
‘এটি মোটর ট্যাংকার মারিভেক্স। আমাদের জাহাজে আগুন লেগেছে। মার্কিন নৌবাহিনী ইঞ্জিন রুমে হামলা চালিয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমাদের জাহাজের সব ক্রু ভারতীয়।’
আধা মিনিটেরও কম সময়ে পর পর পাঁচটি এসওএস বা জরুরি সাহায্যের আকুতি। প্রতিটি বার্তার সঙ্গে বাড়ছিল আতঙ্ক, রেডিও চ্যানেলে ভেসে আসছিল ভাঙা কণ্ঠস্বরের আর্তনাদ। গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির কাছে আটকে পড়া ভারতীয় নাবিকদের জন্য এটি ছিল উপকূল ও কোনো সাহায্য থেকে বহু দূরে এক সামুদ্রিক দুঃস্বপ্নের সূচনা।
গত ৮, ১০ ও ১১ জুন পৃথক তিনটি ঘটনায় ভারতীয় ক্রু বহনকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ—এমটি মারিভেক্স, সেত্তেবেলো এবং জলবীরের ওপর হামলা চালায় মার্কিন নৌবাহিনী। এর মধ্যে ‘এমটি সেত্তেবেলো’ জাহাজে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। মারিভেক্স ও জলবীরের সব ক্রু সদস্যকে পরবর্তীতে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, সেত্তেবেলোর ভাগ্য ততটা প্রসন্ন ছিল না। সেখানে থাকা ৩ জন ভারতীয় (একজন চিফ ইঞ্জিনিয়ার, একজন ইঞ্জিন ফিটার ও একজন ডেক ক্যাডেট) নিহত হন।
এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে জাহাজগুলোর ইঞ্জিন রুম আগুনে পুড়ে যায় এবং সেগুলো মাঝসমুদ্রে অচল হয়ে পড়ে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, জাহাজগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ অমান্য করে ইরানি তেল পরিবহন করছিল। তবে জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো মার্কিন এই দাবি আংশিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওমান উপকূলের শিনাস অঞ্চলের কাছে হামলার শিকার হওয়া ‘এমটি সেত্তেবেলো’র ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান আইওএস মেরিন এফজেডই জানিয়েছে, তাদের জাহাজটি টানা ১০ দিন ধরে সেখানে স্থির অবস্থায় ছিল এবং মার্কিন নৌবাহিনীর কাছ থেকে তাঁরা কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা পায়নি। একই সঙ্গে ইরানি তেল বা বন্দরের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথাও তাঁরা অস্বীকার করেছে।
‘এমটি জলবীর’ জাহাজের চিত্র আরও ভয়াবহ। হামলার পর সেখান থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছিল, ‘শিনাস পোর্ট কন্ট্রোল, আমাদের সব ক্রু নিরাপদ আছেন। কিন্তু আমাদের ইঞ্জিন রুমে আগুন লেগেছে। আমাদের উদ্ধার করুন।’ একের পর এক বিস্ফোরণে জাহাজের যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত এই জাহাজের ২০ জন ভারতীয় নাবিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে ওমান কোস্টগার্ড।
মার্কিন নৌবাহিনী যখন একের পর এক ভারতীয় ক্রু থাকা জাহাজে হামলা জোরদার করছিল, ঠিক তখনই ওমান উপকূলে আরেকটি জাহাজে এক ভারতীয় নাবিকের মৃতদেহ প্রায় তিন দিন ধরে পচন ধরা অবস্থায় পড়ে ছিল। কিন্তু জাহাজের ক্যাপ্টেনের পাঠানো জরুরি বার্তায় সাড়া দেয়নি কেউ।
নিশান্ত উইর্থানাথান (৩৫) নামের ওই সেকেন্ড অফিসার গত ৮ জুন ‘এমটি সেলেস্টিয়াল’ নামে ওই জাহাজটিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অবস্থা ক্রমাগত সংকটাপন্ন হতে থাকায় গত ১০ ও ১১ জুন মার্কিন নৌবাহিনীর (যারা এই নৌ-অবরোধের দায়িত্বে নিয়োজিত) কাছে বারবার এসওএস বা জরুরি সাহায্যের বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। অবশেষে ১১ জুন তিনি জাহাজেই মারা যান।
শিপিং কোম্পানি বা ওমানের নিকটবর্তী দুকম বন্দর কর্তৃপক্ষ কেউই ওই নাবিককে মার্কিন নৌবাহিনীর ভয়ে সময়মতো উদ্ধার বা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেনি। ফরওয়ার্ড সিমেনস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, জাহাজটিতে কোনো প্রপার রেফ্রিজারেশন বা লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায়, সহকর্মী নাবিকেরা লাশের পচন রোধ করতে প্লাস্টিকের শিটে মুড়িয়ে তার ওপর ঠান্ডা পানির বোতল রেখে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৪ জুন একটি ক্রেনের সাহায্যে লাশটি নিচে নামানো হয় এবং বর্তমানে সেটি দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে। ওমানে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, তাঁরা নিশান্তের মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠাতে সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে।
সমুদ্রে যখন এই উত্তেজনা ও মানবিক বিপর্যয় চলছে, তখন স্থলভাগে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্লেম-গেম বা কাদা ছোড়াছুড়ি তীব্র রূপ নিয়েছে। ভারত এই হামলার নিন্দা জানিয়ে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের প্রধানকে তলব করে ব্যাখ্যা দাবি করেছে।
তবে ওয়াশিংটন নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে এক ফোনালাপে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ পরিবহন বরদাশত করা হবে না। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার পেছনে উল্টো ইরানকেই দায়ী করেছেন।
এক সময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ট্রাম্প-মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ‘ব্রোম্যান্স’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে উপসাগরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মোদির বন্ধু ট্রাম্পের নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে প্রাণ যাচ্ছে ভারতীয় নাবিকদের। অথচ এই যুদ্ধের পেছনে সাধারণ ভারতীয় নাবিকদের কোনো হাত নেই। তারপরও এক নির্মম কোলাটেরাল ড্যামেজ বা বলির পাঁঠা হতে হচ্ছে তাঁদের। তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রজনিত মৃত্যু এবং একটি পচন ধরা লাশ—সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির ভূ-রাজনীতি ও মার্কিন আগ্রাসনের মূল্য দিতে হচ্ছে ঘর থেকে বহু দূরে থাকা অসহায় নাবিকদেরই।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা এবং নরওয়ে ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মতরিচকে তাদের দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। তিনি গাজায় ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন এবং দখল করা পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে মত দিয়ে আসছেন।
২ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তির এক বছর হয়েছে। চুক্তির আলোকে গাজায় প্রাথমিকভাবে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। তারা কায়রোতেই অবস্থান করছে এবং গাজায় প্রবেশে ইসরায়েলের অনুমতির...
৩ দিন আগে
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও এর ফলে ব্যাপক প্রাণহানির প্রভাব ব্রিটেনের রাজনীতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। একসময় রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বহু ব্রিটিশ নাগরিক এখন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন।
৪ দিন আগে
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের জাঁতাকল, চড়া সুদহার, শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈরী আবহাওয়ার নানা বাধা সত্ত্বেও ভারত সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি ঈর্ষণীয় গতিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের দাবি করছে। যদিও ভারতের বিরোধীদের মধ্যে এই হার নিয়ে তীব্র দ্বিমত রয়েছে।
৫ দিন আগে