
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বলা হয়েছে—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সামরিক হামলা হলে তা বাকি দুই দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে।
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাত দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ও ‘নিরাপত্তা ছাতা’ ছিল, তা শিথিল হওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট ও বড় ভূরাজনৈতিক সংকেত এটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সর্বাত্মক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এই তিন আঞ্চলিক পরাশক্তি নিজেদের সুরক্ষায় জোটবদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছে।
কেন তৈরি হলো এই জোট?
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল ওয়াশিংটন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই বিশ্বস্ততায় চির ধরিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ ক্রিয়াশীল:
১. একতরফা মার্কিন পদক্ষেপ ও আঞ্চলিক মিত্রদের অবহেলা।
২. রসদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষায় বৈষম্য।
৩. কৌশলগত বিকল্পের অনুসন্ধান।
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার সময় রিয়াদ বা অন্য কোনো আঞ্চলিক মিত্রের সঙ্গে পর্যাপ্ত কৌশলগত সমন্বয় করেনি। ফলস্বরূপ, ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও পানি শোধন কেন্দ্রগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।
যুদ্ধের সংকটকালে ওয়াশিংটন তার প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ ইসরায়েলের সুরক্ষায় সরিয়ে নেয়। ফলে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় মার্কিন সহায়তার ঘাটতি স্পষ্ট অনুভব করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈদেশিক নীতির ঘনঘন পরিবর্তনের কারণে আঞ্চলিক দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য একক কোনো পরাশক্তির ওপর নির্ভর করতে রাজি নয়।
তিন দেশের ত্রিভুজীয় শক্তি: কার অবদান কী?
এই চুক্তিটি নিছক একটি কাগজের সমঝোতা নয়; বরং এটি তিন মিত্র দেশের অত্যন্ত কার্যকর ও পরিপূরক সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তির সংমিশ্রণ:
মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান, বিপুল জনবলবিশিষ্ট অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি রয়েছে তাদের। ফলে যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক প্রতিরোধ ও মানবসম্পদের নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম।
তুরস্ক এই জোটে তার প্রযুক্তি ও সামরিক শিল্প কারখানা দিয়ে অবদান রাখতে পারে। ন্যাটো মানের সামরিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং বৈশ্বিক ড্রোন বাজারের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদনকারী তুরস্ক। তারা আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ও উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহকারী ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করতে পারবে।
অপর দিকে সৌদি আরবের আছে আর্থিক মূলধন ও ভূ-কৌশলগত অবস্থান। বিশাল অর্থনৈতিক মূলধন, প্রতিরক্ষা ক্রয়ে বিনিয়োগের সামর্থ্য, জ্বালানি বাজারে একক প্রভাব এবং ইসলামিক বিশ্বের ধর্মীয় কেন্দ্রস্থল হিসেবে ভূ-কৌশলগত মর্যাদা রয়েছে সৌদির। তারা জোটের আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যে উদীয়মান ত্রি-মেরু নিরাপত্তাব্যবস্থা
এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তায় একটি স্পষ্ট ত্রি-মেরু কাঠামো আত্মপ্রকাশ করেছে। এর মধ্যে প্রথম অক্ষ হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষ। সামরিক আধিপত্য বজায় রাখা এবং সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে প্রতিপক্ষকে দমনের নীতি তাদের।
দ্বিতীয়টি ইরানি প্রতিরোধ অক্ষ। তেহরানকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় ও বিভিন্ন সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীর (ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও লেবাননে সক্রিয়) সমন্বয়ে গঠিত নেটওয়ার্ক।
আর তৃতীয় অক্ষে রইল স্বায়ত্তশাসিত সুন্নি মধ্যম-শক্তির জোট (মক্কা চুক্তি)। রিয়াদ-আঙ্কারা-ইসলামাবাদকেন্দ্রিক বাস্তববাদী জোট, যা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে এবং নতুন কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধে না জড়িয়ে নিজেদের কৌশলগত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়।
বাস্তবায়নে জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ
কাগজে-কলমে এই জোট অত্যন্ত শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে এটি কার্যকর করতে গিয়ে বেশ কিছু বাধা ও জটিলতার সম্মুখীন হতে হবে:
ক. পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারার কৌশলগত অস্পষ্টতা: চুক্তিতে ‘একজনের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ’ বলা হলেও এখানে কিছু আইনি ও কৌশলগত ফাঁক রাখা হয়েছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলা কিংবা সীমান্ত সংঘাতের মতো সীমিত যুদ্ধে তুরস্ক বা পাকিস্তান কতটা সরাসরি সেনা পাঠাবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
খ. সদস্য দেশগুলোর বৈচিত্র্যময় নিজস্ব সংকট: পাকিস্তানকে ক্রমাগত অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা এবং ভারত ও আফগানিস্তান সীমান্তে টানাপোড়েন সামাল দিতে হচ্ছে। তুরস্ক ন্যাটোর সক্রিয় সদস্য হওয়ায় ভূমধ্যসাগর, ককেশাস ও ইউরোপীয় রাজনীতির জটিলতা থেকে আঙ্কারা মুক্ত নয়। আর সৌদি আরব নিজস্ব ‘ভিশন ২০৩০’ অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য তারা তেহরান বা অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে সর্বাত্মক সংঘাত এড়িয়ে শান্ত পরিবেশ চায়।
গ. জোটের দ্রুত প্রসারে বাধা: মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা সিরিয়ার মতো দেশগুলোকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা থাকলেও, দেশগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক পছন্দ ও বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে জোটটির দ্রুত সম্প্রসারণ কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ইউএইয়ের ‘আব্রাহাম অ্যাকোর্ড’ এবং রিয়াদের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা একটি বড় বিবেচ্য বিষয়।
ভবিষ্যৎ প্রভাব
রিয়াদ ও অন্য আঞ্চলিক দেশগুলো এখন মার্কিন ও পশ্চিমা অস্ত্র ক্রয়ের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে তুর্কি প্রযুক্তি এবং যৌথ পাকিস্তান-তুরস্ক সামরিক উৎপাদন খাতের দিকে ঝুঁকবে।
এই চুক্তি মূল লক্ষ্য কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু করা নয়, বরং তেহরান ও তেল আবিব উভয় পক্ষকেই এই বার্তা দেওয়া যে—একতরফা পদক্ষেপের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করলে সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষির নতুন অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে এই জোট। মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে না, তবে এটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যেকোনো আলোচনায় সুন্নি মিত্র দেশগুলোকে তুলনামূলক শক্তিশালী দর-কষাকষির অবস্থান এনে দিতে পারে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি বাস্তবে কতটা টেকসই ও কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের যেকোনো আঞ্চলিক সংকটকালীন মুহূর্তে এই তিন দেশ একে অপরের পাশে কতটুকু দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে তার ওপর। তবে এটি নিশ্চিত যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে ওয়াশিংটনের একক আধিপত্যের দিন শেষের পথে।

ইরানে চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য শত শত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চরম উত্তেজনাকর মুখোমুখি অবস্থানকে এক নির্ণায়ক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মাসব্যাপী অবিরাম আকাশ হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো যখন লণ্ডভণ্ড, ঠিক তখনই বেইজিং আসরে নেমেছে। তবে ক
৩ দিন আগে
সম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ভারতের এক মন্ত্রীর বিরল পদত্যাগ আদায় করে নিয়েছে ভারতের জেন-জি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে এই সাফল্যের পরও দলটি আপাতত নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশের কোনো পরিকল্পনা করছে না।
৩ দিন আগে
বহু বছর ধরেই বিশ্ব আশঙ্কা করে আসছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু পাঁচ মাসের যুদ্ধ দেশটির শাসকদের একটি বিষয় বুঝিয়ে দিয়েছে—তাদের হাতে এরই মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। সেটি হলো ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক শক্তি।
৪ দিন আগে
ইরান বাজি ধরেছে যে, চলমান যুদ্ধে তারা ওয়াশিংটনের চেয়ে বেশি দিন টিকতে পারবে। আর এর জন্য তারা মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক পথ, নৌযোগাযোগ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে প্রতিপক্ষের জন্য সংঘাতের খরচ ক্রমেই বাড়তে থাকে। এমনটাই জানিয়েছেন উপসাগরীয় কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা।
৪ দিন আগে