Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্র কি খাল কেটে আনা কুমির, এবার ভাববে জিসিসি দেশগুলো

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্র কি খাল কেটে আনা কুমির, এবার ভাববে জিসিসি দেশগুলো
ছবি: সংগৃহীত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ কেবল তেহরান বা ওয়াশিংটনের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না, বরং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর (জিসিসি) কয়েক দশকের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দর্শনকে এক নিমেষেই ওলট-পালট করে দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, ওমান, কাতারসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েক শ ড্রোন ও মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। এই হামলার ভয়াবহতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের যে স্থিতিশীলতাকে পুঁজি করে দুবাই বা রিয়াদের মতো শহরগুলো বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, তা এখন খাদের কিনারায়।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ‘প্রজেক্ট ফর মিডল ইস্ট ইন্টিগ্রেশন’-এর পরিচালক অ্যালিসন মাইনরের বিশ্লেষণ বলছে, ইরান যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিশ্বদর্শন হবে আগের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। পরস্পরকে সরাসরি আক্রমণ না করতে তেহরানের সঙ্গে আবুধাবির দীর্ঘদিনের একটি ‘জেন্টলম্যানস অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ভদ্রলোকের চুক্তি ছিল। দুবাইয়ের অর্থনীতিতে ইরানের বিশাল বিনিয়োগ সেই চুক্তির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করত। কিন্তু গত কয়েক দিনে দুবাইয়ের বিমানবন্দর, হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ইরানের ড্রোন হামলা সেই বিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরিয়েছে। ২০২২ সালে হুতি বিদ্রোহীদের হামলাকে আমিরাত তাদের নিজস্ব ‘৯/১১’ বলে অভিহিত করেছিল; এবারের ইরানি হামলা তারচেয়ে দশ গুণ বেশি শক্তিশালী। আমিরাত এখন বুঝতে পারছে, ইরানের সঙ্গে কেবল মৌখিক সমঝোতা বা বাণিজ্যিক স্বার্থ দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ওমান দীর্ঘকাল ধরে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’—এই নীতি মেনে চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছিল। কিন্তু এবারের যুদ্ধে ওমানও ইরানের লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রেহাই পায়নি। ঘটনাটি একটি কঠোর বার্তা দিচ্ছে, বর্তমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য ‘নিরপেক্ষ’ থাকার সুযোগ নেই বললেই চলে। ওমানের মতো দেশকেও এখন হয়তো কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে।

কাতার বা কুয়েতের মতো দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও ইরানের ড্রোন হামলা ঠেকানো যায়নি। এর আগে, ২০২৫ সালে কাতারের দোহায় ইসরায়েলি হামলা এবং সাম্প্রতিক ইরানি ড্রোন হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর মনে এই প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে—যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি গাড়তে দিয়ে কি তারা উল্টো নিজেদের বিপদ বাড়িয়ে তুলছে? মার্কিন প্রশাসন যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের উপস্থিতি কমিয়ে আনতে চাইছে, তখন এই ঘাঁটিগুলো কি আসলেই আরব দেশগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারবে, না কেবল ইরানের ক্ষোভ বাড়াবে দেশগুলোর প্রতি?

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। ইরান দুর্বল হলে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের একক আধিপত্য কায়েমের পথ প্রশস্ত হবে। শুরুতে ইরান সৌদি আরবের প্রতি কিছুটা সংযম দেখালেও ২ মার্চ থেকে তারা সৌদি তেল ও গ্যাস অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন এক কঠিন দাবার চাল চালছেন। তিনি একদিকে ইরানের দুর্বলতার সুযোগ নিতে চান, অন্যদিকে ইরানের চরম অস্থিতিশীলতা যাতে সৌদির ‘ভিশন ২০৩০’ লক্ষ্যমাত্রা ধূলিসাৎ না করে দেয়, সেদিকেও সতর্ক নজর রাখছেন।

সর্বোপরি, জিসিসি দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হয়তো মিসাইল ঠেকাতে পেরেছে, কিন্তু ছোট ছোট ড্রোনগুলো দুবাই বা রিয়াদের যে ব্যবসায়িক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তা মেরামত করা সময়সাপেক্ষ। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বুঝে গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা ইরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালের সমঝোতা, কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যে টিকে থাকতে হলে এই দেশগুলোকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশল আমূল বদলে ফেলতে হবে।

আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত