
আধুনিক রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে মূলধারায় টেনে আনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী আর কেউ আছেন—এমনটা বলা মুশকিল। কিন্তু ট্রাম্প ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে নিজে যে ‘দানব’ তৈরি করেছিলেন, সেটিই এখন তাঁর দিকেই ফিরে আসছে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
রিপাবলিকান রাজনীতিতে নিজের উত্থানের শুরুতেই ট্রাম্প সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে মিথ্যা ‘বার্থার’ দাবি তুলে আলোচনায় আসেন। এরপর গত এক দশক ধরে তিনি ২০২০ সালের ‘ভোট চুরির’ নির্বাচন, হাইতিয়ান অভিবাসীরা পোষা প্রাণী খাচ্ছে—এ ধরনের নানা অদ্ভুত তত্ত্ব ছড়িয়েছেন। এসব তত্ত্ব ছড়িয়ে দিতে তিনি এমন কিছু মিত্রও গড়ে তুলেছেন, যারা তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে এই বয়ানকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং তাঁর বহু সমর্থককেও এতে বিশ্বাসী করে তুলেছে।
ইরান যুদ্ধসহ নানা ইস্যুতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে খুব বেশি প্রভাবশালী মিত্র এখনো অবস্থান নেননি। তবে যারা অবস্থান নিয়েছেন, তারা মূলত ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর সেই অংশ থেকেই এসেছেন, যাদের মধ্যে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ঝোঁক বেশি। এদের মধ্যে আছেন মার্জোরি টেইলর গ্রিন, টাকার কার্লসনসহ আরও কিছু প্রভাবশালী কণ্ঠ।
সাম্প্রতিক সময়ে তারা নিজেদের শ্রোতা ও অনুসারীদের মধ্যে ট্রাম্পবিরোধী ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এর মধ্যে একটি হলো—২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে ট্রাম্পের ওপর হত্যাচেষ্টা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা। এটি ইঙ্গিত দেয় ঘটনাটি সাজানো হতে পারে। অন্য তত্ত্ব গুলোতে বলা হচ্ছে—ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রতি দায়বদ্ধ বা কোনোভাবে ‘কমপ্রোমাইজড’, তাঁর এবং তাঁর প্রশাসনের রিপাবলিকানদের প্রতি আনুগত্য সন্দেহজনক; এমনকি কেউ কেউ তাঁকে খ্রিস্টবিরোধী চরিত্র (অ্যান্টিক্রাইস্ট) বলেও উল্লেখ করছেন।
অবশ্য এসব দাবির পক্ষে কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই। কিন্তু ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব তত্ত্ব কিছুটা হলেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ মুহূর্তে বাটলার সংক্রান্ত তত্ত্বগুলোই সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে। যদিও এগুলো প্রায়ই ‘শুধু প্রশ্ন তুলছি’ ধরনের কৌশলে উপস্থাপন করা হয়, তবে এসবের প্রভাব ভয়াবহ। আয়রনি হলো—এই কৌশল ট্রাম্প নিজেও আগে ব্যবহার করেছেন।
ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গ তুলে সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তা পদ থেকে পদত্যাগ করা জো কেন্ট টাকার কার্লসনকে বলেন, বাটলার ঘটনার তদন্ত সন্দেহজনকভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেইলর গ্রিন রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, তিনি বাটলার ঘটনাকে ‘প্রহসন’ বলছেন না, তবে ‘অনেক প্রশ্ন আছে, যার জনসম্মুখে উত্তর পাওয়া দরকার।’
পডকাস্টার জো রোগান মাঝেমধ্যে এসব প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আর আরেক পডকাস্টার টিম ডিলন সরাসরি বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, হয়তো ঘটনাটি সাজানো ছিল।’ অন্যদিকে, টাকার কার্লসন ও ক্যান্ডেস ওয়েন্স এসব প্রশ্নকে প্রায়ই আরেকটি পরিচিত ষড়যন্ত্রতত্ত্বের কেন্দ্রে থাকা একটি পক্ষের সঙ্গে যুক্ত করছেন—ইসরায়েল। উল্লেখ্য, তারা দুজনই নিজেদের মন্তব্যে ইসরায়েল নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন এবং প্রায়ই ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন। কার্লসন ইঙ্গিত দেন, বাটলার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ওপর ইসরায়েলের প্রভাব থাকতে পারে—এমন বক্তব্যে জো কেন্টের কথায় যুক্তি থাকতে পারে।
অভিযুক্ত হামলাকারী থমাস ম্যাথিউ ক্রুকস খুব বেশি কোনো তথ্যসূত্র বা পূর্ব প্রসঙ্গ রেখে যাননি। তবে ট্রাম্প এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন—উভয় প্রশাসনের অধীনে থাকা এফবিআই কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ক্রুকস একাই এই হামলার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যান্য তত্ত্বগুলোতেও পূর্বানুমিতভাবেই ইসরায়েলের প্রসঙ্গ এসেছে। বিশেষ করে এই ধারণা যে—ট্রাম্প কোনোভাবে ইসরায়েলের প্রভাবাধীন বা তাদের প্রতি দায়বদ্ধ।
এ মাসের শুরুতে টাকার কার্লসন নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে পরোক্ষভাবে একজন দাসের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাঁর জন্য দুঃখ বোধ করি। যেমনটা আমি সব দাসের জন্যই অনুভব করি। এই মুহূর্তে তিনি স্বাধীন নন।’
এ সপ্তাহে নতুন এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পপন্থী আরেক সাবেক পডকাস্টার থিও ভন বলেন, ইরান যুদ্ধের একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে—ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রভাবের মধ্যে আছেন। ভন বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না। তাই হ্যাঁ, আমাদের প্রেসিডেন্ট যা করছে, সেটা একেবারেই বিভ্রান্তিকর। আর এটা অসুস্থ একটা ব্যাপার, মনে হয় সে যেন ইসরায়েলের হাতে, ওখানকার এক অন্ধকার সরকারের হাতে কোনোভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে। আমি জানি না। ব্যাপারটা ভীষণ অন্ধকার। খুবই অন্ধকার।’
হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট নিক ফুয়েন্তেস একটি বিস্তারিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তুলে ধরেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে, জেডি ভ্যান্স কার্যত ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসানো হয়েছে, যেন তিনি প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী শক্তিগুলোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেন। ফুয়েন্তেসের এসব মন্তব্য শুক্রবার পুনরায় পোস্ট করেন সাবেক রিপাবলিকান ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সারাহ পলিন। যদিও পলিন দাবি করেন, তিনি কেবল টি–পার্টি আন্দোলনে তাঁর ভূমিকাকে সমর্থন করে দেওয়া একটি প্রশংসাসূচক উল্লেখই সামনে আনতে চেয়েছিলেন। পলিন এখনো ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বিষয়ে তাকে সমালোচনা করেছেন।
২০১৫ সালের শেষ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অ্যালেক্স জোন্সের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ভরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার সিদ্ধান্ত, পরে ফিরে তাকালে, স্পষ্ট করে দেয় যে—ট্রাম্প ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীদের সঙ্গে জোট বাঁধতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এখন জোন্স ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর সেই একই ধরনের তত্ত্ব ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছেন। এমনকি সোমবার তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প নাকি ডেমোক্র্যাটদের সাহায্য করতে চাইছেন তার প্ল্যাটফর্ম ইনফোওয়ার্স। ব্যঙ্গাত্মক সংবাদ সাইট দ্য ওনিয়ন ইনফোওয়ার্স অধিগ্রহণের চেষ্টা করছে এবং তারা ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়।
আরেকটি তত্ত্বও রয়েছে। তবে এটি হয়তো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত, কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু সমর্থন পাচ্ছে—যে ট্রাম্প হতে পারেন ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’। খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বে অ্যান্টিক্রাইস্ট এমন এক চরিত্র, যে কিনা যিশুর দ্বিতীয় আগমনের আগে আবির্ভূত হয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং এক ভুয়া ত্রাণকর্তার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই তত্ত্বটির ইঙ্গিত দিয়ে সম্প্রতি ট্রাম্পের সঙ্গে বড় ধরনের বিচ্ছেদের প্রেক্ষাপটে দিয়েছেন টাকার কার্লসন। আর উইয়ার্ড ম্যাগাজিন খুঁজে পেয়েছে, ট্রাম্পের কিছু অনুসারী, যাদের বড় ধরনের অনুসারী গোষ্ঠী রয়েছে, তারা এখন এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
ডানপন্থীদের মধ্যে এসব তত্ত্ব শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। হতে পারে, হঠাৎ করে ট্রাম্প-সন্দেহবাদী হয়ে ওঠা কিছু মানুষ কেবল আবেগে এসব বলছেন, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্তিমিত হয়ে যাবে। তবে এই তত্ত্বগুলোর কিছু যে শক্ত ভিত্তি পেতে পারে, সেটা কল্পনা করা কঠিন নয়—বিশেষ করে যখন এসব তত্ত্বে পরিচিত ‘দোষী’ (ইসরায়েল) এবং পরিচিত প্রেক্ষাপট (একটি হত্যাচেষ্টার ঘটনা) জড়িয়ে আছে, যেগুলো প্রায়ই এমন তত্ত্ব জন্ম দেয়।
ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে থাকা ব্যক্তিরা অতীতে এসব তত্ত্ব ছড়িয়ে দিতে বেশ সফল হয়েছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন জোন্স, ক্যানডাইস ওয়েনস এবং কার্লসন। একই সঙ্গে এসব তত্ত্ব কিছু পডকাস্টারদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে—যেমন টম ডিলন এবং ভন। এরা সবাই ট্রাম্পের জন্য মূল্যবান সমর্থক ছিলেন। আবার তাঁরা এমন এক শ্রেণির শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে পারতেন, যারা রাজনীতিতে কম আগ্রহী এবং হয়তো তুলনামূলকভাবে সহজেই প্রভাবিত হন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রিপাবলিকান পার্টির নেতারা অনেকাংশেই নীরব থেকেছেন। তাদের দলীয় ঘাঁটির ভেতরে—বিশেষ করে তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে—ইসরায়েলবিরোধী ও ইহুদিবিদ্বেষী মনোভাব বেড়েছে। একই সঙ্গে তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করেছেন চার্লি কার্কের হত্যাচেষ্টা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ক্রমবর্ধমান ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো, যেগুলো সবচেয়ে জোরালোভাবে ছড়িয়েছেন ওয়েনস।
এখন হয়তো তারা ভাবতে পারেন, শুরুতেই আরও জোরালোভাবে এসবের বিরোধিতা করা উচিত ছিল—কারণ এই মনোভাবগুলোই এখন ট্রাম্পকে ঘিরে নতুন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জ্বালানি হতে পারে, যেগুলোকে আরও উসকে দিচ্ছেন তাঁর সাম্প্রতিক কিছু বিচ্ছিন্ন মিত্র।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষদিকে এবং জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত নথিটি প্রথম দর্শনে প্রথাগত দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা বলেই মনে হয়...
১ দিন আগে
আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েল কি তার পুরোনো বন্ধু হারাল? একসময় যে ইসরায়েলকে আমেরিকানরা ‘ডেভিড’ (অল্প শক্তির বীর) এবং আরব বিশ্বকে ‘গোলিয়াথ’ (বিশাল শক্তিশালী শত্রু) হিসেবে দেখত, সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক আমেরিকার বড় একটি অংশ এখন ইসরায়েলকে দেখে কেবল এক আগ্রাসী সামরিক শক্তি হিসেবে।
১ দিন আগে
ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার দিনটি শুরু হয়েছিল ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনার জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ইসলামাবাদে নিয়ে যেতে প্রস্তুত ছিল এয়ার ফোর্স–টু।
১ দিন আগে
ছয় সপ্তাহ ধরে চলা ইরানের ওপর আরোপিত ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরবের সংযম অনেককে বিস্মিত করেছে। শুরুর পরপরই যুদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। দেশগুলোর অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পাল্টা অবরোধ কয়েক দশক ধরে চলা নিরাপত্তা
২ দিন আগে