধেকই ছিল আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় তাদের আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চীন ও রাশিয়ার জটিল ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা অনায়াসেই এই অর্থ সংগ্রহ করছে।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় বাজারে একাধিপত্য। বিদেশি পণ্য আসা বন্ধ হওয়ায় ইরানিরা এখন বাধ্য হয়ে আইআরজিসির মালিকানাধীন কোম্পানির প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ এবং প্রসাধনী কিনছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা মতে, মাত্র এক মাসে আইআরজিসিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা দ্বিগুণ হয়েছে।

তৃতীয়ত, অবৈধ বাণিজ্য ও টোল আদায়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিটি জাহাজ চলাচলের জন্য ২ মিলিয়ন ডলার ‘টোল’ আদায়ের যে পরিকল্পনা ইরান করেছে, তা থেকে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া মাদক ও চোরাচালানের সিন্ডিকেটগুলোও যুদ্ধের বাজারে প্রিমিয়াম দামে পণ্য বিক্রি করছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত কঠোর অবস্থানে গেলেও ইরানের ওপর তার প্রভাব সীমিত। কারণ ইরানের অধিকাংশ তেলের টাকা জমা হয় চীনের ব্যাংকিং সিস্টেমে। এ ছাড়া ইরানের নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম ‘শেতাব’ এখন রাশিয়ার ‘মির’ সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এই অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় লেনদেন থামাতে পারছে না।

আমেরিকা ও ইসরায়েল যদি সরাসরি ইরানের তেল উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে আঘাত না হানে, তবে আইআরজিসির আর্থিক সক্ষমতা কমানো অসম্ভব। কিন্তু তেলের ওপর আঘাত মানেই হলো পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের পাল্টা হামলা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভয়াবহ বিপর্যয়। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাঁরা এই মরণপণ লড়াইয়ে সাধারণ ইরানিদের বলি দিতে প্রস্তুত; কিন্তু তাদের সামরিক ও আদর্শিক লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়বে না।

দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত