গত গ্রীষ্মে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে সিরিয়ার ফার্স্ট লেডির একটি ছবি। সে সময় সিরীয় সামরিক বাহিনী ব্যস্ত দেশটির উত্তর-পশ্চিমে বিদ্রোহী দমনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবিতে দেখা যায়, সেনা সুরক্ষা বলয়ে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন আসমা আসাদ ও তাঁর স্বামী বাশার আল-আসাদ।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল-আসাদের স্ত্রী আসমা আসাদের প্রশান্তির পেছনের গল্পটা বিভ্রান্তিকর। দমনমূলক শাসন ব্যবস্থা চালুর মধ্য দিয়ে ঘটে যাওয়া আরব বসন্তের ১০ বছর পর এসেও ক্ষমতা ধরে রেখেছে সিরিয়ার শাসক গোষ্ঠী। এ জন্য সিরীয়দের দিতে হয়েছে ভয়াবহ মূল্য।
গণতন্ত্র, মুক্তি ও সমৃদ্ধির আশায় ২০১০ সালের ডিসেম্বরের শেষ ভাগে তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তের সূচনা হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে লিবিয়া, মিসর, ইয়েমেনসহ আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বাশার আল-আসাদের বাথ পার্টি নিজেদের শাসন পাকা করে ফেলায় সিরিয়ায় আরব বসন্তের প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেছিলেন দেশটির নেতারা। কিন্তু ২০১১ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে সিরিয়ায়ও ছোট পরিসরে বিক্ষোভ দেখা দেয়। পরে ২০১১ সালের ১৫ মার্চ গিয়ে তা বড় আকার ধারণ করে। এই দিনকেই সিরিয়ায় গণ-আন্দোলনের শুরুর দিন হিসেবে গণ্য করা হয়।
এর পর থেকে দেশটির সরকারি বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে হাজার হাজার সিরীয়। নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ১৪ হাজারের বেশি মানুষকে। সেখানকার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিজ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট। সিরিয়ার মাটিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য যুদ্ধ করে আসছে ইরান, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। রাশিয়া ও ইরান বাশার আল-আসাদ সরকারের পক্ষে থাকলেও বিপক্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের বিভিন্ন মিত্র দেশ। আরব বিশ্বজুড়ে এক দশক আগের সব আশা ও স্বপ্ন চূর্ণ হয়ে গেলেও সিরিয়ার চেয়ে বেশি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আর কোথাও ঘটেনি।
কিন্তু এই সবকিছুর মধ্যেও আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন বাশারের স্ত্রী আসমা আসাদ। বিধ্বস্ত ভূখণ্ডের ওপর তাঁর আধিপত্যের যাত্রা হার মানায় রূপকথার গল্পকেও।
লন্ডন থেকে সিরিয়ার প্রাসাদে
লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে ১৯৯৬ সালে স্নাতক শেষ করার পর জেপি মরগ্যান ব্যাংকে কাজ শুরু করেন আসমা। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় বাশার আল-আসাদের। ২০০০ সালে দুজনের বিয়ে হয়। সেই বছরই ক্ষমতায় আসেন বাশার আল-আসাদ। রাতারাতি সিরিয়ার ফার্স্ট লেডি বনে যান আসমা।
আসাদের প্রাসাদে আসমার প্রবেশ এখন আর সিরিয়া পর্যবেক্ষকদের জন্য গালগল্পের বিষয় নয়। গত বছর আসমাকে সিরিয়ার ‘সবচেয়ে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে বর্ণনা করে মার্কিন সরকার। তিনি একদিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর স্বামীর উত্তরাধিকারী হতে পারেন বলেও মনে করেন অনেকে। লন্ডনে বেড়ে ওঠা আসমা আসাদ নিজের গণ্ডি পেরিয়ে এগিয়ে এসেছেন অনেক দূর। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, স্বৈরশাসকের স্ত্রী হিসেবে এটি কেবল তাঁর যাত্রার শুরু।
১৯৭৫ সালে পশ্চিম লন্ডনের ছোট শহর অ্যাকটনে জন্ম হয় আসমা আখ্রাসের। বাশার আল–আসাদের সঙ্গে বিয়ের আগে এটাই ছিল তাঁর নাম। সিরিয়ার বেশির ভাগ নাগরিকের মতো তাঁর মা–বাবাও সুন্নি মুসলিম। একটি ছোট প্রান্তিক সম্প্রদায় অভ্যুত্থান ঘটানোর আগে ১৯৬০–এর দশক পর্যন্ত যারা ছিল সিরিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী দল।
উন্নত জীবনের আশায় ১৯৭০–এর দশকে লন্ডনে আসেন আসমার মা–বাবা। কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা আসমার পরিবারকে সাংস্কৃতিকভাবে রক্ষণশীল হিসেবে বর্ণনা করেছেন তাঁর বন্ধুরা। ইংল্যান্ডের স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসমা পরিচিত ছিলেন এমা নামে।
লন্ডনের সম্ভ্রান্ত অভিজাতদের মতোই জীবনযাপন করতে চেয়েছিলেন আসমা। ব্রিটেনের প্রাচীনতম বেসরকারি গার্লস স্কুলে ভর্তি হন, পড়েছেন কুইন্স কলেজেও। এর পর কিংস কলেজ লন্ডনে কম্পিউটার বিজ্ঞানে একটি ডিগ্রি নেন, যেখানে আসমার বন্ধুরা তাঁকে স্মরণ করেন চতুর ও পরিশ্রমী হিসেবে।
সম্পর্ক সূত্রে ক্ষমতার স্বাদ
আসমার মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না বলেও জানান তাঁর বন্ধুরা। মা–বাবার সঙ্গে দামেস্কে বেড়াতে গেলে তিনি বেশির ভাগ সময় কাটাতেন হোটেলে। আসমার জন্য উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল তাঁর মা সাহারের। আসমার চাচা বাশারের বাবা হাফেজ আসাদকে ১৯৭০ সালে ক্ষমতা দখল করতে সহায়তা করেছিলেন। পরে লন্ডনে সিরিয়ার দূতাবাসে চাকরি পেতে এই সম্পর্ক ব্যবহার করেছিলেন সাহার।
‘আসাদ অর উই বার্ন দ্য কান্ট্রি’ বইয়ের লেখক স্যাম দাঘেরের মতে, আসমা ও বাশারের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টির বিষয়েও আগ্রহী ছিলেন সাহার। নব্বইয়ের দশকে বাশার লন্ডনে মেডিকেল ছাত্র থাকাকালে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছিল দুজনের।
ওয়াফিক সাঈদ নামে সিরিয়ার এক ধনী প্রবাসী জানান, বাশারের বড় ভাই বাসিল সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি করলেও তাঁর জীবনযাপন ছিল বেপরোয়া। এর বিপরীতে বাশার ছিলেন ‘কঠোর পরিশ্রমী ও সময়নিষ্ঠ।’
১৯৯৪ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় বাসিলের মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই আসাদ রাজবংশের ভাগ্য বাশারের কাঁধে পড়ে। আসমা দামেস্কে যাওয়ার আগেই ২০০০ সালের জুনে মৃত্যু হয় বাশারের বাবা হাফিজের। অঞ্চলজুড়ে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর জন্য তাঁর সমর্থন সিরিয়াকে পশ্চিমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেও পুনরায় সম্পর্কোন্নয়নের একটি সুযোগ ছিল বাশারের সামনে।
ক্ষমতা গ্রহণর পর উদ্বোধনী ভাষণে বাশার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ও প্রকৃত বহু-দলীয় নির্বাচনের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন দেশের অন্যতম বড় কারাগারও। এসবের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল আসমার।
আশা ছিল অন্য রকম
নতুন সিরীয় নেতাদের জন্য আসমা আসাদকে মনে করা হচ্ছিল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একজন ফার্স্ট লেডি। বাশার-আসমা দম্পতির বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করে ওয়াফিক সাঈদ বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম এই দুজনের সংমিশ্রণ সিরিয়াকে স্বর্গে পরিণত করবে।’
তবে আসমাকে নিয়ে বিবাদ ছিল তাঁর শ্বশুরবাড়িতে। বাশারের মা আনিসা চেয়েছিলেন, তাঁর ছেলে নিজ জাতির মধ্যেই বিয়ে করবে, যাতে তাঁরা আরবের সৌদদের মতো দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ তৈরি করতে পারে।
কিন্তু বিয়ে ঠেকানো যায়নি। বিয়ে ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে বাশারের মা বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি তাঁদের বিয়ের খবর নিয়ে দেশটির গণমাধ্যমগুলোতে কোনো সংবাদও প্রচার হয়নি। এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি আনুষ্ঠানিক ছবিও। আসমাকে বারবার বলা হয়েছিল, তাঁর কাজ ওয়ারিশ তৈরি করা এবং খবর থেকে দূরে থাকা।
আইমান আবদেল নূর নামে বাশারের এক সাবেক উপদেষ্টা বলেন, ‘আসমার গৃহজীবন ছিল দুর্বিষহ। তারা (আসাদের পরিবার) তাঁকে ঘৃণা করত। বছরের পর বছর তাঁকে বাড়ির ভেতরে রাখা হয়েছিল। আসমা তখন আরবি ভাষাতেও সাবলীল ছিলেন না।’
ক্ষমতাসীন উচ্চবিত্ত শ্রেণিও বন্ধুসুলভ ছিলেন না। বাশারের সংস্কারগুলোও নানা বাধার মুখে পড়ে, বিশেষত তাঁর বাবার সাবেক সহযোগীদের কাছ থেকে।
ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বাশারের সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল যুক্তিহীন, যা তিনি কেবল নিজের পক্ষে সমর্থন জোরদার করতে ব্যবহার করেছিলেন।
ওয়াফিক সাঈদ বলেন, ‘আপনি যা শুনতে চান, বাশার আপনাকে ঠিক তাই বলবে এবং এর পর কিছুই করবে না।’ শিক্ষাবিদদের কারাগারে বন্দী করা হয়েছিল। জনসমাগমের ক্ষেত্রে এতটাই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় যে, হোটেলে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্যও নিতে হয়েছে সরকারি অনুমতি।
আধিপত্যের যাত্রা শুরু
২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গাড়ি বোমা হামলায় নিহত হন লেবাননের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ রফিক হারিরি। এরপরই সিরিয়া তার ছোট, অকার্যকর প্রতিবেশীকে কোণঠাসা করে ফেলে। বাশার আল–আসাদই হারিরিকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন বলে মনে করেন অনেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং লেবাননের বিশাল বিক্ষোভের মুখে একসময় পিছু হটেন আসাদ। সিরিয়ার কট্টরপন্থীদের দাবি উপেক্ষা করে প্রায় ৩০ বছর ধরে দখলদারির পর লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয় সিরিয়া।
বাশার আল-আসাদের কাছে তাঁর দেশি মিত্রদের প্রয়োজনীয়তাও কমে এসেছিল। কারণ, তাঁর ব্রিটিশ স্ত্রী সম্ভবত পশ্চিমা সরকারের সমর্থন পেতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আসমাকে সিরিয়ার ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে মনোনীত করার প্রতিশ্রুতি দেন আসাদ। এর মধ্য দিয়ে অবশেষে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজের আসন অর্জন করে নেন আসমা।
হারিরি হত্যার দু মাস পর ২০০৫ সালের এপ্রিলে পোপ দ্বিতীয় জন পলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে আসাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আসমা। ওই অনুষ্ঠানের বিভিন্ন ছবিতে তাঁকে দেখা যায় বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও।
এটি ছিল এই দম্পতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কারণ, এরপরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাশারের ভাবমূর্তি উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকায় নামেন আসমা। বাশারের সাবেক উপদেষ্টা আবদেল নূর বলেন, ‘তিনি (আসাদ) যেসব দেশের সঙ্গে মিশতে পারতেন না, সেসব দেশে তাঁর মুখপাত্র হয়ে কাজ করতেন আসমা।’
এই জুটির জন্য ইউরোপে একটি সফর আয়োজন করা প্রবাসী এক সিরীয় কূটনীতিক বলেন, ‘আমি মন্ত্রমুগ্ধ ছিলাম। আপনি আসমার সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তেই তাঁর প্রেমে পড়বেন। আর আসাদ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্বৈরশাসকের চেয়ে আলাদা। তিনি দেখতে আধুনিক ও পরিশীলিত। এটিই তাঁকে এত বিপজ্জনক করে তুলেছে।’
আসমার পরবর্তী প্রকল্প ছিল সিরিয়া নিয়েই। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা এবং আমদানি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সিরিয়াকে তিনি চাঙা করতে চেয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে বেসরকারি ও বিদেশি সংস্থাগুলোর জন্য ব্যাংকিং খাত উন্মুক্ত করে দিতে আসাদকে পরামর্শ দেন আসমা। সিরিয়ার এক অর্থনীতিবিদের মতে, ‘আসমা দামেস্ককে করমুক্ত একটি আঞ্চলিক দুবাইতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।’
তবে দুর্ভাগ্যক্রমে অর্থনৈতিক এই সংস্কার হুমকির মধ্যে ফেলে সিরিয়ার বেশির ভাগ ক্ষমতাধর ব্যক্তির স্বার্থকে। সিরিয়ার প্রচলিত ব্যবসায়িক ধারায় পরিবর্তন আনতে আসাদ পরিবারের সদস্য রামি মাখলুফের বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় আসমার। কারণ অনুমান করা হয়, সে সময় মাখলুফের সংস্থাগুলো সিরিয়ার অর্ধেকের বেশি অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। ২০০৭ সালে নিজস্ব হোল্ডিং সংস্থা তৈরি করে মাখলুফের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছিলেন আসমা। তবে দেশের বেশির ভাগ বড় ব্যবসায়ী মাখলুফের সঙ্গে থেকে যাওয়ায় ব্যর্থ হয় আসমা আসাদের প্রচেষ্টা। তাই সিরিয়ার অর্থনীতির জন্য তাঁর পরিকল্পনা থেকে যায় অপেক্ষমাণ।
আসমা দ্রুতই তাঁর প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি নতুন উপায় বের করেন। তিনি তাঁর বিয়ের প্রথম দিকে বিভিন্ন দাতব্য কাজের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। এই প্রকল্পগুলো তিনি ‘দ্য সিরিয়া ট্রাস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট’ নামে একটি সংস্থার মধ্যে একত্রীকরণের উদ্যোগ নেন। বিদেশে বসবাসকারী সিরীয় নাগরিক, জাতিসংঘে দেশটির সাবেক কর্মকর্তা, পর্যবেক্ষক দলের কৌশলবিদ, বোস্টনভিত্তিক ব্যবস্থাপনাবিষয়ক পরামর্শদাতা, এমনকি জার্মান এক কূটনীতিকের মেয়েকেও ওই সংস্থায় নিয়োগ দেওয়া হয়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দামেস্কে থাকা পশ্চিমা কূটনীতিকেরা আনন্দের সঙ্গে আসমার ট্রাস্টকে সমর্থন করেছিলেন। লক্ষ্য অর্জনে ওই ট্রাস্টে অর্থায়নের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও কাতারের মনোযোগ আকর্ষণেও সক্ষম হন আসমা।
নিজের ভাবমূর্তি উন্নয়নে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে জনসংযোগ সংস্থা নিয়োগ করেন আসমা। সংস্থাগুলো তাঁর ভালো কাজের প্রশংসা করার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রচার শুরু করে। ফলে দামেস্ক এসেছিলেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, ব্র্যাড পিট, স্টিং ও ড্যামন অ্যালবার্নের মতো তারকারা।
এখানেই শেষ নয়। আসমা জায়গা করে নেন বিশ্বখ্যাত ভোগ ম্যাগাজিনে। ২০১১ সালের মার্চে মার্কিন জনসংযোগ সংস্থা ব্রাউন লয়েড জেমসের উদ্যোগে ভোগ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে উঠে আসেন আসমা। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘মরুভূমির গোলাপ (আ রোজ ইন দ্য ডেজার্ট) ’।
সিরিয়ার অনেক সরকারি কর্মচারী তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন—আসমার ট্রাস্ট কেবল তাঁর নিজস্ব প্রচারের একটি বাহন কিনা। যদিও তাঁর সাবেক এক সহযোগী বলেছিলেন, আসমা সত্যিই সিরিয়ার উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তবে এ বিষয়ে তাঁর ওপর অন্যদের আস্থার অভাব ছিল।
পরিবারে ক্ষমতার বিস্তৃতি
আসমার উত্থানের মধ্য দিয়ে যারা উঠে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তাঁর বাবা ফওয়াজ আখ্রাস। আসমা-বাশারের বিয়ের পরপরই আখ্রাস লন্ডনে ব্রিটিশ-সিরিয়ান সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা সিরিয়ার রাজনৈতিক ও আর্থিক সহায়তায় বড় ভূমিকা রেখেছিল। তিনি সামাজিক বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে আসমার সংগঠনের সমন্বয় করেছিলেন, যা ধনী সিরীয়দের আকৃষ্ট করে।
ক্ষমতার নৈকট্য পাওয়ার বিষয়ে আখ্রাস ছিলেন স্পষ্টভাষী। বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি প্রায়ই ‘প্রেসিডেন্টের শ্বশুর হিসেবে...’ কথাটি উচ্চারণ করতেন। এমনকি সিরিয়ার প্রধানমন্ত্রীও বাশার আল-আসাদের কাছে কোনো বার্তা পাঠানোর জন্য আসমার বাবার শরণাপন্ন হতেন বলে জানান সরকারি অনেক কর্মকর্তা।
আসমা আসাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নতি হয় সিরিয়ার ভাবমূর্তিরও। মার্কিন কর্মকর্তারা ফের দামেস্কে যেতে শুরু করেন। বিশেষত ২০০৮ সালে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এমন সফর বাড়তে থাকে।

আরব বসন্ত এবং...
আসমার পরোক্ষ এ ক্ষমতা আরব বসন্তের সময় মধ্যপ্রাচ্যে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ২০১১ সালের প্রথম দুই মাসে অশান্ত হয়ে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি। কয়েক দশকের স্থবিরতা ও নিপীড়নের পর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে তিউনিসিয়া থেকে লিবিয়া, আলজেরিয়া থেকে বাহরাইন, জর্ডান থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত। কায়রোতে গণবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন মিসরের স্বৈরশাসক হোসনি মুবারাক। প্রতিবাদের জোয়ার হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য।
বিক্ষোভের ঢেউ পৌঁছেছিল সিরিয়াতেও, কিন্তু ভয়ে রাস্তায় নেমে আসা থেকে বিরত ছিল বেশির ভাগ মানুষ। এর পর ফেব্রুয়ারির এক রাতে দামেস্কের দক্ষিণের ডেরা নামক শহরে, একদল স্কুলছাত্র একটি প্রাচীরে গ্রাফিতি তৈরি করে যেখানে লেখা ছিল ‘এবার আপনাদের পালা’।
স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ছিলেন বাশারের এক দূর সম্পর্কের ভাই। তাঁর লোকেরা গ্রাফিতি তৈরি করা স্কুলছাত্রদের আটক করে নির্যাতন শুরু করে। এ ঘটনার পর নাগরিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার দাবিতে ডেরার মসজিদের বাইরে সমবেত হয় সাধারণ জনগণ। কিন্তু সেখানে নির্বিচারে গুলি চালায় সেনারা।
এ ঘটনায় আসমা ও বাশার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন, সে বিষয়টি প্রথমে পরিষ্কার ছিল না। আসাদের একজন জেনারেল তাঁকে স্থানীয় নিরাপত্তা প্রধানকে কারাবন্দী করার এবং ডেরায় রক্তপাতের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সিরিয়ার বড় শহরগুলো তখনো শান্ত থাকায় জনসাধারণের সংকট ও পরিবর্তনের নতুন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ ছিল।
কিন্তু একই বছরের ৩০ মার্চ সংসদে দেওয়া এক ভাষণে বাশার ঘোষণা দেন, ‘সিরিয়া একটি বড় ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি।’ বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি চালানোর ঘটনার একটি ফুটেজকে তিনি ‘জাল তথ্য’ বলে আখ্যা দেন এবং সংস্কারের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।
বাশারের এ ভাষণের পর বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। শুরু হয় প্রতিবাদ ও সহিংসতার একটি ক্রমবর্ধমান চক্র। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ওপরও চড়াও হয়ে ওঠে সরকারি বাহিনী। এ সময় দামেস্কে থাকা সাবেক এক ফরাসি রাষ্ট্রদূত জানান, বাশার প্রায়ই বলতেন, ‘আমার বাবাই ঠিক ছিলেন। হামায় হাজার হাজার মৃত্যু আমাদের তিন দশকের স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছিল।’ এদিকে সিরিয়ায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হচ্ছিল আসমার লক্ষ্যগুলোও।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাশারের ছোট ভাই মাহেরের নেতৃত্বে পশ্চিম সিরিয়ার হোমসে সেনাদের আর্টিলারি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেনারা বিদ্রোহী দমন শুরুর পর তখন পর্যন্ত সারা দেশে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৭ হাজার বেসামরিক মানুষ। আসমা তখন কী করছিলেন? তিনি কি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছিলেন, নাকি তিনি তাঁর স্বামীর পদক্ষেপকে সমর্থন করছিলেন—এমন প্রশ্ন তখন ছিল সবার মধ্যেই।
আসমা আসাদ সে সময় তাঁর এক সহযোগীকে বলেছিলেন, ‘এটি সব সময়ই মিথ্যা ছিল (সিরিয়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি)। আমাকে ব্যবহার করা হয়েছে।’
সূত্র অনুসারে, আসমা লন্ডনেও ফিরে যেতে পারতেন। উপসাগরীয় রাজ্যগুলোর সহায়তায় নিরাপদে সিরিয়া ছাড়ার সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। ব্রিটিশ সরকার বারবার বলে আসছিল—একজন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে আসমাকে তারা দেশে প্রবেশে বাধা দিতে পারে না। তবে লন্ডনের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। অ্যাকটনে আসমার বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ জানায় প্রতিবাদকারীরা। এমনকি সাবেক শিক্ষার্থীদের তালিকা থেকে আসমা আসাদের নাম সরিয়ে দেয় কুইন্স কলেজ কর্তৃপক্ষ।
তবে পারস্পরিক বোঝাপড়া অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন বাশার ও আসমা। ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর সেনারা যখন হোমস শহরে ট্যাংক হামলা চালায়, আসমা তখন বাশারকে লিখেছিলেন, ‘আমরা যদি একসঙ্গে থাকি, তাহলে এই সমস্যা আমরা একসঙ্গে কাটিয়ে উঠব...আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ তবে তাঁদের যে সমস্যাগুলো ‘কাটিয়ে ওঠার’ দরকার ছিল, তা সিরিয়ার নাকি পারিবারিক, সেটি স্পষ্ট নয়।

যুদ্ধ ও ক্ষমতা
বিদ্রোহ শুরুর পর আসমা তাঁর প্রথম সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল—‘বাশার আল-আসাদ পুরো সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট, সিরীয়দের একটি দলের প্রধান নন এবং এই ভূমিকায় ফার্স্ট লেডি তাঁকে সমর্থন করেন।’ এই বিবৃতির মধ্য দিয়ে আসাদের পাশে দাঁড়ান আসমা।
বাশারের সঙ্গে তাঁর পুনর্মিলনের অংশ হিসেবে আসমা তাঁর বাবার সহায়তায় জনসম্মুখে ফিরে আসার বিষয়ে আলোচনা করেন। ২০১২ সালে বোমা বিস্ফোরণে স্বামী নিহত হওয়ার পর দুবাই পালিয়ে যান বাশারের বোন বুশরা। বিদ্রোহীরা ওই হামলার দায় স্বীকার করলেও এটি সরকারি মদদে হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করতেন অনেকে। কারণ, আসাদ পরিবারের মধ্যে আসমাবিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন বুশরা ও তাঁর স্বামী।
পরের বছরগুলোতে বাশারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। হোমস শহরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহী দমনে সফল হয়ে ওঠেন তিনি। সরকারবিরোধী বাহিনী দামেস্কের কিছু শহর নিয়ন্ত্রণে রাখলেও আসাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে তেমন কোনো সুবিধা করতে পারেনি তারা।
যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরও নির্মম হয়ে ওঠেন বাশার। সহিংসতার মাত্রা ধীর গতিতে বেড়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করে পশ্চিমা এক কূটনীতিক জানান, বেসামরিক লোকদের বিরুদ্ধে প্রথমে কামান এবং এর পর বিমান ও ব্যারেল বোমা হামলা চালানো শুরু করে সরকারি বাহিনী।
২০১৩ সালের ২১ আগস্ট নতুন এক ফুটেজে দেখা যায়, দামেস্কের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এক বিধ্বস্ত শহরের ছবি, যেখানে সরকারি বাহিনীর হামলায় মৃত্যু হয় শত শত বেসামরিক মানুষের। পরে এক তদন্তে জাতিসংঘ নিশ্চিত করে—সেখানে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘সেরিন’ নামে বিষাক্ত এক স্নায়ু গ্যাস। ১৯৮৮ সালের পর যা ছিল সর্বকালের ভয়াবহ রাসায়নিক অস্ত্র হামলা। পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই হামলার ছবি ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু এ নিয়ে অনেকটাই নির্লিপ্ত ছিল আসমা-বাশার দম্পতি।
এর পরের বছরগুলোতে সিরিয়ায় ধ্বংসের মাত্রা গণনা করা কঠিন। বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ২০১৪ সালে সিরিয়া ও ইরাকে বিস্তৃত একটি তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল চরমপন্থী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট। এর সাম্প্রদায়িক উগ্রতা বাশার বাহিনীকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছিল; কিন্তু দুর্বল করেছিল তাঁর বিরোধী পক্ষের সমর্থনও।
বাশার সিরিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ২০১৬ সালে পুনরায় আলেপ্পো দখল করলেও তিনি বোমা হামলা অব্যাহত রেখেছিলেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল সিরিয়ার প্রায় অর্ধেক শহর। এই সময়ের মধ্যে মৃতের সংখ্যা পৌঁছায় প্রায় পাঁচ লাখে, শরণার্থী হন সিরিয়ার ১ কোটিরও বেশি মানুষ।
সিরিয়ার নতুন বাস্তবতায় প্রয়োজন ছিল নতুন এক আসমার। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাশারের মা আনিসার মৃত্যুর পর আসমা তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারান। যদিও তাঁর বড় পরীক্ষা ছিল নিজের ব্যক্তিগত পরিবর্তন।
২০১৮ সালে আসমার স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে। তবে অসুস্থতাকে জনগণের সামনে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেননি তিনি। চিকিৎসার জন্য যে তিনি সিরিয়াতেই রয়েছেন, সেটিও দেশের সাধারণ মানুষকে জানানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন আসমা। তাঁর সংগ্রামের বিবরণ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশদভাবে প্রচার করা হয়।
চিকিৎসা চলাকালে যখন চুল পড়া শুরু হলো, তখন মাথায় স্কার্ফ পরা ছবিতে দুর্বলতা এবং শক্তি উভয়ই তুলে ধরেছিলেন আসমা, যা ছিল তাঁর স্বামী বাশার আল-আসাদের বিদ্রোহী দমনের বিপরীতে এক অপ্রতিরোধ্য রূপক। এমনকি তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আগেই সরকার সমর্থক মিডিয়া সিরিয়ার দুঃসময়ে আসমার বিভিন্ন ভূমিকার কথা প্রচার করা শুরু করে।
আসমা সচেতনভাবে চেষ্টা করতে থাকেন নিজের ব্রিটিশ পরিচয় এড়িয়ে যাওয়ার। তিনি আরবি ভাষা নিয়ে এত কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন যে, সিরীয়রাও আর তাঁর কোনো ইংরেজি উচ্চারণ শনাক্ত করতে পারেনি।
কেবলমাত্র রাশিয়া এবং স্থানীয় কিছু গণমাধ্যম ছাড়া পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর সাক্ষাৎকারের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে শুরু করেন আসমা। পশ্চিমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও আন্তর্জাতিক দাতাদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক বজায় ছিল।
তবে ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার পর তাঁর দাতব্য সংস্থা সিরিয়া ট্রাস্টের আয় কমে আসে। অন্যদিকে যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরীয়দের জন্য বেড়ে যায় আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা। আর সেই অর্থের বেশির ভাগই আসা শুরু করে আসমা আসাদের হাত ধরে। সিরিয়া ট্রাস্টের প্রধান হিসেবে ধনসম্পদের চেয়েও অনেক বেশি অর্জন করেছিলেন আসমা। পৃষ্ঠপোষকদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি, যেখানে ছিল সিরিয়ার যুদ্ধবাজরাও।
যুদ্ধই যখন পুঁজি
যুদ্ধের অর্থনীতি থেকে সরাসরি লাভ করছিলেন আসমা। সিরিয়ার অর্থনীতিতে ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে তাঁর পরিবারও। সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বাশার তাঁর স্ত্রীর আর্থিক সাফল্যে সন্তুষ্ট এবং তাঁর সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞ ছিলেন। এক দশক দীর্ঘ যুদ্ধের পর বাশার ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং অর্থনীতি নিয়ে তিনি কখনো চিন্তিত ছিলেন না। ইউরোপে আসাদের এক লবিস্টের মতে, আসমা ছিলেন তাঁর ‘প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা’।
ঋণ পরিশোধের জন্য ২০১৯ সালে বাশারকে চাপ দিতে শুরু করে রাশিয়া এবং আরও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সিরিয়া সরকারের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। এমন পরিস্থিতিতে মুখ্য হয়ে ওঠেন দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী ধনকুবের এবং বাশারের নিকটাত্মীয় রামি মাখলুফ।
তবে বাশারের মা আনিসার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবক হারান মাখলুফ। সেই সুযোগে মাখলুফের দাতব্য সংস্থার দায়িত্ব নিয়ে নেয় আসমার অধীনস্থ সিরিয়া ট্রাস্ট। সেই সঙ্গে মাখলুফের ব্যাংক অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়। সিরিয়ায় অর্থনৈতিক এ দোলাচলের মধ্যে আসমার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন মাখলুফ।
জবাবে আসমাকে হেয় করার চেষ্টা করেছিলেন মাখলুফ। ২০২০ সালের মে মাসে তিনি ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করে অভিযোগ তোলেন, তাঁর বিরুদ্ধে সরকারের ‘শীর্ষে থাকা একটি দল’ ষড়যন্ত্র করছে। একই সঙ্গে আরব সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন রুশ মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়—সিরিয়ার আর্থিক সংকটের মধ্যেই বাশার তাঁর স্ত্রীর জন্য ডেভিড হকনির একটি পেইন্টিং কিনতে ৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন। তবে এ ঘটনায় খুব বেশি উপকার হয়নি মাখলুফের। কারণ, গল্পটি মিথ্যা ছিল বলে পরে প্রমাণিত হয়। পক্ষান্তরে এ ঘটনার পর আংশিক গৃহবন্দী করা হয় তাঁকে। গুঞ্জন ছিল—মাখলুফকে জীবিত রাখা হয়েছিল কারণ, তাঁর কাছে আনুমানিক ১০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বিদেশি সম্পদের পাসওয়ার্ড এবং দলিল ছিল।

লেডি অব জেসমিন
মাখলুফকে কোণঠাসা করার মধ্য দিয়ে অব্যাহত ছিল আসমার আধিপত্য এবং অধিগ্রহণের ক্ষমতা। আসমা আসাদকে ‘লেডি অব জেসমিন’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ প্রচারও বৃদ্ধি পায় সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে। দেশটির মন্ত্রীরা তাঁদের অফিসে আসাদের পাশাপাশি ঝুলিয়ে রাখতে শুরু করেন ফার্স্ট লেডি আসমার ছবিও।
মাখলুফকে দমন, বাশারের বোনের দেশত্যাগ এবং তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর অভ্যন্তরীণ বৃত্তে আসমার আর তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। তাঁর নিকটতম উপদেষ্টাদের অনেকেই অধিষ্ঠিত হন প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের শীর্ষ পদে।
দামেস্ক ও ইউরোপে ভ্রমণকারী এক ব্যবসায়ীর মতে, ‘আসমা আসাদ প্রাসাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। তিনি যাকে খুশি তাঁকে ক্ষমতায় বসাতে পারেন।’
শেষ কথা
সিরীয়দের অনুমান, দেশের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে ওঠার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে আসমার। বাশারের অবস্থান যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আসমা কি দেশের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছে প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দিতে পারেন? গুজব রয়েছে—আসাদ পরিবারের একজন সদস্য সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে সমর্থন চেয়েছেন।
সিরিয়ার সাবেক এক কূটনীতিক জানিয়েছেন, ‘বাশার ও আসমা দুজনেই এ নিয়ে ভাবছেন। আসমা প্রেসিডেন্ট হতে চান এবং উভয়েই এ পদক্ষেপকে সিরিয়ার শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার বিপ্লবী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছেন।’
তবে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য দেশটির কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদদের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই আসমার। এ ছাড়া বর্তমানে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হলেন বাশারের ছোট ভাই মাহের, যিনি এখনো সিরীয় সেনাবাহিনীর চতুর্থ আর্মর্ড ডিভিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন।
দুবাইয়ের এক সিরীয় ব্যবসায়ীর মতে, ‘সামরিক বাহিনী এবং কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদেরা আসমার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।’
আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী হলেও আসমা এখন বেশ অরক্ষিতও। এমনকি প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাভিলাষী কথাও আসমার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। যদিও বহু আগেই আসমার অনেক বন্ধু তাঁর থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছেন, তবে আসমার সুরক্ষার বিষয়ে তাঁরা এখনো উদ্বিগ্ন। বৃহত্তম পুরস্কারের লক্ষ্যে পশ্চিম লন্ডনের মেয়েটি শেষ পর্যন্ত পলাতকও হতে পারেন বলে মনে করেন অনেকে। কিন্তু আসমা আসাদ হয়তো অনেক আগেই বুঝে গেছেন—যেখানে পৌঁছেছেন তিনি, সেখান থেকে আর ফিরে আসার পথ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইরানকে তাঁর সর্বশেষ আল্টিমেটাম দিয়েছেন। গাজা পুনর্গঠন ও বৈশ্বিক শান্তি নির্মাণের উদ্দেশ্য গঠিত বোর্ড অব পিসের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ট্রাম্প নিজেই এই জোট গঠন করেছিলেন...
২২ মিনিট আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর সুযোগ দেখছে চীন। বেইজিং মনে করছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যকে নতুনভাবে সাজিয়ে তারা এমন এক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থেকে তাদের ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখবে।
২ ঘণ্টা আগে
চলতি বছরের শুরুতে মেজর জেনারেল হাসান রাশাদের নেতৃত্বে মিসরের জেনারেল ইন্টেলিজেন্স ডাইরেক্টরেট (জিআইডি) আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে এক বিস্তৃত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অভিযান শুরু করে। এতে সহযোগিতা করে চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, যা কার্যত চীনের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা। এই অভিযানের লক্ষ্য...
১ দিন আগে
গত বছরের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ পাঞ্জাবের বাহাওয়ালপুর শহরে জুবাইদা বিবির বাড়িতে অভিযান চালায় পাঞ্জাব পুলিশের ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট (সিসিডি)। জুবাইদা বিবির অভিযোগ, অভিযানের সময় সিসিডি তাঁদের মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, মেয়ের বিয়ের যৌতুকের টাকাসহ সবকিছু নিয়ে যায়।
২ দিন আগে