Ajker Patrika

দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ /ইরান যুদ্ধ যেভাবে আরও জটিল, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরান যুদ্ধ যেভাবে আরও জটিল, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে
ছবি: সংগৃহীত

ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে। এখানে মোটা দাগে উত্তেজনা বৃদ্ধির দুই ধারণা আছে এবং প্রতিটি ধারণাই শেষ পর্যন্ত ফাঁদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করছে।

একদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অস্পষ্ট এবং পরিবর্তনশীল কৌশলগত লক্ষ্য এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। অভিযানের শুরুর হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে হত্যা করা হলেও, ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে আছে এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এখনো নিরাপদে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বিমান হামলা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং আরও বেশি সংখ্যক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে।

জবাবে তেহরান বেছে নিয়েছে ‘অনুভূমিক উত্তেজনা বৃদ্ধি’র কৌশল, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত করা ছিল। এর উদ্দেশ্য হলো—সংঘাতকে ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত করা, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালানো এবং একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর খরচ বাড়িয়ে দেওয়া, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে আঘাত হানার মাধ্যমে।

আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে, ক্রমেই ভঙ্গুর ও বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে ওঠা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা ‘এস্কেলেশন ট্র্যাপ’ বা উত্তেজনা বৃদ্ধির ফাঁদের ঝুঁকির কথাও বলছেন। এতে হামলাকারী পক্ষ এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যা শুরুতে কল্পনা করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল, দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়বহুল। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অভিযানে কৌশলগত (ট্যাকটিক্যাল) ও সামগ্রিক (স্ট্র্যাটেজিক) স্তরের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফারাকই এ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সহজভাবে বলতে গেলে, ট্যাকটিক্যাল স্তর হলো নির্দিষ্ট সামরিক কাজ, যেমন বিমান হামলা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে কি না, যেখানে অভিযান সফল হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক স্তর নির্ধারণ করে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে কি না এবং তার মূল্য কত।

বিমান শক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে গবেষণা করা এবং একাধিক মার্কিন প্রশাসনকে পরামর্শ দেওয়া ইতিহাসবিদ রবার্ট পেপ বলেন, ‘এস্কেলেশন ট্র্যাপের কয়েকটি ধাপ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রথম হামলায় কৌশলগতভাবে প্রায় শতভাগ সাফল্য দেখা গেছে। কিন্তু যখন তা সামগ্রিক সাফল্যে রূপ নেয় না, তখন দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানো হয়।’

পেপের মতে, ‘হামলাকারী তখনো উত্তেজনা বাড়ানোর সক্ষমতায় এগিয়ে থাকে, ফলে দ্বিগুণ শক্তিতে এগোয় এবং উত্তেজনার সিঁড়িতে আরও ওপরে ওঠে, কিন্তু তাতেও সামগ্রিক সাফল্য আসে না। তখন তৃতীয় ধাপে পৌঁছানো হয়, যা প্রকৃত সংকট, যেখানে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প বিবেচনায় আসে। আমার মতে, আমরা এখন দ্বিতীয় ধাপে আছি এবং তৃতীয় ধাপের দ্বারপ্রান্তে।’

তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রাথমিক হামলার সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েছে এবং অস্ত্রের নিখুঁত মানদণ্ড থেকে ‘নিয়ন্ত্রণের ভ্রম” তৈরি হয়েছে। এর ফলে তেহরানও নিজস্ব ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির পথে এগিয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো এবং হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে ইরান দেখিয়েছে, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার মোকাবিলা করতে সামরিক সক্ষমতা সীমিত হলেও, যুদ্ধের খরচ ওয়াশিংটনের জন্য অনেক বেশি বাড়িয়ে দিতে পারে।

পেপ বলেন, ইরানের হামলাগুলো ‘যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে এবং সেই দেশগুলোর জনগণ ও সরকারের মধ্যেও দূরত্ব বাড়াতে পরিকল্পিত।’ তিনি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করা হচ্ছে—কেন আমরা এমন এক যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছি, যা মনে হচ্ছে—ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতির ফল?’

ইসরায়েল আরও উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বৃহস্পতিবার জানান, লেবাননে অভিযান সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিতে তিনি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াই চলছে। হিজবুল্লাহর রকেট হামলা বন্ধ না হলে ‘ভূখণ্ড দখল’ করা হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

ইরান বিষয়ক সাবেক মার্কিন দূত এবং তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার প্রধান আলোচক রবার্ট ম্যালি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই সংঘাতে এগোবে, উত্তেজনা বাড়াবে না কমাবে, তা সুস্পষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনার চেয়ে ট্রাম্পের মানসিকতার ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে। তিনি বলেন, ‘কোনো এক সময় হয়তো বেরিয়ে যাওয়ার পথ পাওয়া যাবে। কিন্তু আমি কল্পনা করতে পারি যে উত্তেজনা এমন স্তরে পৌঁছাতে পারে, যা এক মাস আগেও ভাবা যায়নি। যেমন স্থলসেনা পাঠানো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা, ইরানের অংশবিশেষ দখল করা, কুর্দি বা অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করা। এগুলো ভিন্ন ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি।’

রবার্ট ম্যালির মতে, ‘কিন্তু এতে ইরানের পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, তারপর কী হবে কেউ জানে না। তথাকথিত সফট মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে সন্ত্রাসী হামলা হলেও আমি অবাক হব না। তা ইরান পরিচালিত হোক বা না হোক, প্রেসিডেন্ট তখন কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তা অনিশ্চিত।’

ম্যালি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে যেটা ভয় পাওয়ার বিষয়, তা হলো—উত্তেজনার সিঁড়িতেই ট্রাম্প সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ। কারণ ইরান তার জন্য বিষয়টা সহজ করবে না। তারা তাকে কাঙ্ক্ষিত বিজয় উপহার দিয়ে বলবে না, ঠিক আছে, আমরা গুলি বন্ধ করছি।’

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক জ্যাক ওয়াটলিং বলেন, এই সংঘাতের গতিপথ নির্ধারিত হচ্ছে একাধিক বিতর্কের মাধ্যমে: মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতিনির্ধারক ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে, এবং ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক স্তরের মধ্যে, বিশেষ করে প্রতিশোধ নিতে আগ্রহী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ভূমিকা।

তিনি বলেন, মার্কিন কৌশলগত মহলে, যদিও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে নয়, এমন ধারণা আছে যে অদূর ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। সেই কারণে একই সময়ে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইরানকে ঘিরে একাধিক সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অংশ যুদ্ধকে সীমিত ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নিয়ে পরিচালনা করতে চেয়েছিল। অন্যদিকে ট্রাম্প ইরানের ভবিষ্যতের ওপর ‘জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।

ইরানের ক্ষেত্রে, উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলার ধরন শুধু প্রতিশোধ নয়, বরং আঞ্চলিক প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও। ওয়াটলিং সতর্ক করে বলেন, যদি ইরান বর্তমান মাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তবুও তা উত্তেজনা বৃদ্ধির সমাপ্তি নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।

মার্কিন লেখক ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ রবার্ট ডি কাপলান আরেকটি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন, যা তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা বাড়ায় না, কিন্তু একই পরিণতিতে নিয়ে যেতে পারে। তিনি এটিকে বলেছেন ‘ক্রমাগত ছোট পদক্ষেপের পিচ্ছিল ঢাল।’ ফরেন অ্যাফেয়ার্সে লেখা নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘ইরানে যদি গৃহযুদ্ধ বা তার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে ট্রাম্প প্রশাসন এক পক্ষকে সহায়তা দিতে বিশেষ বাহিনী ও উপদেষ্টা পাঠাতে বাধ্য বোধ করতে পারে। সেখান থেকেই উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে পারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধও কয়েক বছরে ধীরে ধীরে মাঝারি আকারের যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। ইরানের পরিস্থিতিও একই পথে এগোতে পারে।’

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত