Ajker Patrika

নেতানিয়াহুসহ ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা আজ বড় একা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৩৩
নেতানিয়াহুসহ ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা আজ বড় একা
নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে প্ররোচিত করেছিলেন। কিন্তু সেই ইসরায়েলকেই এখন এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির নিছক দর্শক হয়ে থাকতে হচ্ছে। ছবি: এএফপি

৭ এপ্রিলের প্রথম প্রহর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা করলেন, ‘আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না।’ তবে এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়।

সমঝোতাটি আপাতদৃষ্টিতে ট্রাম্পের জন্য একটি ‘অফ-র‍্যাম্প’ বা প্রস্থানের পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা তাঁকে একটি সম্ভাব্য ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ থেকে মুক্তির সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এটি অস্বীকার করা কঠিন যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প গভীর সংকটে পড়েছিলেন। যুদ্ধ কেবল তীব্রই হচ্ছিল না, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছিল। গত কয়েক বছরে যে আঞ্চলিক বিরোধগুলো দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া হয়েছিল, তা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং বিশ্বকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।

এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচিও দুই সপ্তাহের এই সময়সীমা গ্রহণ করে একটি বিবৃতি দেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউসের তুলনায় আলোচনার টেবিলে তেহরানের প্রভাব এখন অনেক বেশি। আর এটিই সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গোটা বিশ্ব ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এখন একটি ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা এই অঞ্চলের কেউ চায়নি। কিন্তু এখন সবাইকে তা মোকাবিলা করতে হবে। আর এই যুদ্ধবিরতি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানজনক প্রস্থানের জন্যই তৈরি করা হয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়।

আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পাকিস্তানে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েল বা উপসাগরীয় কোনো দেশের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা অংশগ্রহণ ছাড়াই এই আলোচনা হবে।

চিন্তার বিষয় এটাই। এই আলোচনায় ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুপস্থিতি মানে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অন্য কাউকে গুরুত্ব দিচ্ছে। নেতানিয়াহুর ওপর থেকে উঠে গেছে ট্রাম্পের হাত।

অন্যদিকে, গত ৪০ দিনের বোমাবর্ষণে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এমনকি এই জলপথের কার্যকারিতা নির্ধারণের চূড়ান্ত অধিকার তাদেরই—এমন দাবিতে অনড় থেকে তেহরান এখন আলোচনার টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেও ইরানের কট্টর শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে রয়েছে।

ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হলো ইসরায়েল। নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে প্ররোচিত করেছিলেন। কিন্তু সেই ইসরায়েলকেই এখন এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির নিছক দর্শক হয়ে থাকতে হচ্ছে। ইসরায়েল এখন ইরানে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে (যদিও তারা জানিয়েছে, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাবে)।

২০২৫ সালের শুরু থেকেই নেতানিয়াহু দাবি করে আসছিলেন, ইরান পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির খুব কাছাকাছি রয়েছে। তিনি মনে করেছিলেন, আকাশপথে হামলার পর ইরানের ভেতর থেকে গণ-অভ্যুত্থান অনিবার্য। এরপর ট্রাম্পকে ব্যবহার করে তিনি ইরানকে মৌলিকভাবে ধ্বংস করার যে ‘একবারই পাওয়ার মতো সুযোগ’ দেখেছিলেন, তা এখন ধূলিসাৎ হওয়ার পথে।

সামরিক অভিযান ইরানের সক্ষমতাকে প্রচণ্ড আঘাত করলেও একটি বিষয় নিশ্চিত করেছে যে—ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের যেকোনো নিরাপত্তাকাঠামো, বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত ইরানের অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে একটি ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ, ইসরায়েল এই আলোচনার টেবিলে নেই।

এদিকে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এখন এক অন্য রকম ইরানের মুখোমুখি। নিরাপত্তা বিকল্প কমে আসায় পারস্য উপসাগরে ইরান এখন নিজের প্রভাব খাটাবে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন হয়তো ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তির উপস্থিতি স্থায়ী করার চেষ্টা করবে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন তৈরির লক্ষ্যের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া ইরানের হুমকির মুখে এই দেশগুলো হয়তো নীরবে ইসরায়েলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করবে, যা গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাদের জন্য একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কেবল ওমান এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে।

সবশেষে, ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই চুক্তিকে কীভাবে নেয়, তা দেখার বিষয়। আয়াতুল্লাহ ও দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতে আইআরজিসি কমান্ডাররা হয়তো কেন্দ্রীয় আদেশের তোয়াক্কা না করেই অভিযান চালাতে পারেন। আমিরাত এখনো ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের খবর দিচ্ছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ট্রুথ সোশ্যালে একটি ঘোষণা দিলেই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

তবে আগামী দুই সপ্তাহেই দেখা যাবে, কারা কতটুকু সফল। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো পালানোর পথ খুঁজবে, ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব পাকাপোক্ত করতে চাইবে আর ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো এই ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ সামলানোর চেষ্টা করবে, যা কেউ কখনো চায়নি।

লেখক: অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক কবির তানেজা

এনডিটিভি থেকে অনূবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ: শেষ মুহূর্তে সময় চাইলেন বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার বললেন—সুযোগ নেই

ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব—শান্তির রূপরেখা নাকি ট্রাম্পের জন্য কূটনৈতিক ফাঁদ

হরমুজ প্রণালিতে কি ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রেখেই সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংসদে পাস

যুদ্ধবিরতি: হরমুজ থেকে টোল আদায় করবে ইরান-ওমান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত