Ajker Patrika

ইরাক যুদ্ধের শিক্ষা ভুলে গেছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরাক যুদ্ধের শিক্ষা ভুলে গেছেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ইরাকে সাদ্দাম হুসেইনের পতন ঘটাতে গিয়ে ভয়াবহ পরিণামের মুখে পড়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে; এমনকি এটি আঞ্চলিক অস্থিরতার আরও ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি করবে। যদি না এই সংঘাত কূটনৈতিকভাবে শেষ করার জন্য কোনো যৌক্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এমনটিই মনে করছেন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো লিণ্ডা রবিনসন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একযোগে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ওয়াশিংটনকে ইরাক যুদ্ধের শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন এই বিশ্লেষক। ইরাক যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিণ্ডা বলেন, যুদ্ধের একমাত্র ধ্রুব সত্য হলো এর অনিশ্চয়তা। আফগানিস্তান এবং ইরাক যুদ্ধের ময়দান থেকে রিপোর্ট করার সময় আমি এটি নিজের চোখে দেখেছি। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে যখন ইরাক গভর্নিং কাউন্সিলের উদ্বোধন হচ্ছিল, তখন আমার মনে হয়েছিল এই প্রবাসীদের দিয়ে গঠিত সরকার হয়তো ইরাকের মাটিতে শিকড় গাড়তে পারবে না। এক মাসের মধ্যেই সাদ্দাম হোসেনের অনুগত বাহিনী পূর্ণমাত্রায় বিদ্রোহ শুরু করে, যার করুণ পরিণতি ছিল বাগদাদে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বোমা হামলা। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ইরানের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ দেখে আমার সেই পুরনো স্মৃতিগুলোই বারবার ফিরে আসছে।

ইরাক যুদ্ধ ছিল ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এক ব্যর্থ পাঠ্যপুস্তক। ইরানের ক্ষেত্রেও আজ পাঁচ দিন পার হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সুনির্দিষ্ট ‘এন্ড গেম’ বা যুদ্ধ শেষের পরিকল্পনা নেই। ইতিমধ্যে মার্কিন ক্যাজুয়ালটি বা হতাহতের খবর আসতে শুরু করেছে। ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারে’ তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে; ইরানের ছোঁড়া হাজারের বেশি মিসাইল ও ড্রোনে ইতিমধ্যে দশটি দেশে কয়েক’শ মানুষ হতাহত হয়েছেন। এমনকি দুর্বল হয়ে পড়া হিজবুল্লাহও ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করেছে।

২০০৩ সালের ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-এর সাথে বর্তমান পরিস্থিতির একটি বড় পার্থক্য হলো মিত্রশক্তির অভাব। তখন ওয়াশিংটনের পেছনে ৪৯টি দেশ ছিল, কিন্তু এবার কানাডা, স্পেন এবং যুক্তরাজ্য সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি খোদ আমেরিকার ভেতরেও এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন খুব কম। সিএনএনের জরিপ বলছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দিহান। যদিও ট্রাম্প দাবি করছেন এই যুদ্ধ এক মাস স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ভয়— খুব শীঘ্রই গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসতে পারে।

পেন্টাগনের সামরিক ডকট্রিন অনুযায়ী, যেকোনো বড় যুদ্ধের (ফেজ ৩) পর একটি স্থিতিশীলতা রক্ষা অভিযান (ফেজ ৪) প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানিরা নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ সরকার ঠিক করবে। তাঁর ধারণা, কেবল আকাশপথের হামলাই ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রিভোলিউশনারি গার্ডস কর্পসকে (আইআরজিসি) পঙ্গু করে দেবে। তবে বাস্তবতা হলো, আইআরজিসি এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী এবং তারা যেকোনো অভ্যুত্থান দমনে আগের মতোই নৃশংস হয়ে উঠতে পারে। জানুয়ারি মাসে ইরানে যে গণবিক্ষোভ হয়েছিল, তা দমনেও তাঁরা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল।

ইরাক যুদ্ধের দশ বছরে আমেরিকা প্রায় ৪,৫০০ সৈন্য হারিয়েছিল এবং ‘ইরাক বডি কাউন্ট’-এর তথ্যমতে ২ লাখ ১১ হাজার ৪৬ জন ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিল। ইরানের সক্ষমতা আগের চেয়ে কমলেও তারা কয়েক দশক ধরে প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে। লেবানন, ইয়েমেন, গাজা এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের ব্যবহার করে তারা এক দীর্ঘমেয়াদী ‘ওয়ার অব দ্য ফ্লি’ বা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।

কেবল আকাশপথের হামলা চালিয়ে কোনো দেশ যে যুদ্ধে জয়ী হতে পারে না, তা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে। যদি ট্রাম্পের বোমা হামলায় ইরান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, তবে তার পরবর্তী ফলাফল হবে ভয়াবহ। ইরানের জাতিগত কাঠামোর ভাঙন, আইআরজিসির অবশিষ্টাংশের সাথে গৃহযুদ্ধ এবং এমন আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে যা সামলানোর ক্ষমতা এই অঞ্চলের কোনো শক্তির নেই। কলিন পাওয়েল ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘যদি তুমি এটি (ইরাক) ভেঙে ফেলো, তবে এর দায়ভার তোমাকেই নিতে হবে।’ ট্রাম্প হয়তো বোমা মারা শেষ হলে দায় এড়াতে চাইবেন, কিন্তু ইতিহাস তাকে মার্কিন স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ধ্বংসের জন্য দায়ী করবে।

এখনো সময় আছে একটি যৌক্তিক এবং কূটনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সংঘাতের ইতি টানার। অন্যথায়, একটি ‘মুক্ত ইরান’-এর বদলে আমরা হয়তো এক ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য দেখতে চলেছি।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত