Ajker Patrika

এক বয়ামে দুই বিচ্ছু, নিজেদের রাজনৈতিক ফাঁদে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
এক বয়ামে দুই বিচ্ছু, নিজেদের রাজনৈতিক ফাঁদে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু
ছবি: আনাদোলুর সৌজন্যে

আজ হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এটি তাঁদের সপ্তম সাক্ষাৎ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি পুরোনো দুই মিত্রের পুনর্মিলন। কিন্তু বাস্তবে এটি যেন চাপে পড়া দুই নেতার ‘যুদ্ধ পরিষদ’, যেখানে আলোচনার কেন্দ্রে শুধু ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলা নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার প্রশ্নও রয়েছে।

বৈঠকে পারস্য উপসাগরে সামরিক তৎপরতার সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরবেন জ্যেষ্ঠ সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। যুদ্ধবিরোধী হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প সম্ভবত আগের মতোই সরাসরি ও কড়া কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেবেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে সহায়তার জন্য ‘সংবেদনশীল’ সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করবেন। তাঁর লক্ষ্য—দ্বিতীয় দফায় হামলা দুই দেশের স্বার্থের জন্যই জরুরি—এটি ট্রাম্পকে বোঝানো।

এর আগে ২০২৫ সালের জুনে পরিচালিত ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর আগে ঠিক একইভাবে বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু। ফলে এবারের এই বৈঠকের ওপর বড় ছায়া ফেলেছে আগের বৈঠকটি। তবে সেই অভিযানে ইরানের ওপর প্রত্যাশিত আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।

ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করেছে। কিন্তু ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (ডিআইএ) সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমানের হামলা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম কেবল কয়েক মাস পিছিয়ে দিয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি।

এবার ঝুঁকি আরও বেশি। নেতানিয়াহুর জন্য এটি কার্যত ‘জীবন-মৃত্যুর’ প্রশ্ন। ট্রাম্পও জানতে চাইবেন—এবার কি সত্যিই কৌশলগত সাফল্য মিলবে?

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোনাথন কনরিকাস মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা থাকলেও ‘কৌশলগত সুযোগ’ খুবই কম। ইরান এখন আর শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণ নয়; বরং আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত (আহত কিন্তু বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ)।

দুই নেতার রাজনৈতিক বাস্তবতাও কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ওপর গণভোটের মতো। রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে ট্রাম্পের অভিশংসনের আশঙ্কা বাড়তে পারে। ২০২৮ সালের পর ট্রাম্পের আর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই, ফলে তাঁর জন্য সময় সীমিত।

নেতানিয়াহুর পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন। দুর্নীতির তিনটি মামলার মুখোমুখি তিনি। আগামী নভেম্বরে নির্বাচন; জনমত জরিপে পরাজয়ের আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের সামরিক সাফল্য না পেলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষায়, তাঁরা যেন ভাঙা পাহাড়ি সেতুর ওপর দিয়ে ছুটে চলা দুই আরোহী। সামনে গভীর খাদ। লাফিয়ে পার হতে না পারলে ইতিহাসের অতলে পতন অনিবার্য।

ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা সম্প্রতি ‘খোররামশাহর-৪’ নামের তাদের সবচেয়ে উন্নত ব্যালিস্টিক মিসাইল মোতায়েন করেছে। তেহরানের দাবি, তাদের এই ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের ‘অ্যারো-৩’ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম। চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নৌযুদ্ধে জেতার প্রয়োজন নেই; একটি ট্যাংকার ডুবলেই বৈশ্বিক অর্থনীতি অচল হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকেরা বলেন, ট্রাম্প রাজনীতি দেখেন সংবাদ পাঠের গতিতে; আর ইরানের নেতারা ভাবেন দশকের পর দশক ধরে। তেহরান ইতিমধ্যে জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ভেঙে ফেলার মতো কঠোর শর্ত তারা মানবে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যু আলোচনার টেবিলে নেই।

এমন পরিস্থিতিতে অনেকে বলছেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসপরবর্তী সময়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ‘একই সুরে’ চলার সময় শেষ হয়ে গেছে। যুদ্ধের প্রভাব যখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে পড়বে, তখন পারস্পরিক দোষারোপ শুরু হতে পারে। ট্রাম্প প্রয়োজনে মিত্রকে বলি দিতেও দ্বিধা করবেন না—এমন মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে কূটনৈতিক মহলে।

তবে ইরানে পূর্ণমাত্রায় আঘাত হানতে ব্যর্থ হওয়া হয়তো ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর পতনের কারণ হবে না। নিজেদের ভাগ্য এক সুতায় বেঁধে ফেলাই শেষ পর্যন্ত তাঁদের সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। পরিস্থিতি যদি আঞ্চলিক অগ্নিসংযোগে রূপ নেয়, তবে বিশ্ব দেখবে—একসময়ের ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র যেন এক জারে আটকে পড়া দুই বিচ্ছু; পানি ফুটতে শুরু করলে একে অপরকেই দংশন করছে।

মূল লেখা: জসিম আল-আজাভি

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

শেরপুরে ট্রাক-অটোরিকশা সংঘর্ষে নির্বাচন কর্মকর্তাসহ ২ জন নিহত, আহত ৫

তিন বাহিনীর ১৪১ কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি

‘ঠাকুরগাঁও জামায়াত আমিরকে টাকা বহনে অনাপত্তি দিয়েছিল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ’

জেএসসির সঙ্গে বৃত্তিও বাতিল, নবমে বিভাগ বিভাজন নয়

চন্দনাইশে গভীর রাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ১০ লাখ টাকাসহ মাইক্রোবাস জব্দ, আটক ৩

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত