Ajker Patrika

চারদিকে শত্রু নিয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধে কত দিন টিকবে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চারদিকে শত্রু নিয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধে কত দিন টিকবে ইরান
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক শক্তির বড় ধরনের ক্ষতি করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে আঘাত পেলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা হয়তো টিকে যেতে পারে—যদিও তাদের সামনে অপেক্ষা করছে জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট।

এই বিষয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে—২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ ঘোষণা করার পর তা সমালোচনার মুখে পড়েছিল। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিজয় ঘোষণা সেই ঘটনারই প্রতিধ্বনি। ফ্লোরিডায় নিজের গলফ রিসোর্টে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রায় সব সামরিক শক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের নৌবাহিনীর বড় অংশ ডুবে গেছে।

তবে পরিস্থিতি এতটা সরল নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ট্রাম্প প্রথমদিকে ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’ বা রেজিম চেঞ্জের কথা বললেও এখন তা অনেকটাই অনিশ্চিত। বরং ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের সরকার টিকে যেতে পারে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজার ও উপসাগরীয় অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা করছে, যদি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অক্ষত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও পুরো অঞ্চলকে জিম্মি করে ফেলতে পারে তেহরান।

ইরান ইতিমধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কয়েকটি বিমানবন্দরে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমুদ্র ও আকাশপথে যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা তাদের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে বলে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।

বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিটজ একসময় ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত তিনি। সিট্রিনোভিটজের মতে, ইরানকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, ‘তাদের ওপর প্রতিদিন হামলা হচ্ছে। কিন্তু তাদের গোলাবারুদ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই।’

সিট্রিনোভিটজ আরও মত দিয়েছেন, ইরানের ভৌগোলিক আকার ও সামরিক কাঠামো এত বড় যে, শুধু আকাশ হামলায় চূড়ান্ত ফল পাওয়া কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি অভিযান এবং স্থলবাহিনী মোতায়েন ছাড়া সম্পূর্ণ বিজয় সম্ভব নয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো রাজনৈতিক সমর্থনও সীমিত। নতুন জরিপে দেখা গেছে, দেশটির অনেক ভোটার এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন এবং তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় তাঁরা উদ্বিগ্ন। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জন অল্টারম্যানের মতে—ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে দ্রুত একটি বিজয় দেখাতে চাইতে পারেন। কারণ বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তাঁর অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

যুদ্ধের শুরুতেই নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর মৃত্যুর পর দেশটির নতুন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরই ছেলে মোজতবা খামেনি। মূলত দেশটির শক্তিশালী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সমর্থনে তিনি নেতৃত্বে এসেছেন। এতে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য আরও কঠোরপন্থিদের দিকে ঝুঁকেছে।

তবে যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে দেশের ভেতরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার সংকটকে কেন্দ্র করে তীব্র বিক্ষোভ হয়েছে, যা সরকার কঠোরভাবে দমন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়তে পারে এবং জনগণের অসন্তোষও তীব্র হতে পারে।

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য প্রকল্পের প্রধান সনম ভাকিল মনে করেন—এই যুদ্ধ হয়তো ইরানের সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে পতনের মুখে ফেলবে না। তবে দীর্ঘ মেয়াদে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন শুধু যুদ্ধের ফল নয়; বরং যুদ্ধের পর ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে—সেটাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত