Ajker Patrika

ফ্রান্সে কি কট্টরবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে

ফজলুল কবির
আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২২, ১০: ৪১
ফ্রান্সে কি কট্টরবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে

ফরাসি লেখক শার্লে মোরাস নিজের রাজনৈতিক ধারণাগুচ্ছ নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেন ১৯৩৭ সালে। সে বইয়ে জাতীয়তাবাদকে তিনি সব ধরনের শত্রুর বিরুদ্ধে ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষ্য ছিল, জাতীয়তাবাদ শুধু বাইরের শত্রু নয়, ভেতরে থাকা শত্রুকে প্রতিহতেও রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। তিনি এই ধারণা প্রচার করেছিলেন ইহুদিবিরোধী অবস্থান থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ধারণার ধার কিছুটা কমে আসে। কিন্তু হালে এই ফ্রান্সেই আবার একই ধারণা বেশ প্রচার পাচ্ছে।

আজকের ফ্রান্সে নতুন করে কট্টর জাতীয়তাবাদী ধারণা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর একটি প্রমাণ পাওয়া যায়, হঠাৎ করেই দেশটিতে প্রতিক্রিয়াশীল লেখকদের বইয়ের প্রকাশ ও পুনঃপ্রকাশ বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এ তালিকায় আছে শার্লে মোরাসের সেই বইও। ২০১৮ সালে প্যারিসের অন্যতম প্রভাবশালী প্রকাশক রবার্ট লাফোঁ বইটি পুনঃপ্রকাশ করেন। আর এ বছর ফ্রান্সের ডানপন্থী আরেক প্রকাশনা সংস্থা পুনঃপ্রকাশ করেছে ২০১১ সালে প্রকাশিত বই ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’। বইটির লেখক রনো কামু একজন কট্টর ডানপন্থী লেখক হিসেবে পরিচিত, যিনি বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বর্ণবাদের অভিযোগ নিয়ে লড়ছেন।

রনো কামু আসলে কী বলছেন? তাঁর ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ বইয়ের মূল ভাষ্যই-বা কী? তেমন কিছু না। যেমনটা কিছু মার্কিন বলে থাকেন, ঠিক তেমনি কামু বলছেন—ফ্রান্সের জনমিতি অন্যদের দ্বারা বদলে যাচ্ছে। এই অন্যরা কারা? উত্তরটি বেশ মজার। ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা লোকেরাই নাকি ফরাসিদের হটিয়ে ফ্রান্সের জনমিতি বদলে দিচ্ছে।

এই ধারণা কিন্তু ফ্রান্সে নতুন নয়। এর আগেও এ ধরনের ধারণা ছড়িয়েছিল দেশটিতে। বিশেষত কট্টর ক্যাথলিক ও ডানপন্থীদের মধ্যে এই ধারণা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু তা সময়ের সঙ্গে স্তিমিত হয়ে যায়। দেশটির মূলধারার রাজনীতিতে এটি প্রায় উহ্য ছিল। কিন্তু এখন আবার ফিরে এসেছে। শুধু ফিরেই আসেনি, বেশ পোক্ত হয়ে এসেছে, যাকে ঠিক সেভাবে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে না। এমনকি নরম গলায় এর সমালোচনাও করা হচ্ছে না।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে ক্রমেই ভ্যালেরাস অ্যাকচুয়েলস ম্যাগাজিন ও সি-নিউজের প্রভাব বাড়ছে। এর মধ্যে সি-নিউজের সঙ্গে আবার সম্পর্ক রয়েছে মার্কিন ফক্স নিউজের। অনেক দিন ব্রাত্য থাকার পর ফরাসি টিভি শোগুলোর অতিথির চেয়ার আবার অলংকৃত করতে শুরু করেছেন রনো কামু। ‘বহিরাগতদের’ দ্বারা ফরাসি জনমিতি বদলে যাওয়ার ভয় বেশ ভালোই দেখাচ্ছেন তিনি। সঙ্গে জোড় বেঁধেছেন এরিক জেমু, যিনি আবার আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন।

ফরাসি লেখক শার্লে মোরাসের লেখা এই সময়ে আবার জনপ্রিয় হচ্ছেফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এরিক জেমু লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির পথ ধরে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে চাইছেন। এরই মধ্যে সেই অবস্থান যে অনেকটা শক্ত হয়েছে, তার প্রমাণ মিলেছে তাঁর ‘ফ্রান্স হ্যাজ নট হ্যাড ইটস ফাইনাল ওয়ার্ড’ বইটির বেস্টসেলার হওয়ার মধ্য দিয়ে। বইটির মূল বক্তব্য কী? মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ‘এই বই চেনা ফ্রান্সের মৃত্যুবিষয়ক বিলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।’ 

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এরিক জেমু মারি লো পেনের দল ন্যাশনাল র‍্যালিতেই ছিলেন আগে। গত নভেম্বরে তিনি নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। এটিকে ঠিক কট্টর ডানের ভাঙন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এরিক জেমুর সঙ্গী হয়েছেন অনেকেই। এর সঙ্গে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জনপ্রিয়তার পালে লাগা জোর হাওয়ার কথাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। 

মূলত অভিবাসনবিরোধী অবস্থানই ক্রমে শক্তি পেয়ে আজকের এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে, যেখানে গত শতকেই বাতিল কিছু ধারণা আবার হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ফিরে আসছে। এক ধরনের বর্ণবাদী ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। এদিকে সবচেয়ে কম বয়সে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়া ইমানুয়েল মাখোঁর ব্যর্থতা তো আছেই। যত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার তেমন কিছুই পূরণ করতে পারেননি তিনি। কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সূচকেই পিছিয়ে গেছে ফ্রান্স। এ অবস্থায় জনপ্রিয় মতের সঙ্গে থাকতে গিয়ে মাখোঁও কট্টর জাতীয়তাবাদী ধারণায় হাওয়া দিয়েছেন। মাঝখানে বাম ধারা দুর্বল হয়েছে, মধ্যপন্থীদের ভাঙন এতটাই বেড়েছে যে, তারা নিজেদের শক্তি খুঁজতে এখন পরের দিকে তাকিয়ে থাকছে। 

সবচেয়ে কম বয়সে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়া ইমানুয়েল মাখোঁর ব্যর্থতার সুযোগে শক্তিশালী হচ্ছে কট্টর জাতীয়তাবাদী শক্তিএমন অবস্থাতেই এরিক জেমু তুলছেন ‘ফ্রান্স গেল গেল’ রবের। নিজের বইয়ে তো বেটই, নির্বাচনী প্রচার বা টিভি শোতে উপস্থিত হয়ে তিনি নানাভাবে দেখাচ্ছেন, চেনা ফ্রান্স কী করে হাত ফসকে চলে যাচ্ছে অন্যের হাতে। এই ‘অন্য’ বা ‘আদার’ ধারণাটি নতুন নয়। বরাবরই কট্টর জাতীয়তাবাদ এমন ভিতের ওপরই দাঁড়ায়। ফ্রান্সেও তাই হচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই তিনি বলছেন, ‘ফ্রান্স’ ধারণাটিকে তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবেন। যে ‘বহিরাগত’ বা ‘ভেতরের শত্রুর’ কারণে ফ্রান্সের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ফরাসিদের আচার-আচরণ, তাদের রাষ্ট্র ও সভ্যতা রসাতলে যেতে বসেছে, তাদের কাছ থেকে তিনি ফ্রান্সকে ফিরিয়ে এনে আবার তুলে দেবেন ‘সত্যিকারের’ ফরাসিদের হাতে। 

বর্তমান এই পরিস্থিতি অনেকটা পুরোনো বর্ণবাদী মতের কথাই মনে করিয়ে দেয়। শিল্প-সাহিত্যের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত প্যারিসেই ১৮৯৯ সালে শুরু হয়েছিল ‘আসল ফ্রান্স’ আন্দোলনের, যার তাত্ত্বিক ভিতটি গড়ে দেন শার্লে মোরাস। আজকের ফ্রান্সে এই মোরাস আবার ফিরে এসেছেন। শুধু তাঁর বই নিয়ে নয়, প্রভাবশালী অনুসারীদের ঘাড়ে চড়ে। ‘আসল ফ্রান্স’ যেমন কোনো তাত্ত্বিক আন্দোলন ছিল না শুধু, তেমনি ‘ফ্রান্স গেল’ রবটিও অহেতুক নয়। দুটিই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই হাজির হয়েছে। 

গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা ঘোষণা করা এরিক জেমুর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছেশুধু ফ্রান্স কেন, গোটা ইউরোপেই এই ধারা বেগবান হচ্ছে অনেক দিন হলো। জার্মানির নেতৃত্ব থেকে অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের সরে যাওয়ার ঘোষণার পর সেখানকার নেতৃত্ব নিয়ে এমন আলোচনা বেশ সামনে এসেছিল, যা এখনো বর্তমান। ভবিষ্যৎ জার্মানি কেমন হবে, তা এখনই বলার সময় আসেনি। কিন্তু যুক্তরাজ্য তো রয়েছে চোখের সামনেই। বরিস জনসনের সরকারের সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মিলের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা তো হয়েছে বিস্তর। ট্রাম্প প্রশাসনের কথা যখন এলই, তখন আরেকটু বলা যাক। 

গোটা ইউরোপে কট্টর জাতীয়তাবাদী ধারণা ক্রমে বেড়ে উঠতে থাকলেও সোজাসাপটা এমন অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা এসেছিল আটলান্টিকের ওপার থেকেই। মার্কিন মুলুকে যখন এমন রব ওঠালেন ট্রাম্প, আর তাঁর পেছনে দলে দলে এসে লোক জড়ো হলো, তখন ইউরোপও আর ঘোমটার আড়ালে থাকতে চায়নি। শুধু ইউরোপ কেন, এমন নেতার আবির্ভাব এর পর নিয়মিত বিরতিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গেছে, এখনো যাচ্ছে। 

এই কট্টর জাতীয়তাবাদী ধারণার মূল ভিতটি বরাবরই তৈরি করা হয় ‘পরিচয় সংকটের’ প্রশ্নটিকে সামনে হাজির করে। ফ্রান্সে আজ যা তোলা হচ্ছে ‘আসল ফ্রান্স’ হারিয়ে যাচ্ছে বলে, যুক্তরাষ্ট্রে তা-ই উঠেছিল ‘ট্রু আমেরিকান’ প্রশ্নে। এমনকি আজকের এই ইউক্রেন সংকটের সময়ে অভিবাসী স্রোত নিয়ে ইউরোপের যে বর্ণবাদী আচরণ প্রকাশ পেল, তার পেছনেও আছে এই একই প্রশ্ন। পরিচয়; এই এক শব্দ ঘিরেই বারবার কট্টরবাদ মাথা চাড়া দিয়েছে, দিচ্ছে। এটি শুধু যে কোনো একটি মানচিত্র সামনে রেখে তোলা হয়, তা নয়। এই প্রশ্ন ধর্ম, ভাষা, গায়ের রং ইত্যাদি নানা ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে তোলা হয় এবং হচ্ছে। 

মারি লো পেনের কথা এবার কিছু কম শোনা গেলেও মঞ্চে হাজির আছেন দৃঢ়তার সঙ্গেইএমন প্রশ্ন উত্থাপনের মূল লক্ষ্য থাকে জনগণকে ঝাঁকুনি দেওয়া এই বলে যে, দেখ তোমার পরিচয় কী? তোমার কাছ থেকে কী লুট হয়ে গেল? কারা এই লুটতরাজ করছে? আর অবধারিতভাবেই এমন প্রশ্ন ওঠার পর জনতা তারই একটি অংশকে প্রতিপক্ষ হিসেবে সাব্যস্ত করে। এটা এমন এক চাল, যা যুগে যুগে সফল হয়ে এসেছে শুধু জনতার হুজুগে স্বভাবের সুযোগে। এই চাল চেলে যাবতীয় প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক ব্যর্থতার কারণ হিসেবে সেই প্রতিপক্ষকে দেখিয়ে দেওয়া হয়। জনতার বড় অংশই তখন প্রতিপক্ষের ঘরে নিজেকে দেখতে চায় না বলে আচার-আচরণে, ভাষায় ও প্রতিক্রিয়ায় ‘আসল’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। আর এই চেষ্টার অবধারিত ফল হিসেবে সামনে হাজির হয় কট্টরবাদ। 

ফ্রান্সে এখন এই প্রতিটি উপসর্গ বেশ প্রকট। দেশটিতে শেষ পর্যন্ত কট্টরবাদ জয়ী হবে কি-না, সে কথা বলবার সময় যদিও আসেনি। তবে এর শক্ত অবস্থান কিন্তু অন্যদের জন্যও দুঃসংবাদ। কারণ, বিশ্ব রাজনীতিতে কোনো ধারার এমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠা অন্য দেশগুলোতেও প্রভাব বিস্তার করে। কট্টরবাদী রাজনীতির ধারাই হলো—তারা বিরোধী শিবিরের হলেও পরস্পরকে পুষ্টি জোগায়।

বিশ্লেষণ সম্পর্কিত পড়ুন:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি: ইরানি রাষ্ট্রদূত

প্রাথমিকেও চালু হচ্ছে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস

২০২৬ সালের ঈদুল আজহা কবে, যা জানা গেল

কিশোরগঞ্জে যুবদল নেতার হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

‘ওকে লাথি মেরে বের করে দিন’—নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুদ্ধে পাঠাতে বললেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত