
২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ‘ব্রেক্সিট’ গণভোটের ১০ বছর পর ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় যে ব্রেক্সিটকে সার্বভৌমত্ব ও সমৃদ্ধির চূড়ান্ত চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছিল, ২০২৬ সালের বাস্তবতায় তা এখন এক বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সাবেক লেবার এমপি রিচার্ড করবেটের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রিটেন এখন আর আগের মতো ব্রেক্সিটের সুফল নিয়ে বড়াই করতে পারছে না; বরং জনমত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেশটিকে পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দিকে ঠেলছে। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে মূলত চারটি প্রধান প্রভাবক কাজ করছে।
প্রথমত, অর্থনীতির করুণ দশা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। ব্রেক্সিটের দুই বছর পর যেখানে বলা হয়েছিল ব্রিটিশ অর্থনীতি ৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সেই ক্ষতির পরিমাণ এখন প্রায় ৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। বার্ষিক ৮০ থেকে ৯০ বিলিয়ন পাউন্ডের এই রাজস্ব ঘাটতি ব্রিটেনের সরকারি ব্যয় ও জনসেবা খাতের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। এই অর্থনৈতিক ক্ষয় রোধে কিয়ার স্টারমারের সরকার কৃষি ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে পুনরায় ইইউর মানদণ্ডের সঙ্গে মেলাতে শুরু করেছে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, ইইউতে না থেকে কেবল তাদের নিয়ম মেনে চলা ব্রিটেনকে একটি ‘অ-ভোটার’ সদস্যরাষ্ট্রে পরিণত করবে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি নিয়ম মানতে হয়, তবে নীতিনির্ধারণী টেবিলে নিজেদের আসনটি কেন ফিরে পাওয়া হবে না?
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পটপরিবর্তন ব্রিটেনের একাকিত্বকে প্রকট করে তুলেছে। একদিকে পুতিনের আগ্রাসন আর অন্যদিকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি—এই দুই জাঁতাকলে পড়ে ব্রিটেনের তথাকথিত ‘স্পেশাল রিলেশনশিপ’ বা বিশেষ সম্পর্কের ধারণাটি এখন মৃতপ্রায়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র আইসল্যান্ড যেখানে ইইউতে যোগদানের জন্য গণভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং নরওয়েতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেখানে ব্রিটেন নিজেকে বিশ্বমঞ্চে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন ও মলদোভার মতো দেশগুলো যখন ইইউর সদস্যপদ পাওয়ার দৌড়ে রয়েছে, তখন ব্রিটেনের বাইরে থাকাটা তাকে কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, জনমতের অভূতপূর্ব পরিবর্তন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ইউগভ’ পরিচালিত এক জরিপ বলছে, প্রায় ৬৪ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক পুনরায় ইইউতে যোগদানের পক্ষে। উল্লেখ্য, জনমতের এই পরিবর্তন ধীরগতির হলেও অত্যন্ত অবিচল। এর পেছনে আংশিকভাবে কাজ করছে জনতাত্ত্বিক বা বয়সগত কারণ, ২০১৬ সালে মানুষের ভোট দেওয়ার যে বয়স ছিল, তার ১০ বছর পর এসে যদি কেউ তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না-ও করেন, তবু বর্তমানে ইইউ সদস্যপদের পক্ষে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হতো। কিন্তু এই পরিবর্তনের পেছনে সেসব ভোটারের বড় ভূমিকা রয়েছে, যাঁরা ব্রেক্সিট নিয়ে খুব একটা কট্টরপন্থী ছিলেন না, বরং এখন বুঝতে পারছেন যে ব্রেক্সিটকে যেভাবে প্রচার করা হয়েছিল, তার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার কোনো মিল নেই। তাঁদের বলা হয়েছিল, এটি খুব সহজ হবে, অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে (যার পুরোটা স্বাস্থ্য খাতে যাবে) এবং ইউরোপের বাজারে আমাদের প্রবেশাধিকার অটুট রেখেই সারা বিশ্বের সঙ্গে চমৎকার সব নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক ব্রেক্সিট ভোটার তাঁদের মত পরিবর্তন করেছেন; বিশেষ করে ব্রেক্সিটের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া খাতগুলোর শ্রমিক ও ব্রেক্সিটের কারণে সৃষ্ট ছোটখাটো নানা সমস্যায় বিরক্ত মানুষজন, যেমন বিদেশ থেকে ছোট কোনো পার্সেল আনা বা ভ্রমণে গিয়ে বর্ডারে অইউরোপীয়দের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা।
জনমতের এই পরিবর্তনের দুই মূল চালিকাশক্তি জনতাত্ত্বিক বিবর্তন এবং মানুষের চিন্তার পরিবর্তন। এর কোনোটিই আর উল্টো দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই ৬২ শতাংশ (ইইউতে ফেরার পক্ষে জনমত) ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ৬৬, ৬৮ বা ৭০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছাবে...আর এটি লেবার পার্টির জন্য তাদের সতর্ক অবস্থান কাটিয়ে ওঠা আরও সহজ করে দেবে।
ইতিমধ্যে গ্রিন পার্টি এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা (পাশাপাশি স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের জাতীয়তাবাদীরা) এই পরিবর্তনের বিষয়ে সজাগ হয়ে উঠেছেন এবং তাঁরা এই ইস্যুতে লেবার পার্টিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। রিফর্ম পার্টির চেয়ে এই দলগুলোর কাছেই লেবার পার্টি অনেক বেশি ভোটার হারিয়েছে এবং বর্তমানে তারা এই বিপদ সম্পর্কে ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছে।
সবশেষে ইউরোপের পক্ষ থেকেও এখন ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। একসময় ভাবা হয়েছিল ইইউ হয়তো ব্রিটেনকে আর বিশ্বাস করবে না, কিন্তু পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও স্পেনের মতো দেশের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে ব্রিটেনকে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক গত জানুয়ারিতে কিয়ার স্টারমারকে বলেছিলেন, তিনি একটি ‘বি-রিটার্ন’ বা ব্রিটেনের প্রত্যাবর্তনের ‘স্বপ্ন দেখছেন’। ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব গত মাসে চ্যাথাম হাউসে প্রদত্ত বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ব্রেক্সিট ছিল একটি বিশাল ভুল এবং যুক্তরাজ্যের উচিত পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করা।’ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিকস’ পডকাস্টে বলেছেন, ‘অবশ্যই যুক্তরাজ্যকে পুনরায় ইইউতে ফিরে পেতে চাই। আমি মনে করি সমাজ ভুল করতে পারে, কিন্তু তারা সেই ভুলগুলো সংশোধনও করতে পারে।’
এটি কেবল সহমর্মিতা নয়, বরং ইইউর নিজস্ব স্বার্থেই জরুরি। ব্রিটেনের মতো একটি শক্তিশালী সদস্যের প্রত্যাবর্তন ইইউর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের মতো প্রভাবশালী নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, এখন ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থেই ইইউতে ফেরা প্রয়োজন। ১০ বছর আগে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল, গণতান্ত্রিকভাবে জনমত আজ তার বিপরীতে হাঁটছে। ডেভিড ডেভিসের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখন ব্রিটেনের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক—‘গণতন্ত্র যদি মন পরিবর্তন করতে না পারে, তবে সেটি আর গণতন্ত্র থাকে না।’ ব্রিটেনের জন্য সেই মন পরিবর্তনের সময় হয়তো চলে এসেছে।
মডার্ন ডিপ্লোমেসি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আবদুল বাছেদ

নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি সম্পদ, চাকরির প্রলোভন এবং শেষ মুহূর্তে প্রকল্প ঘোষণার মতো কৌশল ব্যবহার করেও শহুরে ভোটারদের মন জয় করতে পারেনি সরকার। ভোটাররা আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক ইস্যুগুলোকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
৪ ঘণ্টা আগে
১১ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে স্বাগত জানান এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত করেন। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর প্রথমবার সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই আলোচনা হয়।
১২ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হচ্ছে এক মহাজাগতিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধ এবং চীনের জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে রাশিয়ার প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন এবং বিপজ্জনক মেরুকরণের...
১৫ ঘণ্টা আগে
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সংলাপকে একটি ‘প্রক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন—যা সময়সাপেক্ষ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, লেবানন সরকার কি আদৌ হিজবুল্লাহর ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?
১৬ ঘণ্টা আগে